Image description

রাজনীতি ও ভোটের লড়াইয়ে তারা ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটাভুটি শেষে একজন জয়ী হওয়ায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাসায় গিয়ে অভিনন্দন জানান। আবার কেউ কেউ মিষ্টি মুখ করিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, কুশল বিনিময় করেন। তাদের এই শুভেচ্ছা বিনিময়কে রাজনীতিতে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তা বলছেন অনেকে।

রাজশাহীতে ভোট যুদ্ধের বাইরে সৌজন্যের রাজনীতি দেখা গেছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে সৌহার্দ্য ও সৌজন্যমূলক রাজনীতির এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। নির্বাচনী উত্তাপ কাটিয়ে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা গণতান্ত্রিক চেতনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে। বিজয়ী ও পরাজিত প্রাথী ও নেতাকর্মীরা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।

রাজশাহী সদর-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মিজানুর রহমানকে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরীর নেতৃবৃন্দ। শুক্রবার রাত ৯টায় তার নিজ বাসভবনে গিয়ে এ শুভেচ্ছা জানান তারা। পাশাপাশি কুশল বিনিয়ম করেন।

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত বিজয়ী প্রার্থী শফিকুল হক মিলনকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। শনিবার দুপুর ১২টায় হড়গ্রাম ইউনিয়নের আদাড়িয়া পাড়ায় অধ্যাপক আজাদের নিজ বাসভবনে এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উভয় নেতা একে-অপরকে মিষ্টিমুখ করান এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করেন। এমন সৌজন্যমূলক আচরণকে সম্প্রীতির নতুন বার্তা হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে।

জামায়াত নেতা অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‌‘মিলন আমার ছোট ভাই। দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। তিনি জনগণের রায়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়নে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।’

 

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বলেন, ‘নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। মতপার্থক্য থাকলেও আমাদের লক্ষ্য এক-জনগণের কল্যাণ। আমি সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই।’

rajsahiমিষ্টিমুখ করিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান

তিনি আরও বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। জেলা ও মহানগরের আদলে রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়ন করা হবে। কালাম ভাই একটানা ২৮ বছর হড়গ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই।’

রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসন থেকে বিএনপির সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মন্ডলকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জামায়াতের জেলা সহকারী অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও নির্বাচন মনিটরিং কমিটির প্রধান মুহাম্মদ নুরুজ্জামান লিটন। 

সৌজন্য সাক্ষাতে জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম এতে সম্মতি জানান। পাশাপাশি তিনি আগামী দিনে এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন, হানাহানির রাজনীতি পরিহার এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিভেদ দূর করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন জামায়াতের পরাজিত প্রার্থী অধ্যক্ষ নাজমুল হক। আবু সাঈদ চাঁদ শুক্রবার বিকালে সলুয়া ইউনিয়নের চামটা গ্রামে নাজমুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেন। ফুলের মালা প্রথমে আবু সাঈদ চাঁদকে পরিয়ে দেন নাজমুল হক। পরে এই মালা নাজমুল হককে পরিয়ে দেন আবু সাঈদ চাঁদ। নাজমুল হক আবারও পরিয়ে দেন চাঁদকে।

শামসুদ্দিন রিন্টু নামের এক ভোটার বলেন, ‘এটা রাজনীতির সৌন্দর্য, এটা দেখে রাজনৈতিক নেতাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত, রাজনীতি এমন হওয়া উচিত। রাজনীতি থেকে প্রতিহিংসা দূর হওয়া উচিত।’

আরেক ভোটার শাহিদুল ইসলাম সজিব বলেন, ‘এমনই সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে একসঙ্গে মিলে এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি এমপিদের।’

যশোর-৩ (সদর) আসনে ধানের শীষের বিজয়ী প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল কাদেরসহ চার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। শুক্রবার রাতে তিনি প্রথমে কথা বলেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল কাদেরের সঙ্গে। তারা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং শুভকামনা এবং সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

