একটি টাচ। অসম্ভব সুন্দর এক মুহূর্তের জন্ম। মাঝমাঠ থেকে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের লং বল বাঁ পায়ে নামালেন, যেন বলকে তার ‘কমান্ড’ দেওয়া। এরপর পায়ের টোকায় ওপরের জালে বল। চোখে লেগে থাকা একটি গোল। লিওনেল মেসি বলেই হয়তো সম্ভব।
অথচ ওই গোল নিয়ে কোনো মাতামাতি নেই। আলোচনাও যৎসামান্য। কেপ ভার্দে নামক দ্বীপ দেশের রূপকথার পারফরম্যান্সে ঢাকা পড়ে গেছে সব। মায়ামি স্টেডিয়ামে শেষ বত্রিশের লড়াইটা আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-২ গোলে। তবু পাচ্ছে না বাহবা। বরং খেলার ধরন ও লিড ধরে রাখতে না পারায় সমালোচিত বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
এই তালিকায় মেসির নাম সবার ওপরে। গোল করেছেন, দলকে জিতিয়েছেন, পরের রাউন্ডে তুলেছেন— তবু তার কণ্ঠে নেই আত্মতুষ্টির সুর। বরং আছে কঠিন আত্মসমালোচনা। বিশ্বকাপে রেকর্ড ২০তম গোল পাওয়া এই সুপারস্টার স্বীকার করে নিয়েছেন, আর্জেন্টিনা কার্যকর প্রেসিং করতে ব্যর্থ হয়েছে, ‘আমরা ওদের ঠিকভাবে প্রেস করতে পারিনি। আমাদের লাইনগুলো ছিল অসংগঠিত। মাঝমাঠ থেকে চাপ দিতে গিয়ে ডিফেন্ডারদের অনেক বড় জায়গা কাভার করতে হচ্ছিল। ফলে পুরো দলই ছন্দ হারিয়ে ফেলে।’
খেলোয়াড়দের মধ্যে সমন্বয়ের স্পষ্ট অভাব চোখে পড়েছে মেসির। তার মতে, মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় কেপ ভার্দে বারবার অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের সুবিধা পেয়েছে। ফলে বল ছাড়াই আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় দৌড়াতে হয়েছে। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে আফ্রিকার দলটি।
ইতিবাচক দিকও আছে মেসির কাছে। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘এই আর্জেন্টিনা অনেক দিন ধরেই প্রমাণ করে আসছে আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করি।’ এই একটি বাক্য যেন পুরো ম্যাচের সারাংশ। কারণ কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা জিতেছে ঠিকই, কিন্তু আধিপত্য দেখিয়ে নয়। জিতেছে ধৈর্য, বিশ্বাস আর শেষ পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতায়।
কিন্তু এই আর্জেন্টিনাকে কি শারীরিকভাবে ক্লান্ত লাগেনি? কেপ ভার্দের প্রেসিং ফুটবল ও মায়ামির গরম তাদের স্বাভাবিক খেলায় প্রভাব ফেলতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবার মেসিকেও ছন্দহীন লেগেছে কিছুটা। কেপ ভার্দে গোলকিপার ভোজিনহা-ম্যাজিক তো ছিলই, তা ছাড়া ফ্রি কিক কিংবা ওয়ান টু ওয়ানে তিনি নষ্ট করেছেন সহজ সুযোগ।
ম্যাচ শুরুর আগে বলা হচ্ছিল লড়াইটা হবে মেসি বনাম ভোজিনহার। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার বার কয়েক মেসিকে হতাশ করলেও অক্ষত রাখতে পারেননি গোলবার। ২৯ মিনিটে জাল খুঁজে নিয়ে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নকআউটে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েছেন মেসি। সব মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে টানা আট ম্যাচে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও আর্জেন্টাইন তারকা। এই বিশ্বকাপে ৭ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সবার ওপরে। টানা দুই বিশ্বকাপে অন্তত ৭ গোল দেওয়া একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি।
অবশ্য ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে ভাবেন না মেসি। দলীয় সাফল্যই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই দলীয় পারফরম্যান্সেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তবু শেষ পর্যন্ত জয় এসেছে, এটিই হয়তো বড় তৃপ্তি। আর সেই জয়ের মধ্যেই মেসি দেখছেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা— বড়-ছোট দলের তফাত আগের মতো নেই। নামের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সই এখন আসল পরিচয়।
নকআউট পর্বে কোনো দল কাউকে ছাড় দেয় না। প্রতিটি ম্যাচেই নতুন লড়াই, যেখানে এক মুহূর্তের ভুল বদলে দিতে পারে পুরো অবস্থান। তাই জয়ের আনন্দে ভেসে না গিয়ে ভুলগুলো খুঁজে বের করতেই বেশি আগ্রহী আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা তাদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। কিন্তু এই ম্যাচ আরেকবার প্রমাণ করল, চ্যাম্পিয়নদের আসল শক্তি শুধু সুন্দর ফুটবলে নয়, শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতায়। আর সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিধ্বনি শোনা গেল মেসির কণ্ঠে— ‘এই আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে।’