Image description

সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে কথা বলেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না খেলা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহ অনেক কিছুই উঠে এসেছে তাতে। 

প্রশ্ন: বিসিবি ও বিসিসিআই-এর মধ্যকার সম্পর্ক নতুন করে গড়তে আপনি কী করছেন? যা প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল...

তামিম ইকবাল: যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে সেই সমস্যাটা হলো, সম্ভবত আমিই প্রথম মুখ খুলেছিলাম। আগের বিসিবি প্রশাসন যেভাবে বিষয়টি সামলেছে, তা সঠিক ছিল না। আইসিসি যথেষ্ট নমনীয় ছিল, সমাধানের সুযোগ ছিল। আমাদের উচিত ছিল একটি সমাধান খুঁজে বের করা।

আমি ১৯৯৬-৯৭ সালের কথা মনে করি—কেনিয়ার বিপক্ষে সেই আইসিসি ট্রফি জেতার জন্য আমাদের কতটা লড়াই করতে হয়েছিল, শুধু বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার জন্য। জয়ের পর আমার পুরো এলাকা রঙের পানিতে ভাসছিল। মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করেছিল। সেই উদযাপনই ছোট ছোট বাচ্চাদের ক্রিকেটে টেনে এনেছিল—সবাই তখন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, খালেদ মাসুদ বা আকরাম খান হতে চাইতো। অথচ আমরা কোনো আলোচনা ছাড়াই একটি বিশ্বকাপ ছেড়ে দিলাম। ওই স্কোয়াডে এমন খেলোয়াড় থাকতে পারে, যার হয়তো আর কখনও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হবে না। এটা আমি মোটেও ভালোভাবে নেইনি।

বিসিসিআই প্রসঙ্গে বলবো, আমি বর্তমান বিসিসিআই সভাপতি মিঠুন মানহাসের সাথে অনেক ক্রিকেট খেলেছি। আইপিএলে আমরা একই দলে ছিলাম, তিনি ঢাকা লিগ খেলতে অনেকবার বাংলাদেশে এসেছেন। আমাদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক। এই দায়িত্বে আসার পর এখনও তার সাথে বসার সুযোগ হয়নি, তবে আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চমৎকার। কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই এবং ভারতীয় দলের জন্য সেটা কখনও ছিল না। ভারত যখন এখানে আসে, পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। মানুষ এই লড়াইটা ভালোবাসে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি বিসিবি এবং বিসিসিআই-এর মধ্যে এখন আর কোনো বড় সমস্যা নেই। এখানে একটি সিরিজ আয়োজন করাই হবে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।

 

প্রশ্ন: বিরোধের সময় পাকিস্তান সংহতির কথা বলেছিল—তারাও (টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) বয়কটের হুমকি দিয়েছিল। সেটা কি অকৃত্রিম ছিল নাকি স্রেফ রাজনীতি?

তামিম ইকবাল: এ বিষয়ে মন্তব্য করা আমার জন্য কঠিন। আমি সেই মূল নীতিনির্ধারক দলের অংশ ছিলাম না। আমি শুধু এটাই বলবো যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, আমরা একটি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারিয়েছি। আমাদের কিছু খেলোয়াড় হয়তো আর কখনোই সেই সুযোগ পাবে না। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ সম্পর্কে—এই নতুন ভূমিকায় এখনও তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি, তবে আমি অনেক ভারতীয় ক্রিকেটারের কাছে তার সম্পর্কে অনেক ভালো কথা শুনেছি। আমি সবসময় আইসিসিকে একটি পরিবারের মতো দেখেছি- যখন খেলোয়াড় ছিলাম তখনও এবং এখনও। এখানে ১২-১৫টি দেশ একসাথে থাকে। আমাদের একে অপরের খেয়াল রাখতে হবে। আমি সত্যি বিশ্বাস করি না যে আমরা যেসব দলের কথা বলছি, তারা আমাদের খারাপ চায়। ক্রিকেটকে ক্রিকেটের জায়গাতেই রাখা উচিত।

প্রশ্ন: আপনি বলেছিলেন— ‘আমার সবকিছু জানার দরকার নেই, যারা এই চেয়ারে বসেন তারা মনে করেন যে তারা সব জানেন।’ আপনি কি এই দর্শন নিয়েই কাজ শুরু করেছেন?

