এআই এজেন্টদের চমকপ্রদ দুনিয়ায় সম্প্রতি এক অভিনব গবেষণা সামনে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে মানুষের সাহায্য ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই এজেন্টরা নিজেরাই দল গঠন করতে পারে। একটি ভার্চুয়াল ঘরে এক হাজার এআই এজেন্টকে ছেড়ে দিয়ে তাদের সামনে সম্পূর্ণ অর্থহীন দুটি অপশন রাখা হলে, কোনো সঠিক উত্তর বা নেতার নির্দেশনা ছাড়াই বর্তমান যুগের সেরা এআই এজেন্টগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।
সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন কীভাবে কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বড় বড় এআই এজেন্ট দল নিজেদের মধ্যে দারুণভাবে সমন্বয় করতে পারে, যা মানুষের গড়া অনানুষ্ঠানিক দলের চেয়েও বিশাল হতে পারে।
এই এআই এজেন্টগুলো হলো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল দ্বারা চালিত এমন প্রোগ্রামড সিস্টেম, যা মানুষের বারবার ইনপুট ছাড়াই জটিল কাজ নিজে থেকেই করতে পারে। বিজ্ঞানীরা ক্লড, জিপিটি এবং লামা পরিবারের উন্নত মডেলগুলো নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে, এজেন্টগুলোর আগের কোনো স্মৃতি না থাকা সত্ত্বেও এবং কাউকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ না দেওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মডেল ধীরে ধীরে জনপ্রিয় অপশনটির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
পরীক্ষা চলতে চলতে ছোটখাটো অমিলগুলো দূর হয়ে পুরো দলটি একসময় একদম একই সিদ্ধান্তে স্থির হয়।
জার্মানির কন্সটানজ ইউনিভার্সিটির গবেষক জিওর্দানো দে মার্জো জানিয়েছেন যে, তারা যে মডেলগুলোই পরীক্ষা করেছেন, তার সবাই একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে, যাকে তারা 'মেজরিটি ফোর্স' বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর অর্থ হলো—দলের বেশির ভাগ এজেন্ট যা পছন্দ করে, তার প্রতি অন্য এজেন্টের একধরনের অদৃশ্য টান কাজ করে। মজার ব্যাপার হলো, পদার্থবিজ্ঞানের লোহা চুম্বকে পরমাণুগুলোর একই দিকে সারিবদ্ধ হওয়ার নিয়মের সাথে এর হুবহু মিল রয়েছে।
এই সূত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বের করেছেন কোন এআই দল কত বড় হতে পারে এবং কখন গিয়ে সেই দল ভেঙে যেতে পারে।
মডেলগুলোর বুদ্ধিমত্তা ও ভাষার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে দল গঠনের ক্ষমতার তারতম্য দেখা গেছে। যেমন—কিছু মডেল ত্রিশটি এজেন্ট নিয়ে দল পাকাতে পারলেও, জিপিটি ফোর ও বা জিপিটি ফোর টার্বো কিংবা ক্লড থ্রি পয়েন্ট ফাইভ সোনেটের মতো উন্নত মডেলগুলো এক হাজার বা তারও বেশি এজেন্টকে সফলভাবে এক সুতোয় বাঁধতে পেরেছে।
মানুষ সাধারণত সামাজিকভাবে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দেড়শ থেকে তিনশ জনের মতো মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে, যা 'ডানবারের সংখ্যা' নামে পরিচিত। কিন্তু এই এআই মডেলগুলো তার চেয়েও অনেক বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম।
তবে মানুষেরা যেমন ভালোবাসা ও সম্পর্কের খাতিরে দল করে, এআই এজেন্টরা কেবল অন্যের পছন্দ দেখেই এই কাজটি করেছে।
এআই এজেন্টদের এই দলবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা যেমন ভবিষ্যতে মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই বড় বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা কোডিং প্রকল্প একা একাই সামলানোর দারুণ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, তেমনি এর কিছু মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে।
কোডিংয়ের সময় পুরো দলটি যদি কোনো ভুল বা অকার্যকর ডিজাইন বেছে নেয়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সেই ভুল পছন্দকে সহজে বদলানো যায় না। একবার একটি এআই দল কোনো ভুল পথে চলে গেলে বা কোনো ক্ষতিকর নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তাদের সহজে নিয়ন্ত্রণ করা বা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞানীরা তাই সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল ক্ষমতা বা বড় কোনো বিপদ কোনো একক এআই মডেলের কারণে হবে না, বরং শত শত এআই এজেন্ট মিলে যে বিশাল দল বা সমাজ তৈরি করবে, তার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে প্রযুক্তির আসল গতিপ্রকৃতি।