Image description

ফিফা বিশ্বকাপে আজ সকালে দলটি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে গিয়েও ২-১ ব্যবধানে হেরে গেছে। হেরে যাওয়া এই দলকে কয়েক বছর আগে সবাই চেক প্রজাতন্ত্র (Czech Republic) নামে চিনতেন।

কিন্তু আজ টিভি স্ক্রিনে দেখানো হলো চেকিয়া (Czechia)। 

 

তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, মধ্য ইউরোপের এই দেশের আসল নাম কোনটি? উত্তর—চেক প্রজাতন্ত্র-চেকিয়া দুটি নামই সঠিক। তবে এদের ব্যবহার ও ইতিহাস ভিন্ন। 

এখন প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের দুটি নাম কেন? এ জন্য ফিরে যেতে হবে শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে।

 

 

আজকের চেকিয়া এক সময় ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার (Czechoslovakia) অংশ। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন হয়। তখন চেক ও স্লোভাক জনগোষ্ঠী মিলে চেকোস্লোভাকিয়া রাষ্ট্র গঠন করে।

Map
১৯৯৩ সালে শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে যায় চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া।
ছবি: সংগৃহীত

কয়েক দশক একসঙ্গে থাকার পর ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে চেক ও স্লোভাক জনগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। এই ঘটনাকে চেকোস্লোভাকিয়ার বিলুপ্তি বা ভেলভেট ডিভোর্স বলা হয়।

কেন এই দ্বৈত নাম?

আন্তর্জাতিকভাবে বেশিরভাগ দেশের দুটি নাম থাকে—একটি দাপ্তরিক, সাংবিধানিক বা দীর্ঘ নাম, আরেকটি ভৌগোলিক বা সংক্ষিপ্ত নাম। যেমন: বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। জার্মানির আনুষ্ঠানিক নাম ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি

এ ধরনের সংক্ষিপ্ত নাম আমরা প্রতিনিয়ত বলে থাকি। 

 

কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রম। ১৯৯৩ সালে আলাদা হওয়ার পর চেক প্রজাতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত ইংরেজি নাম ছিল না। শুধু চেক ভাষায় সংক্ষিপ্ত নাম ছিল চেসকো। কিন্তু ইংরেজিতে এর গ্রহণযোগ্য নাম কী হবে, তা নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিতর্ক চলেছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে দীর্ঘ নাম চেক প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করে আসছিল।

বছরের পর বছর ধরে দেশটির নীতি নির্ধারকরা অনুভব করছিলেন যে, বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং বা খেলাধুলার মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে চেক প্রজাতন্ত্র নামটি দীর্ঘ ও খাপছাড়া মনে হয়। এর সমাধান হিসাবে তারা চেকিয়া নামকরণের প্রস্তাব দেন।

২০১৬ সালে দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে চেকিয়াকে তাদের সংক্ষিপ্ত নাম হিসাবে নিবন্ধিত করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ ভৌগোলিক নামের তথ্যভাণ্ডারে চেকিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। 

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশটিতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এমনকি চেক প্রবাসীরাও প্রতিবাদ জানান। অনেকে তখন দাবি করেন, চেকিয়া নামটি শ্রুতিমধুর নয়।

তবে বিপরীত পক্ষ দাবি করে, বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিচয় সহজ করার জন্য সংক্ষিপ্ত নাম থাকা অপরিহার্য। যৌক্তিক দাবি হিসাবে তারা সামনে আনে এক সময় একত্র হয়ে থাকা স্লোভাকিয়াকে। স্লোভাকদের দেশ স্লোভাকিয়া আর চেকদের দেশ চেকিয়া।

তবু দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে শুধু করে অনেক রাজনীতিবিদ চেকিয়া নাম গ্রহণ করতে অনীহা দেখান। আপত্তির কারণ হিসাবে সামনে আনা হয় কয়েকটি বিষয়—

》প্রায় ২৩ বছর ধরে মানুষ চেক প্রজাতন্ত্র নামটির সঙ্গে পরিচিত ছিল। হঠাৎ চেকিয়া নামের ব্যবহার অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগতে পারে। যেমনটা আজ ফুটবলপ্রেমীদের মনে হয়েছে। 

》ইংরেজি ভাষাভাষীর অনেকে চেকিয়ার উচ্চারণ নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। কেউ চেচিয়া, কেউ চেজিয়া আবার কেউ অন্যভাবে উচ্চারণ করতেন। 

》অনেকের ধারণা ছিল, চেক প্রজাতন্ত্র নামটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নতুন নাম চেকিয়া ব্যবহার করলেই বরং আন্তর্জাতিক পরিচিতি দুর্বল হতে পারে।

এত দ্বিধা সৃষ্টি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দুটিকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দাপ্তরিক নাম চেক প্রজাতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত নাম চেকিয়া। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি বোহেমিয়া নামেও পরিচিত। 

pp
দেশটির পাসপোর্টে এখনো চেক প্রজাতন্ত্র নাম ব্যবহার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

তবে রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, আইনি দলিল, চুক্তি বা পাসপোর্টে এখনো পূর্ণাঙ্গ নাম চেক প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করা হয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে একটি দেশের সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করাই আন্তর্জাতিক রীতি। তাই কয়েক বছর ধরে চেকিয়া নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে। 

মজার ব্যাপার হলো, এই নামকরণ করার পর দেশটি এবারই প্রথম ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে। তাই অনেকে আজ স্কোরলাইনে চেক প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে চেকিয়া দেখে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। চেক প্রজাতন্ত্র নাম থাকতেও দেশটি একবারই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে; ২০০৬ সালে। 

তবে চেক ও স্লোভাকরা একত্র হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া থাকা অবস্থায় তারা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছে—১৯৩৮ ও ১৯৬২ সালে। দুবারই রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।