কারফিউ, ভাঙাচোরা পিচ, অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত উইকেটও নেই। এমন বাস্তবতায় অনেকের স্বপ্নই থমকে যায়। কিন্তু আকিব নবি থামেননি। বাড়ির উঠোনে একটি চেয়ারকে নকল ব্যাটার বানিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বোলিং করেছেন, কখনো আবার ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গেছেন শুধু ভালো অনুশীলনের আশায়। সেই সংগ্রামের প্রতিদান মিলেছে শেষ পর্যন্ত। রঞ্জি ট্রফিতে দুর্দান্ত দুই মৌসুম কাটিয়ে প্রথমবারের মতো ভারতের টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের এই পেসার।
রঞ্জি ট্রফিতে টানা দুই মৌসুমে অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর অবশেষে ভারতের টেস্ট দলে প্রথমবারের মতো ডাক পেয়েছেন আকিব নবি।
পরিসংখ্যানই তার সাফল্যের প্রমাণ। সদ্য শেষ হওয়া রঞ্জি ট্রফি মৌসুমে ১০ ম্যাচে মাত্র ১২-এর কিছু বেশি গড়ে নিয়েছেন ৬০ উইকেট। আগের মৌসুমেও ১৩.৯৩ গড়ে শিকার করেন ৪৪ উইকেট। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই জম্মু ও কাশ্মীরের ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ে তাকে অন্যতম প্রধান নায়কে পরিণত করেছে।
তবে সংখ্যার বাইরেও রয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুল্লায় বেড়ে ওঠা আকিবের জন্য ক্রিকেট সহজ ছিল না। সেখানে ভালো নেট কিংবা মানসম্মত উইকেটের অভাব ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। অনেক সময় কারফিউয়ের কারণে অনুশীলনও বন্ধ হয়ে যেত।
আকিব বলছিলেন, ‘খুব কঠিন ছিল না, তবে অবকাঠামোর অনেক ঘাটতি ছিল। কাশ্মীর কিংবা জম্মুতে তখন অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত উইকেটই ছিল না। এখন ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু ছোটবেলায় আমার কাছে ভালো সরঞ্জাম বা যথেষ্ট উইকেট কিছুই ছিল না। যা ছিল, সেটুকু দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করেছি।’
শৈশব থেকেই সকাল-সন্ধ্যা ক্রিকেট নিয়েই কাটত আকিবের জীবন। তার বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক, যাতে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা তাকে অন্য পথে নিয়ে যায়।
ভাঙা পিচ, ছোট্ট মাটির টুকরো-যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই অনুশীলন করেছেন তিনি। সামান্য ভুল পা ফেললেই চোট পাওয়ার আশঙ্কা থাকত। তবু থেমে যাননি।
একটি স্মৃতি আজও তাকে নাড়া দেয়। একবার কারফিউ চলাকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। তখন বাবা বাড়ির উঠোনেই একটি অস্থায়ী নেট তৈরি করে দেন। ব্যাটারের পরিবর্তে একটি চেয়ার রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বোলিং করতেন তিনি।
আকিব বলেন, ‘সেই সময় উইকেটের খুব অভাব ছিল। যা ছিল, তাই দিয়েই কাজ চালাতে হয়েছে।’
ভালো অনুশীলনের জন্য পরে তাকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের শ্রীনগরে নিয়মিত যাতায়াত করতে হতো। ২০১৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অভিষেক তার। পরে অনূর্ধ্ব-২৩ দলেও সুযোগ পান এবং সি. কে. নাইডু ট্রফিতে কেরালার বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়ে আলোচনায় আসেন।
২০১৮ সালে লিস্ট 'এ' ক্রিকেটে এবং দুই বছর পর প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। শুরুটা ছিল দারুণ। প্রথম দুই লিস্ট 'এ' মৌসুমে ১৮ ম্যাচে নেন ৩৪ উইকেট। প্রথম প্রথম-শ্রেণির মৌসুমে শিকার করেন ২৪ উইকেট। এরপর-ই আসে কঠিন সময়। পরবর্তী তিন মৌসুমে মাত্র ২২ উইকেট পান এবং তার বোলিং গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৪২.৪৬। এর অন্যতম কারণ ছিল মানসম্মত বোলিং কোচের অভাব।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে বোলিং কোচ পি. কৃষ্ণকুমার দলে যোগ দেওয়ার পর। আকিব বলেন, ‘তিনি আমার ছোট ছোট ভুলগুলো খুঁজে বের করেন এবং কীভাবে সেগুলো ঠিক করতে হবে, তা শেখান। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে।’
কৃষ্ণকুমারের তত্ত্বাবধানে গ্রিপ, সিম পজিশন, রিলিজ, সুইং, ফিটনেস ও খাদ্যাভ্যাসহ সবকিছুতেই পরিবর্তন আসে। ফলে তার বোলিং আরও ধারালো হয়ে ওঠে।
গত জানুয়ারিতে শক্তিশালী মুম্বাইয়ের বিপক্ষে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন আকিব। রোহিত শর্মা, যশস্বী জয়সওয়াল, আজিঙ্কা রাহানে, শ্রেয়াস আইয়ার ও শিভম দুবের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া দলকে হারিয়ে চমক দেখায় জম্মু ও কাশ্মীর। দ্বিতীয় ইনিংসে আকিবের চার উইকেট ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং মুম্বাই ৩০০ রানের আগেই অলআউট হয়ে যায়।
পরের মৌসুমে আলোটা পুরোপুরি পড়ে তার ওপরই। দুলীপ ট্রফিতে টানা চার বলে চার উইকেট নিয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়া মাত্র পঞ্চম ভারতীয় হন তিনি।
শুধু লাল বলেই নয়, সাদা বলেও ছিলেন দুর্দান্ত। সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে ১৫ উইকেট এবং বিজয় হাজারে ট্রফিতে ১৪ উইকেট নিয়ে নিজের অসাধারণ মৌসুম শেষ করেন।