ফুটবলে কৌশল, দক্ষতা আর ভাগ্যের পাশাপাশি কুসংস্কার ও রহস্যময় বিশ্বাসের গল্পও নতুন নয়। তবে এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন ঘানার বিপক্ষে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ঘানার আলোচিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক ও ওঝা নানা কওয়াকু বোনসামের নাম। তার দাবি, হ্যারি কেইনের গোল না করার পেছনে কাজ করেছে তারই প্রয়োগ করা ‘আধ্যাত্মিক শক্তি’।
গ্রুপ পর্বের ঘানা-ইংল্যান্ড ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়। পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ড আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও গোলের দেখা পায়নি। কেইনও কয়েকটি সুযোগ পেয়েও সেগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা কওয়াকু বোনসামের পুরোনো ও নতুন ভিডিও, যেখানে তিনি দাবি করেন, ঘানার স্বার্থে কেইনের ওপর তিনি সাময়িক একটি ‘অভিশাপ’ প্রয়োগ করেছিলেন।
ম্যাচের আগেই বোনসাম জানিয়েছিলেন, তিনি জানেন কীভাবে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে হয়। তার ভাষায়, তিনি কেইনের কোনো ক্ষতি চাননি; শুধু চেয়েছিলেন, ঘানার বিপক্ষে যেন তিনি গোল করতে না পারেন। ম্যাচ শেষে কেইন গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকে মজা করে তার দাবির সঙ্গে ফলাফল মিলিয়ে দেখলেও, ফুটবল বিশ্লেষকরা এটিকে নিছক কাকতালীয় ঘটনাই বলে মনে করছেন।
ম্যাচের পর ফেসবুকে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে বোনসাম দাবি করেন, তিনি এখন হ্যারি কেইনের ওপর থেকে সেই প্রভাব সরিয়ে নিচ্ছেন, যাতে পরবর্তী ম্যাচে ইংল্যান্ড অধিনায়ক আবার গোল করতে পারেন। ভিডিওতে তাকে কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মতো কর্মকাণ্ড করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ব্যক্তি’ বলেও দাবি করেন।
ঘানার এই আলোচিত ব্যক্তিত্বের নাম নানা কওয়াকু বোনসাম। স্থানীয় ভাষায় ‘বোনসাম’ শব্দের অর্থ ‘শয়তান’ বা অশুভ আত্মা। তবে এটি তার প্রকৃত নাম নয়; নিজের পরিচিতি বাড়ানোর জন্যই তিনি এই উপাধি ব্যবহার করেন। ১৯৭৩ সালের ২০ আগস্ট ঘানায় জন্ম নেওয়া বোনসাম নিজেকে ‘দ্য গ্রেট অথেন্টিক ম্যান’ নামে পরিচয় দেন।
তিনি ঘানার রাজধানী আক্রায় তিনটি আধ্যাত্মিক উপাসনালয় পরিচালনা করেন। দাবি করেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় দেবতা কোফি ওডুর আশীর্বাদে মানুষকে নানা সমস্যার সমাধান দিয়ে আসছেন। ভেষজ চিকিৎসা, তাবিজ-কবচ ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পরামর্শের জন্য শুধু ঘানা নয়, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও মানুষ তার কাছে আসেন বলে দাবি করেন তিনি। নিয়মিত ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে অনুসারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন।
জানা গেছে, ছোটবেলা থেকে বোনসাম আফ্রিকার আকান নামের এক প্রজাতির মানুষদের মাঝে বড় হয়ে উঠেছেন। এই প্রজাতির মানুষজনের মধ্যে তন্ত্রসাধনার বেশ প্রচলন রয়েছে। বোনসাম বেড়ে উঠেন তার চাচা পাপা কুমা কোফি অতসিওয়ার কাছে। ওঝা হিসেবে পাপার বেশ নামডাক ছিল। চাচার সঙ্গে থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। এরই সঙ্গে সেখানকার স্থানীয় গির্জায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন নানা। সেই সময়ই ঘটে তার সঙ্গে এক অদ্ভুত কাণ্ড।
বোনসামের দাবি, ১৯ বছর বয়সে গির্জায় যাওয়ার পথে বজ্রপাতের মতো এক রহস্যময় ঘটনার পর তিনি আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হন। এরপর থেকেই তিনি স্থানীয়দের কাছে একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান। যদিও তার এসব দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কখনোই পাওয়া যায়নি।
বিতর্কের সঙ্গে বোনসামের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপেও তিনি দাবি করেছিলেন, পর্তুগালের তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হাঁটুর চোটের পেছনেও তার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব ছিল। সে সময়ও বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে রোনালদোর চোট বা পারফরম্যান্সের সঙ্গে তার দাবির কোনো বাস্তব সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।
আধ্যাত্মিক পরিচয়ের বাইরে বোনসামের জীবনযাপনও বেশ বর্ণিল। দামি পোশাক, বিলাসবহুল গাড়ি ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনধারার জন্য তিনি প্রায়ই আলোচনায় থাকেন। কেবল এখানেই শেষ নয়।
২০২০ সালে ঘানার অফিনসো নর্থ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। যদিও নির্বাচিত হতে পারেননি, তবে হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বহুবার শিরোনাম হয়েছেন। একাধিক বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং অসংখ্য প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে খোলামেলাভাবে কথা বলেছেন। স্থানীয় কয়েকটি প্রতিবেদনের দাবি, তার সন্তানের সংখ্যা ১৪। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বোনসামের দাবি অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫ জন নারী-পুরুষ বিভিন্ন পারিবারিক, দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান চাইতে তার কাছে আসেন। তিনি তাদের জন্য বিশেষ ‘জুজু’ বা আধ্যাত্মিক আচার সম্পন্ন করেন বলেও জানান।
তবে ফুটবল ইতিহাসে নানা কওয়াকু বোনসামের দাবিগুলো বরাবরই বিতর্কিত। হ্যারি কেইন কিংবা এর আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পারফরম্যান্সে তার কোনো প্রভাব ছিল— এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো বৈজ্ঞানিক বা বাস্তব প্রমাণ নেই।
অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, এগুলো মূলত ব্যক্তিগত দাবি ও লোকবিশ্বাসের অংশ। তবু বড় টুর্নামেন্ট এলেই নানা কওয়াকু বোনসামকে ঘিরে রহস্য, কৌতূহল ও বিতর্ক নতুন করে ফিরে আসে, আর সে কারণেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের এক ব্যতিক্রমী আলোচিত চরিত্র হয়ে আছেন।