তিনি আরও যোগাযোগ করেছেন হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন, চশমা প্রতীকের জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রার্থী নিজামুদ্দিন অমিত এবং কাস্তে প্রতীকের বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মো. রাশেদ খানের সঙ্গে। যশোরের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও জনস্বার্থের প্রশ্নে তাদের মধ্যে কোনও মতভেদ নেই বলেও জানান প্রতিদ্বন্দ্বীদের।

খুলনা-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মহানগরীর জামায়াতের সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল শুক্রবার বিকালে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বাসভবনে যান। এ সময় তিনি শুভেচ্ছা বিনিময়করেন এবং মিষ্টিমুখ করান। মঞ্জু হাসিমুখে হেলালকে ধন্যবাদ দেন এবং মিষ্টি মুখ করান। এরপর হেলাল ইসলামী আন্দোলনের দলীয় কার্যালয়ে যান এবং অপর প্রার্থী মোহাম্মদ আমানুল্লাহর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর মিষ্টি মুখ করান। হেলাল নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর নিজের মধ্যে আলাদা কোনও উল্লাস বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়নি। জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন।’

Moulvibazar -3বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম নাসের রহমান তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নানের বাড়িতে গিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন

মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) আসনে বিজয়ী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম নাসের রহমান তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নানের বাড়িতে গিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ সময় মিষ্টি মুখ করিয়েছেন তিনি। শুক্রবার দুপুরে নাসের রহমান রাজনগর উপজেলার দত্ত গ্রামে জামায়াত প্রার্থীর বাড়িতে পৌঁছান। প্রথমে নাসের রহমান আব্দুল মান্নানকে মিষ্টি মুখ করান এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীও তাকে একইভাবে স্বাগত জানান। এ সময় আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এই আসনে পৌনে পাঁচ লাখ ভোট রয়েছেন। যারা ভোটার, তারা সবাই আপনার মানুষ। আপনি সবার দিকে খেয়াল রাখবেন। এটাই আমার আবেদন।’ উত্তরে নাসের রহমান বলেন, ‘আপনি জিতেছেন। সেজন্য আপনাকে মিষ্টি মুখ করতে এসেছি। আপনার মানুষ থেকে আমার মানুষ আপনাকে বেশি মূল্যায়ন করে।’

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী জাকির হোসেন সরকারকে মিষ্টিমুখ করিয়েছেন জামায়াতের জয়ী প্রার্থী মো. আমির হামজা। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শহরের কোর্টপাড়া এলাকায় জেলা বিএনপির কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জাকির হোসেনকে মিষ্টিমুখ করান।

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) ফল ঘোষণার পর বিজয়ী প্রার্থীর বাসায় গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পরাজিত প্রার্থী শিশির মনির। তিনি এই আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করেন। শুক্রবার এই আসনের বিজয়ী প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে তার বাসায় যান শিশির মনির। তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মিষ্টি খাওয়ান তিনি।

চাঁদপুর-৩ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া। গতকাল জুমার নামাজের পর শাহজাহান মিয়ার বাসায় যান শেখ ফরিদ। এ সময় তাকে মিষ্টিমুখ করান। অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়াও তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। জয়-পরাজয় মেনে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রাম-১ আসনে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী নুরুল আমিন মিষ্টি ও ফুল নিয়ে ছুটে গেলেন পরাজিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছাইফুর রহমানের বাড়িতে। শুক্রবার বিকালে উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জামায়াত প্রার্থীর বাড়িতে যান। এ সময় ছাইফুর রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। 

বিজয়ী প্রার্থী নুরুল আমিন বলেন, ‘নির্বাচন আসলে একটি প্রীতি ম্যাচের মতো। পরস্পর একে অপরকে ভাই ভাই মনে করি। বিএনপি-জামায়াত আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। সামনেও সহযোগিতা লাগবে।’