এক যুগ আগে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করেছিল স্পেন। ২০০৮ সালে ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ ইউরো—টানা তিনটি বড় শিরোপা জিতে তারা গড়ে তুলেছিল আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরের তিন আসরে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২) স্পেন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে আবারও তাদের অন্যতম শিরোপা-প্রত্যাশী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন এই উত্থান-পতন?
২০১০ সালের খেলায় বাজিমাত
২০১০ সালের স্পেনের মূল শক্তি ছিল তাদের কিংবদন্তি মিডফিল্ড। জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা এবং র্সাজিও বুসকেতস-এর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল দুর্দান্ত একটি বল দখলভিত্তিক খেলার ধরন, যা ‘টিকি-টাকা’ নামে পরিচিত। ছোট ছোট পাস, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে দৌড় করিয়ে ক্লান্ত করে ফেলার কৌশলেই তারা বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছিল। স্পেনের তৎকালীন কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কের অধীনে খেলোয়াড়দের বড় অংশই বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ছিলেন। ফলে মাঠে বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
এরপর কেন শুরু হয় পতন?
স্ট্রাইকার সংকট
২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলে ডেভিড ভিয়ার মতো বিশ্বমানের গোলদাতা ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী এক দশকে স্পেন নিয়মিত গোল করার মতো কোনো ধারাবাহিক স্ট্রাইকার খুঁজে পায়নি। আলভারো মোরাতা, দিয়েগো কস্তা বা অন্যরা মাঝে মাঝে ভালো খেললেও কেউই ভিয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে স্পেন অনেক ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখলেও গোল করতে ব্যর্থ হয়েছে।
২০১৪ বিশ্বকাপে স্পেনের পতন ছিল আকস্মিক এবং নাটকীয়। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে তিনটি বড় কারণ ছিল। প্রথমত, স্বর্ণযুগের তারকাদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল। জাভি, ইনিয়েস্তা, জাবি আলোনসো ও ইকার ক্যাসিয়াসদের দীর্ঘদিনের ব্যস্ত মৌসুম শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বের অন্যান্য দল স্পেনের টিকি-টাকা কৌশলের দুর্বলতা খুঁজে বের করে ফেলেছিল। উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং স্পেনের ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষরা সফল হতে শুরু করে। ২০১৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে ৫-১ গোলের হার তার বড় উদাহরণ।
তৃতীয়ত, পুরোনো প্রজন্ম থেকে নতুন প্রজন্মে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেন বল দখলে আধিপত্য দেখালেও গোল করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। ফলে নকআউট পর্বে গিয়ে তারা বারবার হোঁচট খেয়েছে।
২০১৮ সালে কোচ সংকট
রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই দিন আগে তৎকালীন কোচ হুলেন লোপেতেগিকে বরখাস্ত করে স্পেন ফুটবল ফেডারেশন। কারণ তিনি বিশ্বকাপ চলাকালেই রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হওয়ার চুক্তি করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত দলের প্রস্তুতিতে বড় ধাক্কা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্পেন শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয়।
২০২৬ সালে পুনরুত্থানের সম্ভাবনা
বর্তমান স্পেন আগের স্পেন নয়
২০১০ সালের স্পেনের খেলা ছিল ধৈর্য ও বল দখলকেন্দ্রিক। কিন্তু বর্তমান স্পেন অনেক বেশি গতিশীল। এখন তারা উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণ করে, প্রেসিং করে এবং সুযোগ পেলেই সরাসরি প্রতিপক্ষের রক্ষণে আঘাত হানে। লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
বর্তমান স্পেনকে অনেক বিশ্লেষক ২০১০-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল মনে করছেন। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, নতুন প্রজন্মের অসাধারণ প্রতিভা। লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস রদ্রিদের নিয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি স্কোয়াড। বিশেষ করে রদ্রি ও ইয়ামালকে বর্তমান বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে ধরা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, তারা আর শুধু টিকি-টাকার ওপর নির্ভরশীল নয়। বর্তমান স্পেন বল দখলের পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণ, উইং ব্যবহার এবং উচ্চ গতির ফুটবল খেলতে পারে। ফলে তাদের খেলা আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সাফল্য। ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের মাধ্যমে স্পেন আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। সেই টুর্নামেন্টে তারা ইউরোপের কয়েকটি শীর্ষ দলকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল।
চতুর্থত, কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দলটির ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্বে স্পেন দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত ভালো ফল করছে এবং স্কোয়াডের গভীরতাও বেড়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ও বিশ্লেষণ সংস্থা স্পেনকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান ফেবারিট হিসেবে বিবেচনা করছে।
রদ্রি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় রদ্রি। তিনি শুধু মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণই করেন না, দলের আক্রমণ ও রক্ষণভাগের মধ্যে ভারসাম্যও তৈরি করেন। ২০১০ সালে যেমন জাভি ও বুসকেতস ছিলেন দলের মস্তিষ্ক, বর্তমান স্পেনে সেই ভূমিকায় রয়েছেন রদ্রি।
লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে বাড়তি প্রত্যাশা
১৭ বছর বয়সেই লামিনে ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তিনি স্পেনের জন্য সেই ধরনের পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন, যেটা ২০১০ সালে ইনিয়েস্তা বা ভিয়া করেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে গোল্ডেন বলের সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকাতেও তার নাম রয়েছে।
কেন পরিসংখ্যানবিদরাও স্পেনকে এগিয়ে রাখছেন?
ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অপটা'র সুপারকম্পিউটার ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে স্পেনকে অন্যতম শীর্ষ ফেভারিট হিসেবে দেখিয়েছে। এর কারণ হলো দলের দীর্ঘ অপরাজিত ধারা, স্কোয়াডের গভীরতা, ইউরো ২০২৪ জয়ের আত্মবিশ্বাস এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।
২০১০ সালের স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছিল মূলত জাভি-ইনিয়েস্তা-বুসকেতসের মিডফিল্ডের জাদুতে। আর ২০২৬ সালের স্পেনের আশা টিকে আছে রদ্রি-পেদ্রি-ইয়ামাল-নিকো উইলিয়ামসদের ওপর। অর্থাৎ, এক সময় যে দলটি বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল, এখন তারা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর তরুণ আক্রমণভাগগুলোর একটির জন্য আলোচনায়।
২০১০ সালের স্পেন ছিল বল দখলভিত্তিক ফুটবলের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ১৯ তম ফিফা বিশ্বকাপে স্পেন বিশ্বকে শিখিয়েছিল কীভাবে বল দখল করে ম্যাচ জিততে হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কৌশল পুরোনো হয়ে যায়, তারকারা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েন এবং দলটি রূপান্তরের কঠিন সময় পার করে।
এখন আবার নতুন এক প্রজন্মের হাত ধরে স্পেন বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফেরার স্বপ্ন দেখছে। ২০২৬ সালে তারা দেখাতে চায় কীভাবে গতি, সৃজনশীলতা ও তরুণ প্রতিভার সমন্বয়ে আবারও বিশ্বসেরা হওয়া যায়। তাই অনেকের মতে, ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের জন্য সত্যিকারের প্রস্তুত অবস্থায় মাঠে নামছে ‘লা রোজা’।