Image description

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আবারো এক গভীর পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক ইরান–যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ১৯৯০ সালের ইরাকের কুয়েত আক্রমণ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ–এর মতোই মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি ভারসাম্য পুনর্গঠনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেকে নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, এই নিরাপত্তা ছাতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়।

 

উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইরানি হামলায় কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সবসময় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি থেকে রক্ষা দিতে সক্ষম নয়।

 

এই বাস্তবতা উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর এবং পাকিস্তানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রবণতা বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দেশগুলোর সক্ষমতা একে অপরকে পরিপূরক করে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, মিশরের ভৌগোলিক ও সামরিক অবস্থান এবং পাকিস্তানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা মিলিয়ে একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

 

তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ জোট বলা যাচ্ছে না। ঐতিহাসিক বিরোধ ও আস্থার ঘাটতি এই দেশগুলোর সম্পর্ককে এখনো জটিল করে রেখেছে।

 

অন্যদিকে ইসরাইল তার কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনে নতুন ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, যা বিশ শতকের মধ্যভাগে অনুসৃত ‘পেরিফেরি ডক্ট্রিনে’-এর আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কৌশলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আরব বিশ্বের বাইরে একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে।

 

এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় শক্তি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির পর থেকে আবুধাবি ও তেলআবিবের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো ক্ষেত্রে সহযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই নতুন কাঠামোয় ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারত–ইসরাইল–ইউএই–যুক্তরাষ্ট্র সমন্বিত আইটুইউটু গ্রুপিং এবং প্রস্তাবিত ভারত–মধ্যপ্রাচ্য–ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর এই কৌশলগত সংযোগকে আরও শক্তিশালী করছে।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০–২০২৪ সময়ে ভারত ছিল ইসরাইলের অস্ত্র রপ্তানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশ এ তথ্য দিয়েছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

 

ইউরোপীয় প্রান্তে গ্রিস ও সাইপ্রাস ইসরাইলের সঙ্গে জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করেছে, যা তুরস্কের প্রভাব ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

 

দক্ষিণাঞ্চলে ইথিওপিয়া এবং সোমালিল্যান্ড নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠছে। লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে হুথি হামলার পর ইসরাইল নৌপথ নিরাপত্তা ও বাণিজ্য রুট সুরক্ষায় গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

এই অঞ্চলে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইথিওপিয়ার স্বার্থের মিল দেখা যাচ্ছে, যা একই সঙ্গে মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্কের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এখন কঠোর দুটি ব্লকে বিভক্ত হচ্ছে না। বরং অঞ্চলটি প্রবেশ করছে ‘ফ্লেক্সিবল ওভারল্যাপিং পার্টনারশিপ’-এর যুগে, যেখানে দেশগুলো এক ক্ষেত্রে সহযোগিতা করলেও অন্য ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করছে।

 

অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও বাস্তববাদী কূটনীতি এই সম্পর্কগুলোকে আরও জটিল করে তুলছে। উদাহরণ হিসেবে, মিশর একদিকে উপসাগরীয় বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে ইসরাইলের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখছে।

 

সূত্র: মিডল ইস্ট আই