চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই খবর চাউর হওয়ার পর থেকে শুরু হয় বিতর্ক। দেখা দেয় ক্ষোভ-বিক্ষোভ। সম্প্রতি সরকার লালদিয়া টার্মিনাল ও পানগাঁও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও তা নিয়ে তেমন বিতর্ক হয়নি। ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ে কেন এত আলোচনা– কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে সমকাল।
ডিপি ওয়ার্ল্ড এখন ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ৪০টিরও বেশি বন্দর পরিচালনা করছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে না। যে টার্মিনাল পরিচালনার জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেখানে নেই বাড়তি বিনিয়োগ করার সুযোগ।
এদিকে আলোচিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিক সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করে দ্য টেলিগ্রাফে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। যুক্তরাজ্যে টেমস নদীর তীরে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড খরচায় একটি বন্দর নির্মাণে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সহযোগিতাও করেছিলেন এপস্টেইন। এ জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ বাণিজ্য সচিব পিটার ম্যান্ডেলসনকে প্রভাবিত করতেও এপস্টেইন কাজ করেছিলেন।
এদিকে আফ্রিকার জিবুতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনার বিরোধের বিষয়টিও এখন আবার সামনে আসছে। সেখানে যে শর্তে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছিল, তারা সেটি ভঙ্গ করায় আরব আমিরাতের সঙ্গে সব চুক্তি পরে বাতিল করে সোমালিয়ার সরকার। নিরাপত্তার প্রশ্নে সন্দেহ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রও ডিপি ওয়ার্ল্ডকে তাদের দেশে বন্দর পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার ইস্যুটিও সর্বসমক্ষে আনা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, এনসিটি টার্মিনালের পাশেই আছে নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় ঈশা খাঁ ঘাঁটি। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি দিলে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন একাধিকবার বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড ঘিরে তৈরি হওয়া এমন সন্দেহ অমূলক। ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে বন্দরে নতুন করে বিনিয়োগ করবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। অত্যাধুনিক আরও যন্ত্রপাতি আসবে। বাড়বে বন্দরের আয় ও সক্ষমতা। তখন চট্টগ্রাম বন্দর আরও বেশি কনটেইনার পরিচালনা করতে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দর রূপান্তরিত হবে বিশ্বমানের বন্দরে।
গতকাল বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম বন্দরে এসে তাঁর কথায় অভিন্ন সুর। চুক্তি কখন হবে– এমন প্রশ্নে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে নৌ উপদেষ্টা বলেন, এই প্রক্রিয়া চলমান আছে। সব বিষয়ে একমত হলে আমরা চুক্তি করব।
ভয় বাড়াচ্ছে জিবুতি বন্দর
বিশ্বব্যাংকের পিপিপি রিসোর্স সেন্টারের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ২০০৪ সালে আফ্রিকার জিবুতিতে ল্যান্ডলর্ড মডেলে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করে জিবুতি। ৩০ বছর মেয়াদি সেই চুক্তির শর্তে ছিল, জিবুতি একই এলাকায় অন্য কোনো বন্দর ইজারা দিতে পারবে না। টার্মিনালটি চালুর পর ২০০৯ সালে চুক্তির শর্ত ভেঙে একই এলাকায় আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে জিবুতি। এই কারণে জিবুতি সরকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে ২০১৮ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করে। এরপর ডিপি ওয়ার্ল্ড লন্ডনের আদালতে যায়। সেই আদালত জিবুতি সরকারকে সুদসহ ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন। পাশাপাশি স্বত্ব বাবদ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে আরও ১৪৮ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে জিবুতি সরকার এই রায় মানেনি। উল্টো আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে করা সব চুক্তি বাতিল করে দেয় তারা।
যে কারণে চুক্তি করেনি যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর পরিচালনাকারী ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান পিঅ্যান্ডও পোর্টস ২০০৬ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করে। সে সময় তারা পরিচালনা করছিল যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি বন্দর। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর পরিচালনার সুযোগ আসে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সেই সুযোগ আর দেননি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। রাজনৈতিক চাপে বাধ্য হয়ে তখন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে।
এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক
জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের সুসর্ম্পক ছিল। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথি তুলে ধরে দ্য টেলিগ্রাম সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বন্দরের কাজ পেতে সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম কীভাবে অন্যায় পথ বেছে নেন– তা উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত একটি ইমেইল ম্যান্ডেলসনকে ফরোয়ার্ড করেছিলেন এপস্টেইন। সুলায়েম তখন লন্ডন গেটওয়ে প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ ও সরকারি ঋণের গ্যারান্টি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এপস্টেইনের ফরোয়ার্ড করা সুলায়েমের ইমেইলে লেখা ছিল, ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রকল্পটি যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ অবকাঠামো প্রকল্প। নতুন বন্দরটি ৩৬ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে প্রতি বছর ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড জোগান দেবে। পরে দেখা যায়, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্তরাজ্যে বন্দর নির্মাণের কাজ শুরুর পদক্ষেপ নেয়।
এপস্টেইনের বিষয়ে যেসব নথি মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশ করেছে, তাতে একটি ছবিতে ম্যান্ডেলসনকে খোলামেলা পোশাকে দেখা গেছে। এপস্টেইনের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের বিবরণও আছে অন্য নথিতে। সমালোচনার মুখে গত রোববার এই ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লেবার পার্টির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। নথির বিষয়ে জানতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল দ্য টেলিগ্রাফ। তাদের মধ্যে ম্যান্ডেলসন বলেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তিনি অনুতপ্ত। ভুক্তভোগীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি।
এনসিটি কেন ব্যতিক্রম
চট্টগ্রাম বন্দরের চার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আধুনিক এনসিটি। এই টার্মিনাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে আধুনিক করতে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। এখানে ১৪টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন আছে; যা অন্য কোনো টার্মিনালে নেই। এক হাজার মিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালেই একসঙ্গে বেশি জাহাজ নোঙর করতে পারে। প্রতি বছর বন্দর ২০ ফুট এককের যে ৩৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেল করে, এর প্রায় ৪৪ শতাংশ এককভাবে হ্যান্ডেল করে এনসিটি।
এতদিন সাইফ পাওয়ারটেকের কাছে এই টার্মিনাল থাকলেও এখন এটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ড্রাইডক। তারা পরিচালনায় আসার পর এই টার্মিনালে কাজের গতি বেড়েছে। এ কারণে আন্দোলনকারীরা বলছেন, দেশি প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকুক এই টার্মিনাল। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে এটি থেকে বন্দরের খুব বেশি আয় বাড়বে না। উল্টো হুমকির মুখে পড়বে সার্বিক কার্যক্রম।
বিনিয়োগ সম্ভাবনা কতটুকু
বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলেই বন্দরের দক্ষতা বাড়বে– এমনটি মনে করেন না বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা বলছেন, বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ার কতগুলো নির্দেশক আছে। কত ধারণক্ষমতার জাহাজ নোঙর করতে পারবে, চ্যানেলের নাব্যসীমা, নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের হার, কনটেইনার দ্রুত বন্দর থেকে খালাস করার সুযোগ থাকা, কাস্টমসের শুল্কায়ন ক্ষমতা– এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা। চারটি টার্মিনালের মধ্যে শুধু একটি টার্মিনাল বিদেশিদের দিলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন না বন্দর ব্যবহারকারীরা।