Image description

বাংলাদেশের ফুটবলের ম্যাজিকম্যান হামজা চৌধুরী। তার ছোঁয়ায় ফুটবল জেগেছে, আগ্রহ বেড়েছে মানুষের। একই সঙ্গে তাকে দেখে লাল-সবুজ জার্সিতে উৎসাহী হয়েছেন অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার। সুবাদে মাঠের খেলায়ও হয়েছে পরিবর্তন। এখন ড্র কিংবা হারের জন্য মাঠে নামে না বাংলাদেশ। এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে মূল পর্বে খেলার স্বপ্ন পূরণ না হলেও তাদের লড়াই ও জেতার আকাঙ্ক্ষায় স্পষ্ট হয়েছে দিন বদলের ছবিটি। বাংলাদেশের ফুটবলে এক বছরের অধ্যায় এবং সামনের বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আগামীর সময়ের সুদীপ্ত আনন্দর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেছেন হামজা।

প্রশ্ন: আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই। এক বছরের বেশি সময় বাংলাদেশ দলে খেলছেন। দল নিয়ে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণটা জানতে চাই।

হামজা চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ। সত্যি বলতে খুব ভালো (অভিজ্ঞতা)। আমি আসার আগে যা ভেবেছিলাম, দেশি খেলোয়াড়দের মান আমার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই খুবই ক্ষুধার্ত সাফল্যের জন্য, দেশের হয়ে খেলতে অনুপ্রাণিত বোধ করি। এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বের পুরোটা জুড়ে আপনারা দেখেছেন আমাদের অভিজ্ঞতা বেড়েছে এবং দল হিসেবে আরও ভালো খেলছি।

প্রশ্ন: দেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। মানের দিক থেকে তারা আপনার চেয়ে পিছিয়ে— কখনো কি এরকম মনে হয়েছে?

হামজা চৌধুরী: একদমই না। আমাদের সবসময় নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমরা একটা দল, সবাই আমার সতীর্থ। একটাই ব্যবধান হতে পারে যে আমি ইংল্যান্ডে জন্মেছি আর তারা বাংলাদেশে। আমার চোখে এ ছাড়া কোনো ব্যবধান নেই।

প্রশ্ন: দেশের ঘরোয়া ফুটবল মানের একটা ধারণা নিশ্চয়ই এর মধ্যে পেয়েছেন। এখানে কি কোনো ঘাটতি খুঁজে পেয়েছেন?

হামজা চৌধুরী: আবারও বলছি, পার্থক্য শুধু অভিজ্ঞতায়। অনেকের হয়তো চাপের মুখে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। অনেকের বড় ম্যাচ খেলার বেশি অভিজ্ঞতা নেই। তা ঘরের মাঠে হোক বা সুন্দর কোনো স্টেডিয়ামে। আমি যখন তরুণ ছিলাম ১৭ বা ১৮ বছর বয়স, তখন যে ভুলগুলো করতাম, এখনো তাদের কয়েকজনকে সেগুলো করতে দেখি। সে বয়সে আমিও জানতাম না কীভাবে কঠিন মুহূর্তগুলো সামলাতে হয়। তবে আমরা যত বেশি বড় ম্যাচ খেলছি, দল হিসেবে তত বেশি চাপ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করছি। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের কথা যদি বলি, সেখানে ৭ হাজার বাংলাদেশি সমর্থক ছিল এবং তাদের সামনে আমরা ভালো পারফর্ম করেছি। কয়েক মুহূর্তে মনোযোগের কিছুটা ঘাটতি ছিল বলেই গোল হজম করেছিলাম। তবে প্রাপ্ত সুযোগগুলোর একটা অন্তত কাজে লাগানো উচিত ছিল আমাদের। এ ছাড়া সবসময় আমরা খুব সজাগ এবং মনোযোগী ছিলাম ম্যাচে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের সতীর্থদের মধ্যে কি এমন কেউ আছেন, যিনি দেশের বাইরে খেলার সামর্থ্য রাখেন?

