২০২৫ সালের ২১ আগস্ট ভারতের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতি। ‘ভারতের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরসংক্রান্ত নীতি’ শিরোনামের বিবৃতির প্রথম বাক্যেই লেখা ছিল—‘পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত খেলাধুলার ইভেন্টের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক নীতিরই প্রতিফলন।’
কিছুদিন পরপরই ভারতের ভেতরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার জোর দাবি ওঠে। সে বছর পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলা ও দুই দেশের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনার জেরে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) তখন বেশ চাপেই ছিল। এরপরই এশিয়া কাপ সামনে রেখে আসে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সেই ঘোষণা, যা পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা নিয়ে ভারত সরকারের নীতিগত অবস্থানের প্রথম প্রকাশ।
বিবৃতিতে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ভারতের কোনো দল পাকিস্তানে যাবে না, একইভাবে পাকিস্তানের কোনো দলকেও ভারতে খেলার অনুমতি দেওয়া হবে না। ভারত সরকারের এই অবস্থানের সরল অর্থ দাঁড়ায়, পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা বয়কটের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। সেই ঘোষণার পর বাস্তবতা কী জানেন? ভারত সরকারের ওই বক্তব্যের পর শুধু গত ৫ মাসেই ৭ বার মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট দল। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে খেলবে আরও ৩ বার!
পাকিস্তানের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারত তাদের সঙ্গে একের পর এক ম্যাচ খেলছে টুর্নামেন্টের ছাতার নিচে। রাজনৈতিক বৈরিতায় দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশ শুধু টুর্নামেন্টেই মুখোমুখি হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ভারতে সফর করেছিল পাকিস্তান। এরপর দুই দেশের দেখা শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) টুর্নামেন্টে।
ক্রিকেটের টুর্নামেন্টগুলোতে কোন গ্রুপে কে খেলবে তা নির্ধারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ড্র হয় না। আইসিসিও কখনো এ বিষয়ে ধারণা দেয় না। সাধারণত দলগুলোর শক্তিমত্তা বিবেচনায় নিয়ে গ্রুপের দল ঠিক করা হয়। তবে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানকে এক গ্রুপে রাখা নিশ্চিত করতেই ড্র হয় না।
ভারত–পাকিস্তানের ম্যাচ মানেই অর্থের হাতছানি। পুরো টুর্নামেন্টের মধ্যে সম্প্রচারকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে এ দুই দলের ম্যাচে। ২০২২ সালে এসিসির বাণিজ্যিক বিভাগের সাবেক প্রধান প্রভাকরণ থানরাজ ফোর্বসের প্রতিবেদক ত্রিস্তান লাভালেত্তেকে বলেছিলেন, ‘ভারত বনাম পাকিস্তান—এই একটি ম্যাচের ওপর সম্প্রচারে পুরো টাকাপয়সার বিষয়টি নির্ভর করে। এসিসির তহবিলের প্রায় বেশির ভাগই আসে ছেলেদের এশিয়া কাপ থেকে।’
একই চিত্র আইসিসির টুর্নামেন্টেও। আর এই ম্যাচের কারণে লাভবান হয় দুই দেশের বোর্ডও। যে কারণে জনগণের একটি অংশ থেকে ম্যাচ না খেলার জোরালো দাবি উঠলেও বিসিসিসিআই বা পিসিবি তাতে পাত্তা দেয় না। আর তা করতে গিয়েই গত এক দশকের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে আইসিসি ও এসিসির এমন কোনো টুর্নামেন্ট নেই, যেটিতে ভারত ও পাকিস্তান ম্যাচ খেলেনি। এখন এই ধারা শুধু জাতীয় দল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, বয়সভিত্তিক ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের টুর্নামেন্টগুলোতেও দেখা যায় একই চিত্র।
গত এক বছরের ক্যালেন্ডারে চোখ রাখলেই সেটা স্পষ্ট। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির গ্রুপ পর্বে দুবাইয়ে মুখোমুখি হয় ভারত–পাকিস্তান। এসব ক্ষেত্রে আয়োজকদের লক্ষ্য থাকে যাতে সেমিফাইনাল অথবা ফাইনালেও দুই দলের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে পাকিস্তান সেবার গ্রুপ পর্ব পার হতে না পারায় ‘এক দেখা’তেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় আইসিসিকে।
আইসিসির ভাগ্য সেদিন ‘সুপ্রসন্ন’ না হলেও সেপ্টেম্বরে এসিসি যেন লটারিই জিতে যায়। এপ্রিলের শেষ দিকে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত আর মে মাসের প্রথম দিকে সীমান্তের দুই পারে আকাশ–সংঘাত মিলিয়ে ভারত–পাকিস্তান মাঠের লড়াইয়ে উত্তেজনা চরমে ওঠে। এমন আবহের মধ্যেই এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্ব তো বটেই, সুপার ফোর এমনকি ফাইনালেও মুখোমুখি হয় ভারত–পাকিস্তান। ১৪, ২১ ও ২৮ সেপ্টেম্বর—মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ আয়োজন করে এসিসি, যা সাধারণত দ্বিপক্ষীয় সিরিজেই দেখা যায়।

এর এক সপ্তাহ পরই ৫ অক্টোবর আইসিসি নারী বিশ্বকাপের লিগ পর্বের ম্যাচে কলম্বোয় মুখোমুখি হয় দুই দেশের মেয়েদের ক্রিকেট দল। বাদ যায়নি বছরের শেষ দুই মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বরও।
জাতীয় দলের আশপাশে থাকা তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে নভেম্বরে আয়োজিত হয় এসিসি রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপ। পরের মাসে হয় এসিসি অনূর্ধ্ব–১৯ এশিয়া কাপ। প্রথমটিতে দুই দেশের ‘এ’ দল আর দ্বিতীয়টিতে যুব দল গ্রুপ পর্বের খেলায় মুখোমুখি হয়। অনূর্ধ্ব–১৯ এশিয়া কাপে অবশ্য গ্রুপ পর্বেই লড়াই শেষ হয়নি, পরে ২১ ডিসেম্বর ফাইনালেও খেলে দুই দল।

২০২৫ সালের মতো দুই দেশের নিয়মিত লড়াইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত ২০২৬ সালেও। আজ ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই যেমন আইসিসি অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপের সুপার সিক্সের ম্যাচে খেলবে দুই দল। দুই সপ্তাহ বিরতির পর ১৫ ফেব্রুয়ারি অপেক্ষা করছে আরও ‘বড় ধামাকার’। সেদিন কলম্বোয় টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে খেলবে ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয় দল। একই দিনে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নারী রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বে খেলবে দুই দেশের মেয়েদের ‘এ’ দল।
সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে সিরিজ সূচি না থাকলেও ভারত–পাকিস্তানের ক্রিকেট লড়াই এখন দ্বিপক্ষীয় সিরিজের চেয়েও বেশি নিয়মিত। এ যেন এক অদ্ভুত ‘বয়কট’।