Image description

মাহদী হাসান

আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে বিমান প্রকৌশল আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আকাশযান আর স্থির কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উড্ডয়নের সময়ই পরিবেশ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের আকৃতি পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন করেছে । এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনই পরিবর্তনযোগ্য বিমানপ্রযুক্তি, যা বিমান চালনা ও মহাকাশবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। প্রচলিত বিমানের ডানা, লেজ এবং মূল কাঠামো সাধারণত স্থির ও অনমনীয় থাকে। কিন্তু পরিবর্তনযোগ্য বিমানের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি উড্ডয়নরত অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের ডানার দৈর্ঘ্য, কোণ, বাঁক এবং সামগ্রিক জ্যামিতিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে। উন্নত সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্মার্ট উপাদানের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি প্রতিটি পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। ফলে বিভিন্ন উচ্চতা, গতি ও আবহাওয়ায় বিমানটি সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা, অধিক জ্বালানি সাশ্রয়, উন্নত স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। এ কারণেই পরিবর্তনযোগ্য বিমান প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের বিমান চলাচল ব্যবস্থার অন্যতম যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রযুক্তির পেছনের মূল দর্শনটি অত্যন্ত চমৎকার এবং এর অনুপ্রেরণা সরাসরি এসেছে জীবজগৎ থেকে। কোটি কোটি বছর ধরে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উড়ুক্কু জীব পাখিরা যেভাবে আকাশে ওড়ে, তা নিখুঁত প্রকৌশলের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একটি ঈগল বা গাঙচিল যখন আকাশে ওড়ে, তখন সে কিন্তু একভাবে ডানা ধরে রাখে না। বাতাস থেকে বেশি ধাক্কা বা লিফট (Lift) পেতে হলে সে তার ডানা দুটিকে সম্পূর্ণ প্রসারিত করে দেয়। আবার যখন তাকে শিকার ধরার জন্য প্রচণ্ড গতিতে নিচের দিকে নেমে আসতে হয়, তখন সে তার ডানা দুটিকে শরীরের সঙ্গে সংকুচিত করে নেয়, যাতে বাতাসের ঘর্ষণ সর্বনিম্ন হয়। এমনকি ওড়ার গতিপথ সামান্য পরিবর্তন করতেও তারা ডানার শেষ প্রান্তের পালকগুলোকে হালকা বাঁকিয়ে নেয়। পাখিদের এই অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা ও নমনীয় উড়ন্ত শৈলীকে কৃত্রিম যান্ত্রিক কাঠামোতে ফুটিয়ে তোলার তাড়না থেকেই বিজ্ঞানীরা মরফিং এয়ারক্রাফটের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। মূলত বিমানের ধাতু ও যান্ত্রিক জড়তা ভেঙে তাকে একটি ‘সজীব ও নমনীয় অবয়ব’ দান করাই এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য।

 

ভাষাগতভাবে ‘মরফিং’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ‘মেটামরফোসিস’ (Metamorphosis) বা রূপান্তর থেকে, যার অর্থ এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হওয়া। বিমান প্রকৌশলে এর অর্থ হলো এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ও সমন্বিত প্রযুক্তি, যা কোনো রকম যান্ত্রিক জটিলতা বা বাহ্যিক ত্রুটি ছাড়াই বিমানের ডানা এবং অন্যান্য অংশের আকার পরিবর্তন করতে পারে। এই রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং কয়েকটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পারস্পরিক মেলবন্ধনে এটি ঘটে থাকে। বিমানের পুরো কাঠামোজুড়ে বসানো থাকে হাজার হাজার অতি-সংবেদনশীল মাইক্রো সেন্সর। এই সেন্সরগুলো প্রতি মুহূর্তে চারপাশের বাতাসের চাপ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বিমানের উড্ডয়ন উচ্চতা এবং গতিবেগ-সম্পর্কিত ডেটা সংগ্রহ করে। এসব ডেটা তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যায় বিমানের মূল এআই (Artificial Intelligence) চালিত কম্পিউটার সিস্টেমে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়, বর্তমান গতি ও বাতাসে বিমানের ডানার আকৃতি কেমন হওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত হওয়া মাত্রই সিগন্যাল চলে যায় বিমানের ডানা ও জয়েন্টগুলোয় থাকা বিশেষ স্মার্ট উপাদানে। এখানে সাধারণ লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের বদলে ব্যবহার করা হয় ‘শেপ মেমরি অ্যালয়’ (Shape Memory Alloys) বা এমন কিছু যৌগিক পদার্থ, যা বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পূর্বনির্ধারিত আকৃতিতে ফিরে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকা ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী রোবোটিক মেকানিজম বা অ্যাকচুয়েটরগুলোর মাধ্যমে অত্যন্ত মসৃণভাবে বিমানের ডানা প্রসারিত বা সংকুচিত হয়, ঠিক যেভাবে কোনো পাখির মাংসপেশি কাজ করে।

 

এই প্রযুক্তির ইতিহাস কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যখন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা তুঙ্গে, তখন বিজ্ঞানীরা বিমানের ডানা নাড়িয়ে গতি বাড়ানোর কথা ভাবতে শুরু করেন। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডারপা (DARPA) এ খাতে প্রথম বড় অঙ্কের গবেষণা তহবিল বরাদ্দ করে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং বিশ্বের নামিদামি বিমান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাস এই প্রযুক্তির উন্নয়নে শামিল হয়। বিগত কয়েক দশকে উইন্ড টানেল (Wind Tunnel) টেস্ট এবং পরীক্ষামূলক ড্রোন ফ্লাইটের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা একে যাত্রীবাহী বড় বিমানের উপযোগী করে তোলার জন্য রাতদিন কাজ করে যাচ্ছেন। মরফিং এয়ারক্রাফটের সম্ভাব্য ব্যবহারের ক্ষেত্র এতটাই বিশাল যে এটি পুরো পৃথিবীর প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিতে পারে। সামরিক ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা অপরিসীম। একটি মরফিং যুদ্ধবিমান একই সঙ্গে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করতে পারে। উড্ডয়নের শুরুতে এটি ডানা প্রসারিত করে খুব কম রানওয়ে ব্যবহার করে আকাশে উড়তে পারে। আকাশে উঠে শত্রুর রাডার ফাঁকি দিতে এবং সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে এটি ডানা গুটিয়ে একদম ছোট করে ফেলতে পারে। আবার ডগফাইট বা আকাশে মুখোমুখি যুদ্ধ হলে এটি ডানা দ্রুত বাঁকিয়ে অবিশ্বাস্য সব কসরত (Maneuver) প্রদর্শন করতে পারে। চালকবিহীন গোয়েন্দা ড্রোন বা ইউএভিতে মরফিং ডানা যুক্ত করলে তা যেমন দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্ত এলাকায় চোখ রাখতে পারে, তেমনি কম জ্বালানি খরচ করে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে পারে। একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা ভয়াবহ দাবানলের সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে, মানুষ উদ্ধার করতে এবং বনাঞ্চলের আগুন পর্যবেক্ষণ করতে এই বিমানগুলো দারুণভাবে সাহায্য করবে। এমনকি পৃথিবীর বাইরে মঙ্গল গ্রহের মতো অত্যন্ত পাতলা বায়ুমণ্ডলের গ্রহে ড্রোন বা হেলিকপ্টার ওড়ানোর ক্ষেত্রেও মরফিং প্রযুক্তি একমাত্র ভরসা হয়ে উঠতে পারে।

 

এই অভাবনীয় প্রযুক্তির সুবিধার তালিকাটি বেশ দীর্ঘ এবং পরিবেশের জন্য এটি অত্যন্ত আশীর্বাদস্বরূপ। বর্তমান বিশ্বে বিমানের জ্বালানি খরচ এবং কার্বন নিঃসরণ একটি বড় চিন্তার বিষয়। মরফিং প্রযুক্তির কল্যাণে বিমান যখন বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের আকৃতি সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নেয়, তখন বাতাসের বাধা বা ড্র্যাগ (Drag) সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর ফলে বিমানের জ্বালানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর জ্বালানি কম পোড়া মানেই বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যাওয়া, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া বিমানের ডানা মসৃণ হওয়ার কারণে ফ্লাইটের সময় যে প্রচণ্ড বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ বা শব্দদূষণ হয়, তা প্রায় থাকবেই না। চরম বৈরী আবহাওয়া কিংবা কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়লেও এই বিমানগুলো বাতাসের ধাক্কা অনুযায়ী নিজেদের ডানা নমনীয় করে ফেলে সহজেই আকাশে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, যা বিমানভ্রমণকে করবে বহুগুণ নিরাপদ ও আরামদায়ক।