হামজা চৌধুরী: সত্যি বলতে, অনেকেই আছে। আমি সবসময় বলি, ওরা শুধু দেশের বাইরে খেলার একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সাদ উদ্দিন খুব ভালো মানের ফুটবলার, সোহেল রানারও শীর্ষ পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা আছে; রাকিব হোসেন, ফাহিমও (ফয়সাল আহমেদ) ভালো। তবে অভিজ্ঞতা একটা ব্যাপার, যা একজন ফুটবলারকে বদলে দিতে পারে। এটি আমাদের অর্জন করতে হবে। ইনশাআল্লাহ আমরা একদিন পারব।

প্রশ্ন: আপনি তো পুরো দলের কথাই বলে দিলেন?

হামজা চৌধুরী: আমি তাদের সঙ্গে অনুশীলন করেছি, তাদের সঙ্গে খেলেছি, তাদের মান আমার জানা। ব্যাপারটা হলো, স্রেফ সুযোগ পাওয়া এবং কাজে লাগানো।

প্রশ্ন: এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলতে না পারার কোনো আক্ষেপ আছে?

হামজা চৌধুরী: কোনো আক্ষেপ নেই। তবে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। আরও ভালো করা উচিত ছিল। এখনো পেছনে তাকালে মনে হয় আমরা হংকং ও সিঙ্গাপুরের মাঠে ওদের চেয়ে ভালো খেলেছি। আমি এটা নিয়ে আক্ষেপ করতে চাই না। কারণ, এটি পথচলারই অংশ। আমি এই যাত্রা অনেক উপভোগ করেছি; যদিও এশিয়ান কাপ মিস করেছি। আশা করি, পরেরবার আমরা সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারব।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে মানসম্পন্ন স্ট্রাইকার নেই। ঘরোয়া ক্লাবগুলো আক্রমণভাগে বিদেশি খেলোয়াড়দের পছন্দ করে। জাতীয় দলের ভালো স্ট্রাইকার না পাওয়ার এটাই কি প্রধান কারণ?

হামজা চৌধুরী: আমার খুব বেশি ধারণা নেই বাংলাদেশের ঘরোয়া লিগ নিয়ে। তবে রাকিবের মধ্যে নিশ্চিতভাবে দারুণ কিছু জিনিস আছে। তার মধ্যে গোলের চেয়েও অনেক বেশি কিছু করার ক্ষমতা আছে। আর এটিই আমাদের দলের জন্য বেশি প্রয়োজন। আসলে অভিজ্ঞতাই আপনাকে একজন ভালো খেলোয়াড় এবং ভালো ফিনিশার হিসেবে গড়ে তোলে। দলে এমন কাউকে প্রয়োজন, যে ক্লিনিক্যালি ফিনিশ করতে পারে।

প্রশ্ন: নভেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার কথা। সে সময় সম্ভবত আপনার ক্লাবের খেলা চলবে। সাফ খেলা নিয়ে কোনো শঙ্কা আছে কি?

হামজা চৌধুরী: আমি তেমনটা মনে করি না। ওই সময় ইন্টারন্যাশনাল ব্রেক থাকবে। বিশ্বাস করুন, আমি এই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য মুখিয়ে আছি। জানি, আমাদের ওপর অনেক বড় চাপ থাকবে। আমার বিশ্বাস, সবাই মিলে দেশের জন্য দারুণ কিছু করতে পারব।

প্রশ্ন: ২০০৩ সালের পর বাংলাদেশ কখনো সাফ জেতেনি, ফাইনালও খেলেনি। এবার কি পারবে বাংলাদেশ?

হামজা চৌধুরী: অবশ্যই আমরা চেষ্টা করব। আমার মনে হয় সাফের অন্য দেশগুলোও জানে আমরা কতটা উন্নতি করেছি এবং কতটা ভালো দল। আমাদের স্রেফ মাঠে গিয়ে সবাইকে সেটা দেখাতে হবে।

প্রশ্ন: বাফুফে নতুন কোচ খুঁজছে। বাংলাদেশের জন্য কেমন কোচ পছন্দ আপনার?

হামজা চৌধুরী: এটির উত্তর দেওয়া আমার জন্য কঠিন।

প্রশ্ন: ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে আপনার খেলার অভিজ্ঞতা আছে, তাই আপনার কাছে জানতে চাওয়া...

