ফুটবলে মেসির জাদু দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব। বিশ্বকাপেও বাদ পড়েনি মেসি ম্যানিয়া।
নিউ জার্সি, এমনকি ফিলাডেলফিয়াতেও যখন ছিলাম, হাতঘড়ির দিকে তাকালে সময়ের হিসাবটা একদম সোজা ছিল, ভারতের সঙ্গে সময়ের পার্থক্যটা সাড়ে নয় ঘণ্টার।
সে আমেরিকার টাইম জোন যা-ই হোক না কেন, মেসির ‘টাইম জোনে’ জনপ্রিয়তার কোনো বিভাজন নেই। তা চলছে অশ্বমেধের ঘোড়ার গতিতে। ডালাস বিমানবন্দরে নেমেই যার সঙ্গে প্রথম কথা হলো, তিনি মাইক ওকোরো। ঠিকই ধরেছেন, একদা ইস্ট বেঙ্গলের আশিয়ান জয়ের অন্যতম স্থপতি, মাইক ওকোরো। ‘তুমি কি কোনোভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচের একটি টিকিট জোগাড় করে দিতে পারবে?’ বুঝুন তাহলে অবস্থা।
ডালাসে পা দিয়ে অন্তত এটুকু বুঝে গিয়েছি, মাইক ওকোরোর সেই মসৃণ ড্রিবল সামলানোর চেয়েও এখন কঠিন কাজ, ডালাসের বুকে আর্জেন্টিনা ম্যাচের একটা টিকিট সংগ্রহ করা।
আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচ কাভার করতে ডালাসে আসা টিওয়াইসি সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল বলছিলেন, চার বছর আগে কাতারে জেতা বিশ্বকাপটি দুই হাত উঁচু করে মেসি ধরে আছেন। আর মেসির বুকে খোদাই করা আছে আর্জেন্টিনার তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের প্রতীক, ‘তিনতারা’।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মেসির হ্যাটট্রিকের ঠিক আগের দিনই আর্জেন্টিনায় মেসির বিশাল মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ঠিক এখন কেন? গ্যাব্রিয়েল যা জানালেন, তার সারমর্ম হলো, বিশ্বের সব প্রান্তের সবাই মেসির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে চাই। যেমন কোঁত্রাল শহরের মেয়র রামন রিওসেকো জানিয়েছেন, ঠিক এই সময় মেসির মূর্তি স্থাপনের আসল কারণ। পাতাগোনিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে এমন কিছু জিনিস নেই, যা পর্যটকদের আকর্ষিত করে শহরে নিয়ে আসতে পারে। আর তাই মরুভূমির বুকে বসিয়ে দেওয়া হল বিশ্বে মেসির সবচেয়ে বড় ভাস্কর্যটিকে। যাতে কাতারে কাতারে মেসি-ভক্তরা এই ভাস্কর্য দর্শনে কোঁত্রাল শহরে ছুটে আসে।
মেসিকে নিয়ে খোদ আর্জেন্টিনায় যদি এরকম হয়। তাহলে অনুমান করুন, যে শহরে মেসি খেলতে আসছেন। সেই ডালাসে মেসিকে ঘিরে কী হতে পারে?
কানসাসেস বেসক্যাম্পে প্র্যাকটিস করে বিকেলের দিকে ডালাসে আসবে আর্জেন্টিনা। তার পরই অস্ট্রিয়া ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনে আসবেন কোচ স্কালোনি। সঙ্গে অবশ্যই একজন ফুটবলার।
সেই ফুটবলারটি মেসি হবে কি না, এখনো জানা যায়নি। তবে ডালাসে মেসির পদার্পণের অনেক আগেই আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ করে মায়ামি থেকে হাজার হাজার আর্জেন্টিনার ভক্তরা ডালাসে চলে এসেছেন। শহরে, রাস্তায়, হোটেলে শুধুই ১০ নম্বর জার্সি পরে লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন। টিকিটের দামও সে রকম আকাশচুম্বী।
ডালাসের মাটিতে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে স্রেফ একটি গোল করতে পারলেই ১৭ গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নাম প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। আর সেই কারণেই বিশ্বফুটবলের এই চিরকালীন অমর মুহূর্তটির সাক্ষী থাকার জন্যই সবার মধ্যে একটি ম্যাচ টিকিট সংগ্রহ নিয়ে এরকম পাগলের মতো ব্যাকুলতা। সেই কারণে এই মুহূর্তে ডালাসে চাকরি করা মাইক ওকোরোও সন্ধান করছেন একটা মেসি ম্যাচের টিকিটের। আর এই কাজটা যে তার ড্রিবলের মতো এত সহজ কাজ নয়, তা এতক্ষণে বুঝে গিয়েছেন প্রাক্তন ইস্ট বেঙ্গল তারকা।
কারণ এই মুহূর্তে যদি আর্জেন্টিনা ম্যাচের কোনো টিকিট পাওয়া যায়, তাহলে তার সর্বনিম্ন মূল্য দাঁড়িয়েছে, খুব কম করে হলেও ‘আড়াই হাজার ডলার।’
আর মোটামুটি ভালো আসনের জন্য টিকিটের দাম, প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ডলার। শুধু এই একজন ফুটবলারকে কেন্দ্র করেই ডলার উড়ছে আমেরিকা বিশ্বকাপে।
ডালাসের, ফোর্ট ওয়ার্থ মেট্রোপ্লেক্স এলাকাটি আমেরিকার ফাইনান্সিয়াল হাব। আমেরিকান এয়ারলাইনস, এক্সনমোবিল-সহ বহু বড় কোম্পানির সদর দফতর এখানে। আর ১৯৩০-র দিকে টেক্সাসে প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে ডালাস এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী শহর। ফলে এহেন অঞ্চলে মেসি দর্শনের জন্য ডলার উড়বে। বলাই বাহুল্য।
আর প্রশাসনও চুপ করে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারছে না। সবাই যে সোমবার মাঠে ঢোকার সুযোগ পাবে, এর কোনও গ্যারান্টি নেই। ফলে ডালাস শহরটির বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়েছে জায়ান্ট স্ক্রিন। আর সেখানেই হাজির হওয়া আর্জেন্টাইন ফ্যানদের রাস্তাঘাটে সামলানোটাই এখন সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ ডালাস প্রশাসনের। আর এই সব কিছুর কেন্দ্রেই একটা নাম ঘোরা ফেরা করছে ডালাসে। লিওনেল মেসি।