Image description

আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের সঙ্গে যৌথভাবে ‘হট ফেভারিট’ হিসেবে মাঠে নামবে ফ্রান্স। ফরাসি ফুটবলের গভীরতা বোঝাতে সম্প্রতি বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার থমাস মুনিয়ের একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তার মতে, ফ্রান্সের বর্তমান যে ফুটবল প্রতিভা রয়েছে, তা দিয়ে এমন তিনটি আলাদা দল গঠন করা সম্ভব। এমনকী প্রতিটি দলই নাকি বিশ্বকাপ জেতার ক্ষমতা রাখে।

আসলেই কি ফ্রান্সের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির দল বিশ্বকাপ জিততে পারবে? উত্তর ‘না’ হলেও, দলটির প্রতিভার গভীরতা যে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের চেয়েও গভীর, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ফুটবলভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ট্রান্সফারমার্কেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের মূল ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে যদি একটি বিকল্প একাদশ গঠন করা হয়, তবে সেই দলের বাজারমূল্য (প্রায় ৪১৮ মিলিয়ন ইউরো) পর্তুগাল, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস কিংবা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মূল দলের চেয়ে বেশি হবে!

গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলে ছড়ি ঘোরানো ফ্রান্স কীভাবে নিজেদের এই পর্যায়ে নিয়ে গেল? এর পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ পরিকল্পনা ও কাঠামোগত বিপ্লব। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ দশক পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে ফ্রান্সের ফুটবল ছিল চরম হতাশাজনক। প্রতিভার অভাব না থাকলেও বড় টুর্নামেন্টে বারবার মুখ থুবড়ে পড়ত তারা। এই ব্যর্থতা থেকে বাঁচতে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন জাতীয় দল ম্যানেজার জর্জ বুলোনের পরিকল্পনায় ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন ‘সেন্ট্রেস দে ফরমেশন’ বা বিশেষ প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।

‘আল জাজিরা’কে ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল ডু ফুটবল (আইএনএফ) ক্লেয়ারফন্টেইনের প্রশাসক ফ্রাঙ্ক বেন্টোলিলা বলেন, ‘ফ্রান্স তখন কোনো ট্রফি জিতছিল না। তাই একটি নতুন কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ সরকারের পূর্ণ সমর্থনে ১৯৭৪ সালে প্রথম ১৬টি একাডেমি সেন্টার স্থাপন করা হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও অভিবাসী পরিবারগুলো থেকে তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

 

এমন উদ্যোগের প্রথম সুফল পাওয়া যায় ১৯৯৮ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে। জিনেদিন জিদানের মতো অসামান্য প্রতিভার হাত ধরে সেবার বিশ্বজয় করে ফ্রান্সের বহুসাংস্কৃতিক বা ‘ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বিউর’ দল। এরপর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয় এবং ২০০৬ ও ২০২২ সালের রানার্স-আপ হওয়া প্রমাণ করে, ফরাসিদের এই একাডেমি ব্যবস্থা কতটা নিখুঁত।

ফ্রান্সের সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক বার্নার্ড লামা মনে করেন, ফরাসি ফুটবলের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো একাডেমি ব্যবস্থার সঙ্গে অভিবাসনের মেলবন্ধন। আফ্রিকা বা ফরাসি গায়ানা থেকে আসা মানুষেরা ফরাসি ক্রীড়া সংস্কৃতিতে এক নতুন গতি এনেছে।

লামা বলেন, ‘উসমান দেম্বেলে বা দেজিরে দুয়ের মতো নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসেনি, তারা ফ্রান্সের মাটিতেই বড় হয়েছে, বিশেষ করে প্যারিসের আশেপাশে। তারা শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের মাঝে জয়ের ক্ষুধা আছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, দেম্বেলে বা দুয়ের মতো খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।’

ফ্রান্সের এই ফুটবল বিপ্লবের মূল গোপন সূত্র কী? দীর্ঘদিনের ফরাসি কোচ ও স্কাউট স্টিফেন নাদো বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম, সুনির্দিষ্ট কাঠামো এবং নিখুঁত সংগঠনের সংমিশ্রণ। এখানে একজন খেলোয়াড়কে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না করে নিজের শেকড়ের কাছাকাছি রেখে শিক্ষা ও ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ক্লেয়ারফন্টেইনের প্রশিক্ষণে মূলত জোর দেওয়া হয় স্ট্রিট ফুটবলে। ১ বনাম ১ বা ২ বনাম ২ পজিশনে বল ড্রিবলিং ও ফার্স্ট টাচ উন্নত করার পর তাদের বড় মাঠে দলগত পজেশন শেখানো হয়।’

 

বেন্টোলিলা যোগ করেন, এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফুটবল প্রতিভা তৈরি হচ্ছে ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং ফ্রান্সের প্যারিসে। এর বড় কারণ স্থানীয় বেসরকারি একাডেমিগুলো। প্যারিসের এমন অনেক অপেশাদার বা লোকাল ক্লাব আছে, যারা বয়সভিত্তিক ফুটবলে বার্সেলোনা বা পিএসজির মতো প্রতিষ্ঠিত ক্লাবের একাডেমিকে অনায়াসে হারিয়ে দেয়। ৮-৯ বছর বয়স থেকেই এই শিশুরা চাপ সামলে খেলতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আশির দশকে ফরাসি দলকে বলা হতো ‘ইউরোপের ব্রাজিল’। চার দশক পর এসে সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও সংস্কৃতির হাত ধরে ফ্রান্স যেন আজ সত্যি সত্যিই ইউরোপের ব্রাজিলে পরিণত হয়েছে।