হামজা চৌধুরী: আমার মনে হয়, হাভিয়েরের (কাবরেরা) সঙ্গে কাজটা আমি খুব উপভোগ করেছি। লেস্টারে আমি এনজোর (মারেস্কা) অধীনে খেলেছি। তার সঙ্গে হাভিয়েরের অনেক মিল। আমার মনে হয়, আমাদের দলটি তার সঙ্গে ভালো মানিয়ে নিয়েছিল। তাই এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যার প্রোফাইল ভালো এবং দল পরিচালনা করার ধরন (হাভিয়ের কাবরেরার) কাছাকাছি পর্যায়ের হবে। এরকম একজনই পারবেন আমাদের এগিয়ে নিতে এবং ইতিবাচক ধারায় ফুটবল খেলাতে। তা ছাড়া দলকে সুসংগঠিত রাখতেও একজন ভালো ম্যানেজার (কোচ) দরকার। কারণ, ম্যানেজারই দল তৈরি করেন। তাই যে ম্যানেজারই আসুক না কেন, তাকে সময় দিতে হবে দলকে গোছাতে ও খেলার স্টাইল প্রতিষ্ঠা করতে। যদি তিনি আমাদের সেভাবে খেলাতে পারেন, তবেই আমরা সফল হব।

প্রশ্ন: এবার একটু বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে আসি। বিশ্বকাপে আপনার পছন্দের দল কোনটি?

হামজা চৌধুরী: আমার অনেক বন্ধুবান্ধব ইংল্যান্ডের হয়ে খেলে, তাই আমি চাই তারা ভালো করুক। তবে ফ্রান্স এবার অসাধারণ একটি দল। তাদের আক্রমণভাগ যে অনেক শক্তিশালী, তা পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখকে দেখলেই বোঝা যায়। এ ছাড়া ব্রাজিল আমার প্রিয়, তাই আমি এই দলগুলোর ভালো করার প্রত্যাশা করি।

প্রশ্ন: চার সেমিফাইনালিস্টের নাম বলতে বললে...

হামজা চৌধুরী: স্পেন ও ফ্রান্সের পাশাপাশি ব্রাজিলকে দেখতে চাই। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের বড় সুযোগ আছে, আর চতুর্থটি...

প্রশ্ন: ইংল্যান্ড?

হামজা চৌধুরী: হ্যাঁ, ইংল্যান্ড হতে পারে।

প্রশ্ন: কিন্তু তারা তো ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ জেতেনি? কেন এমনটা হয় প্রতিবার?

হামজা চৌধুরী: ভিন্ন ভিন্ন কারণ আছে। আপনি যদি আমাদের গোল্ডেন জেনারেশনের দিকে তাকান, আমাদের অসাধারণ সব খেলোয়াড় ছিল। তবে জেতার জন্য হয়তো আমাদের সঠিক মানসিকতা ছিল না। আবার আমাদের যখন গোল্ডেন জেনারেশন ছিল, ফ্রান্স দলও তখন খুব ভালো ছিল। ব্রাজিল ছিল অবিশ্বাস্য। তাই সময়টা ঠিক পক্ষে ছিল না। আর জানেনই তো, সবকিছুই সময়ের ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন, আপনি কি স্বপ্ন দেখেন একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলবে?

হামজা চৌধুরী: ইনশাআল্লাহ। অবশ্যই বাংলাদেশ খেলবে, তবে সঠিক পথে হাঁটতে হবে। দেশের মানুষের যে আবেগ, খেলোয়াড়দের শেখার ইচ্ছা ও উন্নতির যে আগ্রহ দেখেছি, তাতে এটি অবশ্যই সম্ভব। আমি একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম (নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস), যেখানে শিশুদের অল্প বয়স থেকে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপে বা অন্য মহাদেশে খুব অল্প বয়স থেকে ফুটবল শিক্ষা শুরু হয়, এটিই ফুটবলের বেসিক শেখার আদর্শ সময়। যতটা জানি, যুব দলগুলো নিয়ে তারা (সরকার) সারা দেশে ফুটবলসহ অন্যান্য খেলার আয়োজন করছে। এটি আমাদের বিশ্বকাপে যাওয়ার জন্য বড় ভূমিকা পালন করবে।