Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বাজিমাত করেছেন বিএনপির সাত নেতা। বহিষ্কারের খড়গ মাথায় নিয়ে জয়ী হওয়া এই নেতাদের ভবিষ্যৎ এখন কী, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা। তারা কি ‘ঘরে’ ফিরবেন নাকি বিএনপি তাদের জন্য দরজা বন্ধই রাখবে?

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিদ্রোহী হয়ে জয়ী হলেই দলে ফেরার পথ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় না। বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।

তবে আপাতত দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্নে ‘কঠোর’ অবস্থানেই রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু এই সাতজনই নন, নির্বাচনের মাঠে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ ফ্যাক্টর ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। অন্তত ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছেন তারা। এর মধ্যে ২১টি নিশ্চিত আসন হাতছাড়া হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা জিতেছেন ২১টি আসনে। ফলে মোট ২৮টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব স্পষ্ট ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জয়ী সাতজনের ভবিষ্যৎ কী?
বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হওয়া সাতজনের অধিকাংশই ইতোমধ্যে দলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলেছেন, দল চাইলে তারা ফিরবেন এবং নিজেকে বিএনপির লোক হিসেবেই দেখেন। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান স্পষ্ট বলেছেন, দলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। দলে ফেরানো হবে কি না এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।

দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, সাধারণত বহিষ্কৃত নেতারা প্রকাশ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করলে ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সম্মত হলে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সংসদে সংখ্যার সমীকরণ, সরকারবিরোধী কৌশল ও মাঠের রাজনীতি– সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘চেয়ারম্যান এবার দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। যারা দলের নির্দেশ অমান্য করেছেন, তাদের শিগগিরই দলে ফেরার সম্ভাবনা কম।’

২৮ আসনে বিদ্রোহীর থাবা, লাভবান জামায়াত জোট
নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে সাতজন জয়ী হলেও বাকিদের কারণে ভোট ভাগাভাগিতে কপাল পুড়েছে বিএনপির জোট শরিকদের। অন্তত ২১টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা ভোট কাটায় জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর প্রথম দিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা। পরে দলীয় নির্দেশনা মেনে বেশিরভাগ নেতা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তবে দলের কঠোর অবস্থান মানেননি অনেক হেভিওয়েট নেতা। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত লড়েছেন। ফলে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। এমনকি তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশের সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ৭৮টি আসনের মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সবমিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তারা ভেবেছিলেন নিজ এলাকায় তাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অনেক। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল তাদের সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে। সাতজন বাদে বেশিরভাগ প্রার্থীই বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্রোহীতে বিএনপি ২১ আসনে ধরাশায়ী হয়েছে। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এ আসনে ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট। এ আসনে ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। এ আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন যথাক্রমে ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট ও ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট পান। বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হওয়া এ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।

একইভাবে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় চট্টগ্রাম-১৬, পাবনা-৪, বাগেরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২, যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, ময়মনসিংহ-৬, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ ও বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসন হারিয়েছে বিএনপি।

কয়েকটি আসনের চিত্র এ সমীকরণ স্পষ্ট করে তোলে–
ঢাকা-১২: বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল আলম (নীরব) –দুজনের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় জয় পান জামায়াতের প্রার্থী। দুই নেতার সম্মিলিত ভোট ছিল ৬০ হাজারের বেশি। অথচ জামায়াত প্রার্থী ৫৩ হাজার ভোট পেয়েই এমপি নির্বাচিত হন।
সিলেট-৫: বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগিতে এখানেও জয়ী হন জামায়াত জোটের প্রার্থী।
নারায়ণগঞ্জ-৪: বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী প্রায় ৪৪ হাজার ভোট কেটে নেওয়ায় বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াত জোটের প্রার্থী।
এছাড়াও চট্টগ্রাম-১৬, পাবনা-৪, বাগেরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২সহ বেশকিছু আসনে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে বিএনপিকে।

পরাজিতদের ‘ঘরে ফেরার’ আকুতি
নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর মোহভঙ্গ হয়েছে অধিকাংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর। দলীয় প্রতীকের বাইরে নিজস্ব ভোটব্যাংক যে নড়বড়ে, তা ফলাফলেই স্পষ্ট। নির্বাচনে হেরে এখন অনেকেই ভুল স্বীকার করে দলে ফিরতে চাইছেন।

ঢাকা-১৪ আসনে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) বলেন, ‘আজীবন বিএনপির রাজনীতি করেছি। দল যদি পুনর্বিবেচনা করে, তবে দলের জন্যই কাজ করব।’

একই সুর শোনা গেছে নাটোর-১ আসনে পরাজিত বহিষ্কৃত নেতা তাইফুল ইসলাম টিপুর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘আদর্শিক জায়গা থেকে আমি বিএনপিতেই আছি। দল চাইলে কর্মী হিসেবে কাজ করে যাব।’

হাইকমান্ডের বার্তা: দল আগে, ব্যক্তি পরে
বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, দল পুনর্গঠনের কাজ সামনে। তার আগে বহিষ্কৃতদের বিষয়ে এখনই কোনো নমনীয়তা দেখানোর সুযোগ নেই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম তারা যেন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে না যান। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। এখন ফিরতে চাচ্ছেন ভালো, তবে দেখা যাক কী করা যায়।’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সংসদে অবস্থান শক্তিশালী করতে শেষ পর্যন্ত সাত বিজয়ী এমপিকে বিএনপি কৌশলে কাছে টানতে পারে। তবে যারা হেরেছেন, তাদের জন্য দলের দরজা সহসাই যে খুলছে না, সেটি মোটামুটি পরিষ্কার।