বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া বাংলা সংবাদ তৈরি ও প্রচারের একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। নেটওয়ার্কটির সঙ্গে যুক্ত ২৯টি ক্লাউড অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
১০ সেপ্টেম্বর ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট’ নামে ১৫৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে অ্যানথ্রপিক। এতে বলা হয়, গাইবান্ধায় অবস্থানকারী একজন ব্যক্তি একাই প্রায় ১৬ মাস ধরে এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
প্ল্যাটফর্মের সীমা ও শনাক্তকরণ এড়াতে তিনি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ২৯টি ক্লাউড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন।
ভুয়া সংবাদ তৈরির জন্য ওই ব্যক্তি ‘ফেক নিউজ ৩ ডট পিওয়াই’ নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। সফটওয়্যারটি ক্লাউডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিবার ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত ভুয়া সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি প্রম্পট তৈরি করত।
অ্যানথ্রপিকের তদন্ত অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটি অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বর্ণনা এবং ছবি তৈরির জন্য ১ হাজার ৫০০টি প্রম্পট তৈরি করেছে।
ক্লাউডে তখন নিজস্ব ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য এআই মডেলের মাধ্যমে ছবি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ধারাবাহিক লাইভ সম্প্রচারের একটি নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার আওয়ামী লীগ সমর্থক ও তুলনামূলক কম সাক্ষর জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কনটেন্ট তৈরির কৌশল নেওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই এসব কনটেন্টকে ‘ফেক নিউজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।তদন্তে দেখা গেছে, কনটেন্টগুলোকে ‘হট অ্যান্ড অ্যাগ্রেসিভ’ বা উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক করার পাশাপাশি এমনভাবে তৈরি করার নির্দেশনা ছিল, যাতে গ্রামের মানুষও সহজে বুঝতে পারে। অর্থাৎ, লক্ষ্য করা দর্শক এসব কনটেন্টকে সত্যিকারের সংবাদ হিসেবে বিশ্বাস করবে—এমন উদ্দেশ্যেই প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নেটওয়ার্কটির প্রচারণা ছিল প্রায় পুরোপুরি আওয়ামী লীগপন্থি। একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি), অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়।
এসব প্রচারণায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন, তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের মিথ্যা তথ্য, হত্যা ষড়যন্ত্র ও ‘হিট স্কোয়াড’-এর কাল্পনিক গল্প, দুর্নীতি এবং গোপন রাজনৈতিক জোটের অভিযোগ ছড়ানো হয়। এছাড়া ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট এবং বিরোধী দলগুলোকে তালেবান-ধাঁচের শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
নেটওয়ার্কটি শুধু কনটেন্ট তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোডের জন্য আলাদা স্ক্রিপ্টও তৈরি করা হয়েছিল। এক মাস আগে থেকেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভিডিও প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতো এবং মানুষের সরাসরি তদারকি ছিল খুবই কম। ক্লাউড এপিআইয়ের মাধ্যমে ভুয়া শিরোনাম, বিস্তারিত বর্ণনা ও ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করে সেগুলো ক্লাউড স্টোরেজে পাঠানো, অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর এবং ইউটিউবে প্রকাশের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সারিবদ্ধ করা হতো।
তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, কনটেন্টগুলো আওয়ামী লীগপন্থি হলেও দলটি নিজে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। একইভাবে কিছু প্রচারণার বয়ান ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
অ্যানথ্রপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, কার্যক্রমটিকে ক্যাটাগরি থ্রি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। নেটওয়ার্কটির তৈরি ভিডিও বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে বৃহত্তর দর্শকের কাছে এসব কনটেন্ট ব্যাপকভাবে পৌঁছেছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে কার্যক্রমটি শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করেছে অ্যানথ্রপিক। ভবিষ্যতে একই ব্যক্তিরা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে একই কার্যক্রম চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিতরণ প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে নেটওয়ার্কটির শনাক্তকারী তথ্যও ভাগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শীর্ষনিউজ