Image description

একটি দেশের পেশাদার কূটনীতিক দলের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তারা এমনভাবে আলোচনা পরিচালনা করেন যেখানে ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন কূটনীতি এখন এক অদ্ভুত সংকটে পড়েছে।

 

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখন এমন এক দলের হাতে, যাদের নেতৃত্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং দুজন আবাসন ব্যবসায়ী। এই দুই ব্যবসায়ীর আবার ক্রিপ্টোকারেন্সির ‘পার্শ্বব্যবসা’ রয়েছে।

 

জ্যারেড কুশনার ও স্টিভেন উইটকফ উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য মোটেও উপযুক্ত নন। কুশনারের প্রধান পরিচয়—তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা। এই পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে জায়গা করে নিয়েছেন। কুশনারের পরিবারের ওপর ট্রাম্পের এই আনুকূল্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। কুশনারের বাবা চার্লস কুশনার ২০০৫ সালে এক মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে ২০২৫ সালে ফ্রান্সে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেন।

 

অন্যদিকে, স্টিভেন উইটকফের অভিজ্ঞতা আরও সীমিত। ট্রাম্পের চোখে উইটকফের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো—তিনি ৭০টিরও বেশি আবাসন প্রকল্পের অর্থায়ন ও নির্মাণ কাজ তদারকি করেছেন।

 

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ব্যবসায়িক আলোচনার অভিজ্ঞতা কূটনীতিতে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু কুশনার ও উইটকফের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাবই একমাত্র সমস্যা নয়। এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ।

 

২০২১ সালে কুশনার ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’ নামে একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়েন। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদ রয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের সরকারি তহবিল থেকে। এমনকি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যখন ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা তুঙ্গে, তখনও কুশনার উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছেন।

 

একই অবস্থা স্টিভেন উইটকফেরও। ২০২৪ সালে তিনি ট্রাম্প পরিবারের একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র চার দিন আগে এই প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি কোম্পানি।

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্র থেকে কোনো উপহার বা অর্থ গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু কুশনার ও উইটকফের ক্ষেত্রে এই ‘স্বার্থের সংঘাত’ খুবই স্পষ্ট। একদিকে তারা আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা করছেন, অন্যদিকে ওই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছ থেকে নিজেদের ব্যবসার জন্য বিনিয়োগ নিচ্ছেন। এটি মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের নিরপেক্ষতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে আমেরিকার প্রকৃত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ বড় হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

ইসরায়েলের সঙ্গেও কুশনারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ব্যক্তিগত। তার পারিবারিক ফাউন্ডেশন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে নিয়মিত বিপুল অর্থ সাহায্য দেয়। এমনকি কূটনৈতিক আলোচনার সময়ও কুশনারকে প্রকাশ্যে ইসরায়েলি সেনাদের প্রশংসা করতে দেখা গেছে।

 

গাজাকে কুশনার ও উইটকফ মূলত একটি রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন। কুশনার গাজার জন্য ‘প্রজেক্ট সানরাইজ’ নামে একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এর আওতায় গাজার উপকূলীয় এলাকাকে বিলাসবহুল হোটেলে রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে। আর সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য থাকবে আলাদা শিল্পাঞ্চল ও আবাসন এলাকা, যেখানে তাদের চলাচল থাকবে নিয়ন্ত্রিত।

 

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের মতে, কুশনারের পরিকল্পনা সফল হলে আগামী ১০ বছরে গাজার উপকূলীয় এলাকার ৭০ শতাংশ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে।

 

পেশাদার মার্কিন কূটনীতিকরা অতীতে অনেক ভুল করেছেন ঠিকই, কিন্তু তারা দেশের স্বার্থে কাজ করার চেষ্টা করতেন। এখন কুশনার ও উইটকফের মতো ব্যক্তিদের কারণে ওয়াশিংটনের কূটনীতিক মহলে উপহাস চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন বুঝতে পারছে যে, আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার চেয়ে কুশনার বা উইটকফের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়তো বেশি ফলপ্রসূ।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে একটি চুক্তি চান। কিন্তু কুশনার ও উইটকফের মতো অনভিজ্ঞ ও ব্যবসায়িক স্বার্থে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের করা চুক্তিগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সাময়িকভাবে লাভজনক মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত চুক্তিগুলো বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্পের আস্থাভাজন হওয়ায় তারা হয়তো দ্রুত চুক্তি করতে পারবেন, কিন্তু সেই চুক্তিগুলো আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে।

 


আলজাজিরা থেকে অনূদিত

লেখক: জশ পল ‘এ নিউ পলিসি’ নামক একটি অলাভজনক ও নির্দলীয় সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই সংস্থাটি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল বিষয়ে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে। তিনি এর আগে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে গাজা ইস্যুতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন।