Image description

‘আমিনুল ইসলাম বুলবুল কি আর অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরবেন না? তিনি কি সিঙ্গেল রুট টিকিট কেটেই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেছেন?’— মাঝে এমন গুঞ্জনে মুখরিত হয়েছিল ক্রিকেটাঙ্গন। পরে তা অসার প্রমাণিত হয়। এরপর আমিনুল ইসলামকে নিয়ে আরও একটি মিথ্যা রটনা ছড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তিনি নাকি এবারের বিপিএলে ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে রীতিমতো তদন্ত চলছে- এমন খবরও ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেটপাড়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

পরপর দুটি নেতিবাচক ও ভিত্তিহীন সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবিতে মিডিয়ার যাতায়াত সীমিত করে দেন। ফলে যখন-তখন বিসিবি কার্যালয়ে মিডিয়ার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরে অবশ্য নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক দায়িত্ব নিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

এদিকে বুলবুলকে নিয়ে গুঞ্জন কিন্তু থামেনি। এবারও আবার তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে আলোচনা। যদিও বিসিবি থেকে জানানো হয়েছে, তিনি বলে-কয়ে নিজ পরিবারের কাছে অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসবেন; কিন্তু তারপরও তার ফেরা নিয়ে নানা প্রশ্ন। কারও কারও প্রশ্ন- সত্যিই কি ফিরবেন বিসিবি সভাপতি? নাকি থেকে যাবেন অস্ট্রেলিয়ায়?

হঠাৎ ক্রিকেটপাড়ায় এমন খবর কেন? মূলতঃ ভেতরে ভেতরে বিসিবির পরিচালক পর্ষদে পরিবর্তনের আভাস শোনা যাচ্ছে। যে প্রক্রিয়া ও যে ক্ষেত্রগুলোতে পরিবর্তনের কথা উঠছে, তাতে বুলবুলের সভাপতি পদ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। যদিও একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা ফিরবেন।

তবে দেশে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত বুলবুলের সভাপতি পদ থাকবে কি না, সে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। গুঞ্জনের পাশাপাশি নানা ধরনের সমীকরণের কথাও শোনা যাচ্ছে।

ভেতরে ভেতরে একটি পক্ষ- যারা বিসিবি নির্বাচনে অস্বচ্ছতা ও সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া তথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করেছিল- তারা এখন বোর্ডে রদবদল ঘটাতে সোচ্চার। তাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ক্রিকেটপাড়ার যে বিএনপিপন্থী অংশটি বিসিবির নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছিল, তারা এখন বোর্ডে পরিবর্তন আনতে মরিয়া। প্রকাশ্যে কোনো ‘শো-ডাউন’ না করলেও ভেতরে ভেতরে বিএনপিপন্থী ক্রিকেট সংগঠকরা নিজেদের দাবিতে একজোট। জানা গেছে, তারা নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভেবেচিন্তে, সব দিক বিবেচনা করে এবং আইন মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে। তারপরও তামিমপন্থীরা আইনি প্রক্রিয়ায় এগোনোর চিন্তাভাবনা করছেন। খুব শিগগিরই তারা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

উল্লেখ্য, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর নিয়োগ নিয়ম ও নীতি মেনে হয়নি- এ দাবিতেই মূলত শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বিএনপিপন্থীরা। তাদের অভিযোগ ছিল, সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবি ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে নিজে চিঠি দিয়েছেন। সাধারণত বিসিবির সিইও এ ধরনের চিঠি দেন।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে বোর্ড সভাপতি নিজেই চিঠি দিয়ে জানান, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার বাইরের কাউকে কাউন্সিলরশিপ না দিতে। সে অনুযায়ী কাউন্সিলরশিপ প্রদান করা হয়। আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও নাজমুল আবেদিন ফাহিম যথাক্রমে ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা জেলার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচন করেন। বিএনপিপন্থী সংগঠকরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।

প্রাথমিকভাবে আদালত ওই কাউন্সিলরশিপ প্রদানকে অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে বিসিবি সুপ্রিম কোর্টে রিট করলে সেই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়।

এখন জানা গেছে, নির্বাচন বয়কটকারী পক্ষ সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করতে যাচ্ছে। আদালত তাদের পক্ষে রায় দিলে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলরশিপ বাতিল হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সে ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ থেকে কাউন্সিলর হয়ে নির্বাচিত বোর্ড প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুলও পরিচালক পদ হারাতে পারেন। এতে জেলা ও বিভাগীয় কোটায় নির্বাচিত ১০ পরিচালকের কাউন্সিলরশিপ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই নির্বাচন বয়কটকারীরা নতুন সভাপতি খোঁজায় ব্যস্ত। তাদের বিশ্বাস, বুলবুলসহ ১০-১২ জন পরিচালক বৈধতা হারাতে পারেন। বিএনপিপন্থীদের প্রথম পছন্দ এখনো তামিম ইকবাল। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তিন ফরম্যাটের অন্যতম সফল ব্যাটারকে তারা পরবর্তী সভাপতি হিসেবে দেখতে চান।

তবে বাস্তবতা ভিন্নও হতে পারে। ক্রিকেটাঙ্গনে আরও কয়েকটি নাম শোনা যাচ্ছে। এর একটি আলী আসগর লবি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিসিবির সভাপতি ছিলেন। তার সময় বড় কোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ না থাকলেও ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভরাডুবি তার সময়েই হয়। পাকিস্তানি কোচ মহসিন কামাল ও সহকারী আলি জিয়ার অধীনে বাংলাদেশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে তার ক্রিকেটীয় দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ফারুক আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নাজমুল হাসান পাপনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সভাপতি হয়েছিলেন। পরে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া তার জায়গায় বুলবুলকে বসান। নির্বাচনের আগে ফারুক আবার বুলবুলের সঙ্গে একই প্যানেলে নির্বাচন করেন।

এখন দেখার বিষয়, পরিবর্তন এলে বুলবুলের জায়গায় ফারুকই বসেন কি না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যদি সত্যিই পরিবর্তন আসে, তবে তামিম, ফারুক বা লবির মধ্য থেকেই কেউ সভাপতি হতে পারেন। প্রত্যেকের পক্ষেই যুক্তি আছে, আবার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরাও যোগ্য, দক্ষ ও কর্মতৎপর কাউকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হকের পাশাপাশি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া কারও সভাপতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এখন দেখার বিষয়, তামিম, ফারুক না লবি- সরকারের উচ্চপর্যায় কাকে বেছে নেয়।