Image description

এম আবদুল্লাহ

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিবেচনা করা হতো সাবেক বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। তারপরই সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের ১২ জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম ও ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মোটামুটি বিতর্কহীন সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হিসেবে মানা হয়। নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অভাবনীয় সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হলো বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দলÑসবাই এর কমবেশি কৃতিত্বের দাবি করতে পারেন। দলনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশেষত, সশস্ত্র বাহিনীর নজিরবিহীন নিরাপত্তা, কঠোর নজরদারি, গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। এই প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনে লাশের সারি দেখা যায়নি। দু-একটিতে সাময়িক বিঘ্ন ছাড়া কোনো কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে হয়নি। একটি গুলিও খরচ না করে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক সংঘাতময় দেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বিশাল যজ্ঞ সম্পন্ন করা অবিশ্বাস্যই বটে!

২৫ বছর কোনো নির্বাচনে জনমতের সত্যিকারের প্রতিফলন হয়নি। গোটা একটি প্রজন্ম এর আগে ভোট দিতে পারেনি। ফলে ভোটাধিকারবঞ্চিত মানুষ একটি ভালো নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে। প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে তাদের উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধভাঙা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতিহাসসেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার আশ্বাস দিলে অনেক বিশ্লেষক ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছেন। সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশয়ের পেছনে যৌক্তিক কারণও ছিল। দলবাজ ও ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে একটি প্রশ্নহীন নির্বাচন করা কারো কাছেই সহজ মনে হয়নি। কিন্তু সেই অসাধ্যই সাধন করেছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ও অভ্যুত্থানের পর গঠিত নির্বাচন কমিশন।

টালমাটাল পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত দেশে চালকের দায়িত্ব নেওয়া ড. ইউনূসের সরকারের ১৮ মাসের শাসনে সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু ‘শেষ ভালো যারÑসব ভালো তার’ থিওরিতে ‘ইতিহাসসেরা’ নির্বাচনের জন্য অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের নাম বোধকরি সোনালি হরফে লেখা থাকবে। একই সঙ্গে আরেকবার প্রমাণিত হলো, সরকার চাইলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা অপরিপক্বতা ও দোদুল্যের পরিচয় দিয়েও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন উতরে গেছে। নাসির কমিশনও কৃতিত্বের দাবি করতে পারে। সবচেয়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে সশস্ত্র বাহিনী। ভোটের আগের রাত ও ভোটের দিন তাদের নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থান বড় সহিংসতামুক্ত একটি নির্বাচন উপহার দিয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার কথা রেখেছেন। তাকেসহ সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে অন্যান্য বাহিনীও ইতিবাচক ভূমিকায় থাকতে হয়েছে।

নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দুই দশক পর সরকার গঠন করতে চলেছে বিএনপি। শুক্রবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও মিত্র দলগুলো ২১২টি আসন নিয়ে ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করেছে। এটি বিএনপির নির্বাচনি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিজয়। ২০০১ সালে ১৯৩ আসন পাওয়া ছিল বিএনপির নির্বাচনি রাজনীতিতে বড় সাফল্যের রেকর্ড। এবার সেটি অতিক্রম করে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। নিরঙ্কুশ এই বিজয় পাওয়ায় দল হিসেবে বিএনপিকে এবং তারুণ্যদীপ্ত নেতা তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও বিএনপির অবিস্মরণীয় বিজয় আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্বনেতারা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের কোনো জাতীয় নির্বাচন এতটা ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও ভোটগ্রহণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে এবং ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছেন। কাতারভিত্তিক আলজাজিরা বলেছে, এ ফল দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে ত্রয়োদশ নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব পড়তে পারে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বিশ্লেষণে জানিয়েছে, জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিএনপির জয় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ বিজয়কে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। শনিবার নির্বাচন কমিশন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নাম গেজেটে প্রকাশ করেছে। এখন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পালা। গণঅভ্যুত্থানের পর বিগত দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। তারপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী বিকল্প উপায়ে শপথগ্রহণ সম্পন্ন করতে হবে। যতটা জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ১৭ কিংবা ১৮ ফেব্রুয়ারি এ শপথের সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। যেদিন সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন, সেদিনই নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিতে পারেন। ত্রয়োদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তারেক রহমান। গঠন করবেন তার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের মন্ত্রিসভা। সেদিকেই এখন ছত্রিশ কোটি চোখ।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও গণভোটে ভোটের হার ছিল ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। শতকরা হিসাবে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট পড়েছে ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ আর ‘না’-সূচক মতামত এসেছে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ। গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে ‘না’ জয়যুক্ত হওয়া এবং সারা দেশে সোয়া ২ কোটি ‘না’ ভোট আওয়ামী লীগ-দলীয় ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ জানান দিচ্ছে। এর সুফল বিএনপি পেয়েছে।

বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি ও গণ অধিকার পরিষদ ১টি আসন পেয়েছে। বিএনপি জোটের জয় করা ৮০টি আসনে ভোটের ব্যবধান স্বস্তিদায়ক হয়নি। স্বল্প ব্যবধানে জয় পাওয়া এসব আসন বিএনপির জন্য সতর্ক বার্তা। আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন্দ্রমুখো না হলে বা ভোট পুরোপুরি বর্জন করলে অনেক আসনেই ফলাফল ভিন্ন হতে পারত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আবার ১২টি আসনে ৫ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষের কাছে পরাজিত হওয়া বিএনপি প্রার্থীরাও দলীয় কোন্দল ও সমন্বয়হীনতাকে দুষছেন।

ত্রয়োদশ নির্বাচন জামায়াতকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আসনের বিচারে বিএনপি জোট থেকে এক-তৃতীয়াংশের মতো হলেও ভোটের বিচারে জামায়াত পাওয়ার পলিটিকসে নিজেদের ফ্যাক্টর হিসেবে জানান দিতে পেরেছে। মোট ভোটের শতাংশে বিএনপি ও জামায়াতের ব্যবধান ১০ শতাংশের মধ্যে বলে প্রাথমিক হিসেবে জানা গেছে। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হচ্ছে জামায়াত। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এককভাবে নির্বাচন করে দলটি আসন জিতেছিল মাত্র তিনটি। তারপর আর ভোটের বাজার এককভাবে যাচাই করেনি। এবার এক লাফে আসন ৬৮-তে উন্নীত হয়েছে। দূর কিংবা অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলেও সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াতের দ্বিতীয় অবস্থান ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং সুশাসন ও জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিএনপির শ্রেষ্ঠত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ভোটের অঙ্ক তেমনটাই জানান দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের দুর্গখ্যাত ৩০টির মতো আসন এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এবার বিএনপি জয় পেয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকলে এগুলোতে নৌকার জয় ঠেকানো যেত না। এসব আসন বাদ দিলে বিএনপির আসনসংখ্যা ১৮০টিতে নেমে আসে। আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনে জামায়াত ভবিষ্যতে ভোট বাড়াতে সক্ষম হলে এবং আওয়ামী লীগ ও বামদের ভোট আলাদা বাক্সে গেলে বিএনপিকে নিশ্চিত ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে।

বিএনপির দুর্গখ্যাত অনেক এলাকায় জামায়াতের বড় উত্থান ভূমিধস জয় পাওয়া দলটির জন্য সতর্কতামূলক ‘হলুদ সিগন্যাল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগে একাধিপত্য ছাড়াও ঢাকায় জামায়াত এবার বড় সাফল্য দেখিয়েছে। ১৫টির মধ্যে ছয়টি আসন জিতলেও ঢাকা শহরে জামায়াতের পরাজিত প্রার্থীদের অনেকের ভোটসংখ্যায় বিশ্লেষকদের চোখ আটকে যাচ্ছে। জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের আসন হিসাবে নিলে ১৫টির মধ্যে ৭টি। আরও ৫টি আসনে জামায়াত জোট তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে। সামনের সিটি নির্বাচনসহ সম্ভাব্য আন্দোলন-সংগ্রামে জামায়াতের এ ভোটাররা যে বড় ফ্যাক্টর হবেন, তা উপেক্ষা করলে বিএনপি ভুল করবে। ঢাকার কাছে গাজীপুরে জামায়াত আসন জয় করেছে, যা কারো হিসাবে ছিল না। নির্বাচনি ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। বিএনপির নন্দিত মরহুম নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহর আসনে তার সন্তান শাহ রিয়াজুল হান্নান সাবেক শিবির সভাপতি সালাউদ্দিন আইয়ুবীর কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। রাজধানীর উপকণ্ঠ টঙ্গীর পূর্ব, পশ্চিম ও গাছা থানা এলাকায় জামায়াত সমর্থিত অখ্যাত এনসিপি প্রার্থী বাজিমাত করে ধানের শীষকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছে। সাভারেও জামায়াতের শক্তিমত্তায় ভর করে এনসিপি প্রার্থীর ভোটসংখ্যা লাখ অতিক্রম বিএনপির আগামীর রাজনৈতিক পথচলায় চোখ রাঙাচ্ছে।

এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, জামায়াতের মতো সুসংগঠিত দলের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের নবগঠিত দল এনসিপি প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয় আসন জয় করে চমক দেখিয়েছে। জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যারা দলটিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিলেন, তাদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ভোটের জোট করে সবচেয়ে লাভবান হওয়া দলের নাম এনসিপি। নিজেদের মার্কা ‘শাপলা কলি’তে উল্লেখযোগ্য ভোট নির্বাচনি রেকর্ডে যুক্ত করতে পেরেছে। এবি পার্টি আসন জয় না করতে পারলেও দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে বেশ শক্তভাবেই। আল্লামা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও জোটের সুফলে দুটি আসন জয় করেছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ভোটগ্রহণে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ না তুললেও কিছু আসনে ফলাফলে কারসাজির অভিযোগ তুলেছে। এনসিপি বলেছে-বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিতে ফলাফল টেম্পারিং করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। একটি ভালো নির্বাচন কয়েকটি আসনের ভোট গণনা-সংক্রান্ত অভিযোগের কালিমায় ম্লান হওয়া কোনো মতেই বাঞ্ছনীয় নয়। পরাজিত হওয়া ঢাকা উত্তরের আমিনুল ইসলামসহ বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীও ফলাফলে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। সব অভিযোগই আমলে নিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত এবং ন্যায্য ফয়সালা হলে সেটাও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। মুন্সীগঞ্জে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের হাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ২০০ ঘরবাড়ি ভাঙচুরের খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। মুন্সীগঞ্জ, বাগেরহাট, ফেনী, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, পাবনা, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঝালকাঠিতে নির্বাচনে পরাজিত দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত ১১৭ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জে গুদাম থেকে চাল লুটের অভিযোগ উঠেছে।

প্রত্যাশিত ফলাফল না পেলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এক সংবাদ সম্মেলনে অতীতের নেতিবাচক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দিয়ে ইতিবাচকভাবে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কথা ঘোষণা করেছেন। ফলাফল মেনে নেওয়ায় জামায়াত আমির দলের নেতাকর্মীদের ভার্চুয়াল সমালোচনার মুখে পড়তে দেখা গেছে। অবশ্য জামায়াত আমির পরে আরেক প্রেস ব্রিফিংয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে ‘যথাযথ সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

অন্যদিকে বিজয়ী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজয় মিছিল না করার নির্দেশনা দিয়ে সবাইকে সহনশীল আচরণ ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখতে বলেছেন। কিন্তু তার সেই নির্দেশনা উপেক্ষিত হতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আগামীর সরকারপ্রধান তারেক রহমানকে শুধু নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, কার্যকর শক্ত বার্তা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এ নির্বাচনকালীন বিরোধের বিষবাষ্প ক্রমেই সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। অবশ্য বিএনপি দলীয় কয়েকজন নবনির্বাচিত এমপি নেতাকর্মীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সন্ত্রাসে জড়িত কয়েকজনকে পুলিশে সোপর্দ করার ইতিবাচক দৃষ্টান্তও আছে। বিজয়ীরা পরাজিত প্রার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহাবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন। এটা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত করা জরুরি।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ হচ্ছে বিস্তর। রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সপ্তাহান্তে বিস্তারিত লেখার আশা রাখি। তবে আজ আশু চ্যালেঞ্জ হিসেবে দলীয় বেপরোয়া নেতাকর্মীদের ওপর দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের সৎ ও নির্লোভ নেতাদের বাছাই, উদ্ভূত যেকোনো সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনার দরজা সবসময় খোলা রাখা, ভিন্নমত ও সমালোচনা ধারণে ‘হজম-শক্তি’ বাড়ানো, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের খুনি-লুটেরাদের বিচার ত্বরান্বিত করা, শহীদ হাদি হত্যার সুবিচার নিশ্চিত করা, সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল ইস্যুটি ঘোট পাকানোর আগেই নিষ্পত্তি করা, দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করার মতো বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

দলগতভাবে বিএনপি রাষ্ট্রসংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বিএনপি সরকারের ওপর সংস্কারের বাড়বে। ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতে ১৮০ দিন একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা পালন করবে। এটা ঠিক যে, জুলাই সনদের কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে উদার মনোভাব নিয়ে সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া ঠিক হবে না, যা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত তর্কবিতর্ক ও আলাপ-আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সমালোচনা আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে শহীদ জিয়ার মতো সমালোচকের সঙ্গে বসে, কথা বলে বোঝার বা বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে নিয়মিত। এর ব্যত্যয় ঘটা মানেই বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা, যা গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সবার হলেও প্রধানত সরকারের। আরো সুনির্দিষ্ট করলে সরকারপ্রধানের।

অভ্যুত্থান-পূর্ব দেড় দশকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে দুর্বিনীত ও ফ্যাসিস্টে পরিণত করেছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশে দেশে নিরঙ্কুশ বিজয় স্বৈরশাসকের জন্ম দেওয়ার নজির রয়েছে। সংসদে একাধিপত্য রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ করলেও এর ঝুঁকিও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। বিএনপি এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে বলে আশা করা নিশ্চয়ই অমূলক হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক