শুরু হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব। ২০২৬ সালের আসরটি আবারও ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছে। কারণ, এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে বিশ্বকাপ। আর এই আসরে জায়গা করে নিয়েছে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৪টি দেশ। আফ্রিকার মরুভূমি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজ্য, মধ্য এশিয়ার প্রাচীন সিল্ক রোড থেকে ইউরোপের বলকান অঞ্চল— বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের দেশগুলো এবার এক মঞ্চে ফুটবলের লড়াইয়ে নামবে। চলুন পরিচিত হওয়া যাক সেই দেশগুলোর সঙ্গে
মরক্কো (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৯ শতাংশ)
২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শেষ চারে পৌঁছানো তাদের কীর্তি এখনো আলোচিত। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটি বিখ্যাত মারাকেশ শহর, সাহারা মরুভূমি ও রঙিন বাজারের জন্য। বর্তমানে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল হিসেবেই মরক্কোকে দেখা হয়। প্রথম খেলায় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান ব্রাজিলকে রুখে দিয়ে দুর্দান্ত শুরু করেছে তারা।
সেনেগাল (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৭ শতাংশ)
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগাল দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। ২০০২ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে সবাইকে চমকে দিয়েছিল তারা। দেশটি বিখ্যাত তার সংগীত, সংস্কৃতি এবং আটলান্টিক উপকূলের জন্য। মাঠে সেনেগালের পরিচয় সাহসী ও আক্রমণাত্মক দল হিসেবে।
মিসর (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ)
পিরামিড আর ফারাওদের দেশ মিসর বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস সবচেয়ে বেশি জেতার রেকর্ডও তাদের। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম শক্তি হিসেবে পরিচিত মিসর এবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে চায়।
২০১৪ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে উঠে আলজেরিয়া প্রশংসা কুড়িয়েছিল
আলজেরিয়া (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৯ শতাংশ)
ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী আলজেরিয়া আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের জন্যও দেশটি বিখ্যাত। ফুটবলে আলজেরিয়া বরাবরই প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করে আসছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় উঠে তারা প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
তিউনিসিয়া (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৯ শতাংশ)
উত্তর আফ্রিকার ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়া বিশ্বকাপের পরিচিত মুখ। দেশটি প্রাচীন কার্থেজ সভ্যতার জন্য বিখ্যাত। বিশ্বকাপে বড় সাফল্য না পেলেও নিয়মিত অংশগ্রহণের কারণে আফ্রিকার অন্যতম ধারাবাহিক দল হিসেবে তাদের সুনাম আছে।
আইভরি কোস্ট (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪৩ শতাংশ, তবে দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় গোষ্ঠী মুসলিম)
পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি কোকো উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। ফুটবলে তারা বহু তারকা খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে। শক্তিশালী ও শারীরিক ফুটবলের জন্য আইভরি কোস্টের আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
ইরান (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৯ শতাংশ)
প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কবিতা, স্থাপত্য ও ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই রাষ্ট্র এশিয়ার সবচেয়ে ধারাবাহিক ফুটবল শক্তিগুলোর একটি। প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেই তারা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে এবারের বিশ্বকাপে তাদের অংশ নেওয়া নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত সেটা কাটিয়ে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছে তারা।
২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে সৌদি আরব ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়
সৌদি আরব (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৭ শতাংশ)
মক্কা ও মদিনার কারণে মুসলিম বিশ্বের কাছে সৌদি আরবের গুরুত্ব বিশেষ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশও এটি। ফুটবলে সৌদি আরব এশিয়ার সফলতম দলগুলোর একটি। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তারা ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয়।
কাতার (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি)
আয়তনে ছোট হলেও বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ কাতার। ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজন করে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফুটবলে বিপুল বিনিয়োগের ফলে কাতারের উন্নতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।
ইরাক (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৭ শতাংশ)
মেসোপটেমিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিতে গড়ে ওঠা ইরাক মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ফুটবল দেশটির মানুষের আবেগের জায়গা। এশিয়ান ফুটবলে ইরাকের রয়েছে সম্মানজনক অবস্থান। তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছে নরওয়ের কাছে হার দিয়ে।
জর্ডানের পেত্রা
জর্ডান (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৭ শতাংশ)
পেত্রা নামের প্রাচীন নগরীর জন্য জর্ডান বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। ফুটবলে তারা দীর্ঘদিন ধরেই উন্নতির পথে ছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাদের জন্য বিশেষ, কারণ এবারই প্রথমবারের মতো তারা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে।
উজবেকিস্তান (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৬ শতাংশ)
মধ্য এশিয়ার এই দেশটি একসময় প্রাচীন সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সমরখন্দ ও বুখারার মতো ঐতিহাসিক নগরী আজও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বহু বছরের চেষ্টার পর উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাস লিখেছে।

তুরস্ক (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৯ শতাংশ)
দুই মহাদেশে বিস্তৃত বিরল দেশগুলোর একটি তুরস্ক। ইস্তাম্বুল শহর একই সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার সাংস্কৃতিক মিলনস্থল। ফুটবলে তুরস্কের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০০২ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান। আবেগী সমর্থক ও লড়াকু ফুটবলের জন্য দলটি বিখ্যাত।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫১ শতাংশ)
বলকান অঞ্চলের এই দেশটি সুন্দর পাহাড়, নদী ও ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য পরিচিত। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ বসনিয়া। ২০১৪ সালের পর আবার বিশ্বকাপে ফিরে আসা তাদের জন্য বড় অর্জন।
উজবেকিস্তানের মুসলমানরা নামাজের পর মোনাজাত করছেন
এই ১৪টি দেশের মধ্যে রয়েছে আফ্রিকার ছয়টি, এশিয়ার ছয়টি এবং ইউরোপের দুটি দেশ। কারও ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো, কেউ আবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসেছে। কোথাও পিরামিড, কোথাও মরুভূমি, কোথাও প্রাচীন সিল্ক রোড, আবার কোথাও দুই মহাদেশকে যুক্ত করা শহর। ফুটবলের মাঠে অবশ্য ইতিহাস, ভূগোল বা অর্থনীতি খুব বেশি কাজে আসে না। সেখানে পার্থক্য গড়ে দেয় পরিশ্রম, কৌশল ও সাহস। তবু এই দেশগুলোর উপস্থিতি বিশ্বকাপকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে। কয়েকশ কোটি মুসলিম সমর্থকের আবেগ, প্রত্যাশা ও স্বপ্নও জড়িয়ে থাকে তাদের সঙ্গে।
সূত্র: সি-এশিয়া স্ট্যাটস, ফিফা, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তথ্যভান্ডার, পিউ রিসার্চ সেন্টার, ব্রিটানিকা