ঘটনাটি ঘটেছিল পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে। আফ্রিকান ডিফেন্ডার মিউপু ইলুঙ্গার এক অদ্ভুত কাণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে তখন প্রবল আলোচনা। কিন্তু অনেকেই জানতেন না, এই ঘটনার পেছনে ছিল ভয়ংকর এক ইতিহাস!
এবারের ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে প্রথমবারের মত ‘গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো’ নামে অংশগ্রহণ করবে আফ্রিকার দেশটি। এর আগে ১৯৭৪ সালে ‘জায়ারে’ নামে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল।
সে সময় দলটি তিনটি ম্যাচেই হারে এবং ১৪টি গোল হজম করে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়েছিল। ব্রাজিলের বিপক্ষে আসরে নিজেদের শেষ ম্যাচের আগে আফ্রিকান খেলোয়াড়রা দেশটির স্বৈরশাসকের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছিলেন।
জায়ারে শাসন করতেন স্বৈরশাসক এমবুতু সেসে সেকো, যিনি জাতীয়তাবাদ ও তার শাসনব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ফুটবলকে ব্যবহার করতেন। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য খেলোয়াড়দের যোগ্যতা অর্জনে উৎসাহিত করতে এমবুতু গাড়ি, বাড়ি এবং বড় অঙ্কের আর্থিক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
জায়ারে বিশ্বকাপে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে পরাজিত হয়। খেলার পর আফ্রিকান দলটির ভালো পারফরম্যান্স হওয়া সত্ত্বেও, খেলোয়াড়রা জানতে পারেন প্রতিশ্রুত অর্থ দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেছে।

খেলোয়াড়রা ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তী ম্যাচে মাঠে না নামার হুমকি দেয়। ফিফা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে জায়ারে দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য মাঠে নামে। কিন্তু মাঠের বাইরের সমস্যায় মনোবল হারিয়ে দলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় পরাজয়ের শিকার হয়। যুগোস্লাভিয়ার কাছে তারা ৯-০ গোলে হেরে যায়।
খেলার ২০ মিনিটের মধ্যেই ইউরোপীয় দলটি তিন গোলে এগিয়ে থাকায় জায়ারের কোচ ব্লাগোয়ে ভিদিনিচ গোলরক্ষক কাজিদির বদলে তার ১.৬২ মিটার লম্বা বদলি খেলোয়াড় দিম্বি তুবিলান্ডুকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রত্যাশিতভাবেই, এই পরিবর্তনে দলের পারফরম্যান্সের কোনো উন্নতি হয়নি। এটি ছিল বিশ্বকাপে যুগোস্লাভ জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জয় এবং সেই সময় পর্যন্ত টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরাজয়, যা ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হাঙ্গেরির জয়ের ব্যবধানের পুনরাবৃত্তি করেছিল।
এই অপমান স্বৈরশাসক এমবুতুকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি ভাবেন তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ পশ্চিম জার্মানিতে যাননি। এমবুতু জায়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দলকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন, যার মধ্যে সরকারি মন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সেই শোচনীয় পরাজয়ের পর, দেশটির স্বৈরশাসক দলটির কাছে রাষ্ট্রপতির রক্ষীদের পাঠিয়ে হুমকিস্বরূপ বলেন, ‘যদি তারা ব্রাজিলের কাছে চার বা তার বেশি গোলে হেরে যায়, তবে তাদের জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, অথবা তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে’- যার মধ্যে কারাদণ্ড এবং পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ম্যাচটি ৩-০ গোলে জিতে যায়। যদিও সেই বিশ্বকাপের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন বেকেনবাওয়ার, ক্রুইফ এবং জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য খেলোয়াড়রা, যারা ১৯৭৪ সালের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তারপরও জায়ারের একজন খেলোয়াড় তার একটি অদ্ভুত ঘটনার জন্য স্মরণীয় হয়ে ছিলেন।

আফ্রিকান দলটি ব্রাজিলের বিপক্ষে সম্পূর্ণ আতঙ্কিত অবস্থায় মাঠে প্রবেশ করে। যোগ্যতা অর্জনের জন্য ব্রাজিলিয়ান দলটির বড় ব্যবধানে জেতা প্রয়োজন ছিল এবং তারা ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ৩৩ মিনিটের মধ্যেই ব্রাজিলিয়ানরা ৩-০ গোলে এগিয়ে যায়, যার অর্থ ছিল জায়ারের খেলোয়াড়দের ভাগ্য নির্ধারণ করতে তাদের আর মাত্র একটি গোল প্রয়োজন ছিল।
খেলার সেই মুহূর্তে ব্রাজিলের পক্ষে একটি বিপজ্জনক ফাউলের ডাক দেওয়া হয় এবং রিভেলিনো যখন কিকটি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন ডিফেন্ডার মেপু ইলুঙ্গা মানবপ্রাচীর থেকে বেরিয়ে এসে কিক নেওয়ার আগেই বলটি বাইরে পাঠিয়ে দেন। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণ এই ঘটনাটিকে এমনভাবে উপহাস করেছে যেন ইলুঙ্গা নিয়মকানুন না জেনেই কাজটি করেছিলেন।
বহু বছর পর, সেই ডিফেন্ডার এবং ইতিহাসবিদরা এই খেলার পেছনের আসল কারণটি প্রকাশ করেন। ব্রাজিল আরেকটি গোল করে ফেলবে এই ভয়ে ইলুঙ্গা সময়ক্ষেপণ করছিলেন। তিনি ২০১৫ সালে মারা যান।
২০১০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আফ্রিকান ফুটবলার বলেন, ‘আমি এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করেছিলাম। যারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছিল তারা যখন ভিআইপি বক্সে বসে খেলা দেখছিল, সেই অবস্থায় নিজেকে ক্রমাগত আঘাত করার কোনো কারণ আমার ছিল না।’
জায়ারে এবং আজকের সেই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর ফুটবলাররা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বকাপে ভালো কিছু করবে এমনটাই আশা দেশটির জনগণের।