Image description

৪৪ বছর আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অন্যতম বিতর্কিত ঘটনার শিকার হয়েছিল আলজেরিয়া। পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সেই কুখ্যাত ‘গিজনের কেলেঙ্কারি’ তাদের কেড়ে নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট। ইতিহাসের সেই ক্ষত নিয়েই এবার আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি শুধু নকআউটে ওঠার লড়াই নয়, আলজেরিয়ার কাছে এটি ৪৪ বছর আগের এক অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ারও সুযোগ।

১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের সেই ঘটনাকে আজও ফুটবল ইতিহাসে ‘গিজনের কেলেঙ্কারি’ বা ‘লজ্জার ম্যাচ’ হিসেবে স্মরণ করা হয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি জানত, অস্ট্রিয়াকে ১ বা ২ গোলের ব্যবধানে হারাতে পারলেই দুই দলই দ্বিতীয় পর্বে উঠবে এবং বিদায় নেবে আলজেরিয়া।

ম্যাচের ১০ মিনিটে হর্স্ট হ্রুবেশের গোলে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। এরপর প্রায় ৮০ মিনিট দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল ছেড়ে নিজেদের মধ্যে বল আদান-প্রদান করতে থাকে। গ্যালারিতে বসা দর্শকরা তখন ক্ষোভে শিষ দিতে থাকেন এবং 'আলজেরিয়া' ও 'প্রতারণা' বলে চিৎকার করেন।

পরদিন ব্রাজিলের সংবাদপত্র ও গ্লোবো ম্যাচটি নিয়ে লিখেছিল, 'এটি ফুটবল ম্যাচের চেয়ে স্বার্থের ম্যাচ ছিল। মাত্র ১০ মিনিটের প্রচেষ্টা ও কৌশল দেখা গেছে আর বাকি ৮০ মিনিট গোলের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা ছিল। আসল প্রতিযোগিতা এত কম সময় হয়েছে যে কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত বা দলীয় মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এটাও আশ্চর্যজনক যে, জার্মানির গোলের সময় অস্ট্রিয়ার কোনো খেলোয়াড় হ্রুবেশকে পাহারা দেননি, যিনি বক্সে একদম ফাঁকা অবস্থায় ঢুকে লিটবার্সকির ক্রস থেকে যেভাবে খুশি গোল করেন।'

জার্মান টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার এবারহার্ড স্ট্যানজেকও ম্যাচের শেষ দিকে লাইভ ধারাভাষ্য দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, 'মাঠে যে দৃশ্য উন্মোচিত হচ্ছে, তার বিস্তারিত বিবরণ না দেওয়ার জন্য আপনারা নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন। এখানে যা ঘটছে তা অত্যন্ত লজ্জাজনক; এটি প্রকাশ করার আর কোনো ভাষা নেই।'

অস্ট্রিয়ার ওআরএফ চ্যানেলের ধারাভাষ্যকার রবার্ট সিগার নিজের দলের পারফরম্যান্স নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'অস্ট্রিয়া দল যেভাবে খেলছে, তার জন্য আমি লজ্জিত।'

সেই ম্যাচের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা। এরপর থেকেই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের সব ম্যাচ একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম চালু হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপে আবারও একই গ্রুপে পড়েছে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া। শনিবার কানসাস সিটিতে মুখোমুখি হবে দুই দল। যদিও বর্তমান প্রজন্মের কোনো খেলোয়াড়ই ১৯৮২ সালের সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, তবু আলজেরিয়ার ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচের আলাদা আবেগ রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রুপ ‘জে’-এর সমীকরণও বেশ জটিল। আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয় হওয়া দলকে শেষ ৩২-এ শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে তৃতীয় হওয়া দলের প্রতিপক্ষ হতে পারে তুলনামূলক সহজ কোনো দল। তাই এই ম্যাচের ফল শুধু গ্রুপের অবস্থানই নয়, নকআউটের পথও নির্ধারণ করবে।

তবে আলজেরীয় সাংবাদিক রফিক তাজ মনে করেন, সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ফলের চেষ্টা করবে না তার দেশের দল। তিনি লিখেছেন, 'এমন একটি দৃশ্য কি সত্যিই ভাবা যায়? ভালো করে দেখলে এর কোনো সুযোগ নেই। প্রথমত, মাত্র আটটি সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল পরের রাউন্ডে যাবে, তাই ৩ পয়েন্ট নিয়ে থাকাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'যদিও অস্ট্রিয়া ১৯৮২ সালের সেই লজ্জার ম্যাচে জড়িত ছিল, আলজেরিয়া তার পুরো ইতিহাসে কখনো এমন কোনো পথ বেছে নেয়নি। আলজেরিয়া বিশ্বকাপে তাদের তিনটি ম্যাচই কেবল জেতার উদ্দেশ্যে মাঠে নামবে, কোনো সমীকরণ মেলাতে যাবে না। যদি তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের মুখোমুখি হতেও হয়, আলজেরিয়ানরা বুক চিতিয়ে লড়বে। হয় তারা পরের রাউন্ডে যাবে, যা হবে এক ঐতিহাসিক অর্জন, না হয় তারা ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে যেভাবে বীরের মতো লড়েছিল, সেভাবেই সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেবে।'

অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার কোচ রাল্ফ রাঙ্গনিক অতীতের ঘটনাকে বর্তমান ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি নন। শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, '১৯৮২ সালে বর্তমান দলের কোনো খেলোয়াড়ই বেঁচে ছিলেন না। আমি তখন মাত্র একজন খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করছিলাম। ওটা অনেক আগের কথা এবং আগামীকালের ম্যাচের ফলাফলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। গত কয়েক মাস ধরে আমরা এই বিষয়ে অনেক কিছু পড়েছি, তবে আমার মনে হয় না এটি আগামীকালের খেলায় কোনো প্রভাব ফেলবে।'

তবু ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়। আলজেরিয়ার জন্য এটি ৪৪ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো এক অপমানের জবাব দেওয়ার সুযোগও।