তামিম ইকবাল: আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ক্রিকেট, তাই আমি ক্রিকেটের দিকটা অন্যদের চেয়ে ভালো বুঝবো। কিন্তু আমাদের কমিটিতে এমন অনেকে আছেন যারা অর্থায়ন, টেন্ডার বা কেনাকাটার বিষয়ে অনেক দক্ষ। আপনাকে সেই সব মানুষদের ব্যবহার করতে হবে। একটি ক্রিকেট বোর্ড চালাতে হলে সবকিছুর সংমিশ্রণ লাগে—এটি কেবল ক্রিকেটের বিষয় নয়। এখানে অর্থায়ন, স্পনসরশিপ, মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয় আছে। আর বাকি সবকিছুর জন্য একজন সিইও থাকেন। বাংলাদেশে ক্রিকেটের কী প্রয়োজন তা বোঝার মতো দীর্ঘ সময় আমি ক্রিকেট খেলেছি—এখানে অনেক পরিবর্তন, অনেক উন্নয়ন এবং মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমি শুধু সেদিকেই মনোনিবেশ করছি।

প্রশ্ন: বিসিবির ব্যাংকে ১৩০০ কোটি টাকা পড়ে আছে। আপনি বলেছেন যে এই টাকা অলস পড়ে থাকা উচিত নয়।

তামিম ইকবাল: একদম ঠিক। আমি চাই আমার খেলোয়াড়রা ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে খেলুক। বিনিময়ে আমি আমার খেলোয়াড়দের কী দিচ্ছি? আমি যদি তাদের সেরা সুযোগ-সুবিধা না দিই—যা দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে—তবে কি তাদের কাছে বড় সাফল্য আশা করা ঠিক হবে? আমি তা মনে করি না। আইসিসি আমাদের টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখার জন্য দেয় না। স্পনসররাও সেজন্য টাকা দেয় না। এই টাকা উন্নয়ন এবং অবকাঠামোতে ব্যয় করা উচিত; ক্রিকেটে প্রকৃত বিনিয়োগ প্রয়োজন। অন্তত পাইপলাইন এবং অবকাঠামো তৈরি করুন, এরপর সেটা খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করবে।

প্রশ্ন: দায়িত্ব নেওয়ার আগে আপনি বলেছিলেন যে খেলাধুলায় বেটিং বা জুয়ায় ধরা পড়লে ১০ বছরের জেলের আইন করবেন। এখন আপনি সিস্টেমের ভেতরে—এখনও কি মনে করেন এটা সম্ভব?

তামিম ইকবাল: আমি মনে করি এটা সম্ভব। সংসদের স্পিকার টেস্ট ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন—আমি তার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। আমি ক্রীড়ামন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও কথা বলেছি। আমি কেবল বেটিং নয়, ক্রীড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি আইন চাই। বর্তমানে দুর্নীতিবাজরা জানে যে বড়জোর তাদের নিষিদ্ধ করা হবে। তাদের এটা বোঝা দরকার, ধরা পড়লে তাদের জেলে যেতে হবে। এতে দুর্নীতি হয়তো একেবারে নির্মূল হবে না, তবে অনেক কমে আসবে। আমরা যখন ছোট ছিলাম, শুধু জানতাম কীভাবে খেলতে হয়, জিততে হয় বা রান করতে হয়। এখন সারা বিশ্বের মতো আমাদের এখানেও বাচ্চারা এসবের (জুয়া) সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের বুঝতে হবে—যেভাবে ছোটবেলায় শেখানো হয় যে চুরি করলে পুলিশ ধরবে, তেমনি বেটিংয়ে জড়ালে জেলে যেতে হবে।

প্রশ্ন: একটি অ্যাডহক কমিটির কেন প্রয়োজন ছিল? বাংলাদেশের বাইরের অনেকে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝেন না।

তামিম ইকবাল: আগের নির্বাচনগুলো ছিল আপাদমস্তক আপোষহীন—সাতজন পরিচালক পদত্যাগ করেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেকাংশেই ঢাকা লিগের ওপর নির্ভরশীল—চারটি বিভাগে মোট ৭৬টি দল। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি দল খেলায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছিল। প্রথম বিভাগে ২০টি দলের মধ্যে ৮টি খেলেনি। দ্বিতীয় বিভাগে ২৪টির মধ্যে ১২টি বাইরে ছিল। প্রিমিয়ার লিগে ১২টির মধ্যে ৯টি দলই বিরোধিতা করেছিল। ক্রিকেটররা পারিশ্রমিক পাচ্ছিলেন না। যেসব খেলোয়াড় ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে জীবন গড়েছিলেন, তারা পথে বসে গিয়েছিলেন—অনেকে রিকশা চালানো বা ফুচকা বিক্রির মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তদন্ত শুরু করে এবং পরিচালকরা জবানবন্দি দেন। আগের বোর্ডের বেশ কিছু পরিচালকের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল।

আমার লক্ষ্য সহজ ছিল- কাজটা শুরু করা যাক। এটা হয় সফল হবে, না হয় ব্যর্থ। আমি ব্যর্থ হতেও প্রস্তুত—কারণ অন্তত ভালোর জন্য চেষ্টা করছি। আমাকে নির্বাচনের জন্য ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আমি তা ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করবো। এবং আমরা নিশ্চিত করবো যে বিশ্বকাপের সময় যা ঘটেছে, তা যেন আর কখনও না ঘটে।