Image description

১০ নম্বর জার্সি। বললে কিংবদন্তি ফুটবলারদের মুখ ভেসে ওঠে। পেলে, ম্যারাডোনা থেকে মিশেল প্লাতিনি, জিনেদিন জিদান কিংবা মেসি-নেইমার-এমবাপ্পেরা যার মধ্যমণি। সবুজ গালিচার মতো মাঠে সেই জার্সিটা ঢেউ খেলিয়ে উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাদুকরি সব মুহূর্ত। অনেকেই হয়তো জানেন না, কিংবদন্তি এই জার্সির ‘জন্ম’ অনেক বড় এক ভুল থেকে।

পেলের আবির্ভাবের আগে ১০ নম্বর জার্সি ছিল নিছক একটা সংখ্যা। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন সময়মতো খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বরের তালিকা জমা দিতে পারেনি। অগত্যা লোরেঞ্জো ভিলিজিও নামে ফিফার এক কর্তা ফুটবলারদের মধ্যে ১ থেকে ২২ নম্বর জার্সি লটারির মাধ্যমে বণ্টন করেন। গোলরক্ষক গিলমার পান ৩ নম্বর। ডিফেন্ডার জোজিমোর ভাগ্যে জোটে ৯ নম্বর। ঘটনাচক্রে ১০ নম্বর জার্সি চলে যায় ১৭ বছর বয়সি এক কিশোর ফুটবলারের কাছে। যার নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। বিশ্বজুড়ে সবাই যাকে একবাক্যে পেলে নামে চেনে।

চোটের কারণে শুরুতে বেঞ্চে ছিলেন। তবে মাঠে নামার পর বিশ্বকাপ মাতিয়ে তোলেন পেলে। ওয়েলসের বিপক্ষে গোল, ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক, আয়োজক সুইডেনের সঙ্গে ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বজয়ের শিরোপা এনে দেন। মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসাবেও ইতিহাস গড়েন। এরপর থেকে পেলে এবং ১০ নম্বর জার্সি একে অপরের পরিপূরক হয়ে যায়।

 

অনেকেই বলেন, ব্রাজিল যদি সময়মতো জার্সি তালিকা জমা দিত, তাহলে পেলে হয়তো অন্য কোনও নম্বরের জার্সি পরতেন। একেবারে অকাট্য যুক্তি। ১৯৫৭ সাল। তখনও জাতীয় দলে সুযোগ পাননি ‘কালো মানিক’। ১৯৫৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সান্তোস এফসির হয়ে অভিষেক হয়েছিল পেলের। প্রতিপক্ষ করিন্থিয়ানস। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বদলি খেলোয়াড় হিসাবে মাঠে নেমেছিলেন। অভিষেক ম্যাচেই গোল করে দলের ৭-১ ব্যবধানের জয়ে অবদান রেখেছিলেন। ওই সময় ১০ নম্বর জার্সি পরতেন ভাসকোনসেলোস। তবে সাও পাওলোর বিপক্ষে তার পা ভেঙে যায়। ১৯৫৭ সালের শুরুতে সুইডেনের একটি ক্লাবের বিরুদ্ধে সান্তোসের ১০ নম্বর জার্সি পরে প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন পেলে। যদিও তখনও সেই জার্সি পেলের জন্য শিরোধার্য ছিল না। অথচ ব্রাজিল ফেডারেশনের সেই ‘ভুল’ই ১০ নম্বর জার্সিকে পেলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে দেয়। এই জার্সি পরেই পেলে জিতেছেন তিন-তিনটি বিশ্বকাপ।

 
 

 

যে ‘ভুল’ থেকেই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে ১০ নম্বর জার্সি, জানলে অবাক হবেন

 

 

দশের গৌরব এখনও শেষ নয়। ১৯৬৮ সালের কথা। ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ ব্রাজিল সফরে যান। তার সম্মানে সাও পাওলো একাদশ ও রিও ডি জেনেইরো একাদশের মধ্যে আয়োজিত হয় একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। ৩-১ গোলে জেতে সাও পাওলো। একটি গোলও করেন পেলে। ম্যাচ শেষে রানির কাছ থেকে তিনি পুরস্কার নেন। তার পরনে ছিল ১০ নম্বর জার্সি। সান্তোসের পর বিভিন্ন ক্লাবে খেললেও ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে তার সখ্যতা কমেনি।

শুরুর দিকে জার্সি নম্বর মাঠের অবস্থান অনুযায়ী ফুটবলারদের দেওয়া হত। তখন ১০ নম্বর জার্সি পরতেন সাধারণত সেই খেলোয়াড়, যিনি মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতেন। আক্রমণ গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা নিতেন। সময়ের সঙ্গে আরও আধুনিক হয়েছে ফুটবল। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সির গুরুত্ব কমেনি। সময়ের সঙ্গে এই জার্সি দলের সেরা ফুটবলারের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

পেলের পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সির মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দেন দিয়েগো মারাদোনা। তার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদান ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ জিতিয়ে ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যান। একইভাবে ব্রাজিলের রিভাল্ডো ও রোনাল্ডিনহো ১০ নম্বর জার্সির গৌরব অটুট রাখেন। ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে এই দশ নম্বরের ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন লিওনেল মেসি। কিলিয়ান এমবাপে, নেইমারের মতো তারকারাও মাঠ মাতান ১০ নম্বর জার্সি পরে। মাঝেমাঝে ভুলও তৈরি করে ইতিহাস। ভুল না হলে হয়তো ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে এত রূপকথার জন্মই হত না।