Image description
 

বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট ভক্তদের জন্য আনন্দের খোরাক। দুই কিংবা চার বছর পরপর এই আসরের জন্য মুখিয়ে থাকেন ভক্ত-সমর্থকরা। চারদিকে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। আসন্ন ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেই উৎসবের আমেজে বিরাজ করছে রাজনীতির কালো ছায়া। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিমুখী লড়াইয়ে উত্তপ্ত উপমহাদেশ। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই রাজনীতির ঝড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—ক্রিকেট কি পারবে নিজেকে আলাদা রাখতে? নাকি রাজনীতির দ্বন্দ্ব আড়াল হয়ে যাবে ব্যাট-বলের শব্দ?

 

বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের অন্যতম বড় উৎসব হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকেই ধরা হয়। আধুনিক ক্রিকেটের এই সময়ে ২০ ওভারের লড়াই মানেই উন্মাদনার তুমুল আওয়াজ। যেখানে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার দলগুলো এক ছাদের নিচে আসে। এবারের আসর আয়োজনের সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন ছিল—ভেন্যু, সূচি, সম্প্রচার পরিকল্পনা। কিন্তু উৎসবের ঠিক আগে উপমহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এসে আঘাত হেনেছে ক্রিকেটের দরজায়।

 

এই দ্বন্দ্বের শুরুর দুই নাম ভারত ও পাকিস্তান। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এসে ঠেকেছে ক্রিকেট সীমান্তে। যার শুরুটা করে ভারত। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে খেলতে রাজি হয়নি। তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। আইপিএল থেকে অন্যায়ভাবে মোস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ ন্যায্য প্রতিবাদ করে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্রিকেটারদের জন্য এই সময়ে ভারত নিরাপদ নয়—এই দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের অনুরোধ করে। কিন্তু ভারতের প্রভাবে থাকা আইসিসি বাংলাদেশের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। শেষে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে খেলার সুযোগ করে দেয় আইসিসি।

এই টানাপোড়েনের মধ্যে পাকিস্তান সরকার জানিয়ে দিল তারা নিরপেক্ষ ভেন্যুতেও ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে না। রাজনীতির এই টর্নেডো ক্রিকেটের দিকে ধেয়ে এসে পুরো বিশ্বকাপেই অস্বস্তির বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, এই টানটান উত্তেজনা কাটাতে হলে যেন করাত লাগাতে হয়। তবু আশার জায়গা আছে। হয়তো বল মাঠে গড়ালে নজর ফিরবে ক্রিকেটের সৌন্দর্যের দিকে। শ্রীলঙ্কার আলো-ছায়ায় দুলতে থাকা সুইং, ভারতের উইকেটে নিখুঁত বাউন্স, টুর্নামেন্ট যত গড়াবে স্পিনারদের জন্য তৈরি হওয়া ক্ষয়ে যাওয়া পিচ—এসবই ক্রিকেটপ্রেমীদের আবার টেনে আনতে পারে মাঠে।

এই বিশ্বকাপ হতে পারত ক্রিকেটপ্রেমীদের স্বপ্নের আসর। গ্রুপ পর্বে দিনে তিনটি ম্যাচ—স্ট্রিমিং যুগের দর্শকদের জন্য উৎসবের মতো। দুই শতাধিক ক্রিকেটার প্রতি সপ্তাহে মাঠে নামবেন এমন এক ফরম্যাটে, যেখানে প্রতিভার বিস্তার সবচেয়ে বেশি। দুই দেশে আটটি ভেন্যু—যেখানে ক্রিকেট নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কাগজে-কলমে সবই ছিল নিখুঁত। আজকের ক্রিকেট ভক্তরা আর শুধু পোস্টারে দেয়াল সাজান না। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্লেষণ লেখেন, ম্যাচের গল্প শেয়ার করেন, ভাইরাল ভিডিও বানান, মিম তৈরি করেন। ক্রিকেট যখন তার সেরা রূপে থাকে, তখন সেটি হয়ে ওঠে মানুষের অভিন্ন ভাষা। এই বিশ্বকাপও তেমন কিছু হতে পারত।

উপমহাদেশের টেস্ট খেলুড়ে পাঁচ দেশের একটি বাংলাদেশ। শুধুই ক্রিকেটীয় বিবেচনায় তাদের এই বিশ্বকাপে থাকার কথা ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজনীতি ও আইসিসির সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ হারিয়েছে তারা। ফলে বিশ্বকাপ অনেকখানি অর্থহীন হয়ে পড়েছে। উৎসবের মঞ্চ রঙ হারিয়েছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীও বঞ্চিত হয়েছেন এই উৎসব থেকে। বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বে এই সংকটের সমাধান—ক্রিকেটের এই মুহূর্তে দরকার নিজের সেরা রূপে ফিরে যাওয়া। দরকার সেই স্মরণীয় গল্পগুলো—২০১২ সালের গ্যাংনাম নাচ, ২০১৪ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার নিখুঁত ইয়র্কার, কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের টানা চার ছক্কা, বাউন্ডারি সীমানায় সূর্যকুমার যাদবের অবিশ্বাস্য ক্যাচ কিংবা ২০২১ সালে জেমস নিশামের নায়কোচিত উত্থান।

হয়তো এসব প্রত্যাশা কিছুটা সরল। কিন্তু খেলাটির নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্ত আমাদের সামনে আর কী পথই বা খোলা রেখেছে? আরেকটি সম্ভাবনাও আছে—যেখানে ভূ-রাজনৈতিক ফাটল আরো গভীর হবে, যেমনটা হয়েছিল গত এশিয়া কাপের করুণ পরিণতিতে। এই বিশ্বকাপ যেন সেই পথে না যায়—এটা এখন আর শুধু আশা নয়, এক ধরনের প্রার্থনা। কারণ উৎসব শেষে আলো নিভে গেলে, পতাকা গুটিয়ে নিলেও কোটি কোটি মানুষকে এই উপমহাদেশে একসঙ্গে বাঁচতে হবে। ক্রিকেট যদি বিভাজনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরাজয়।