বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সোলায়মান ছিলেন চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান। তারও কিছু নির্ধারিত ভোট আছে; নির্বাচনে তা প্রভাব ফেলতে পারে।
ছাতা মার্কার প্রার্থীর বাবা এমপি ছিলেন ছয়বার; অন্যদিকে কোনোদিন বিএনপি না করেও ধানের শীষ পেয়ে গেছেন আরেকজন। এ দুই প্রার্থীকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের ভোটের আলোচনা।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা ও সাতকানিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় আসন।
এ আসনে বিএনপি, এলডিপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী ফ্রন্ট, ইনসানিয়াত বিপ্লব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীসহ মোট আট জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে বিএনপির দুইজন বিদ্রোহীও রয়েছেন।
২০০৮ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন এলডিপি সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। এবার আসনটিতে এলডিপির প্রার্থী হয়েছেন তার ছেলে মো. ওমর ফারুক।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এবার নানা নাটকীয়তা হয়েছে। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও দল মনোনয়ন দিয়েছে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিনকে।
বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকে পরাজিত করে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া জসীমকে নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল ঢাকায়; সেই মামলায় তিনি কারাগারেও ছিলেন।
আলোচনা আছে, জসীম ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ব্যবসার অংশীদার। তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়।
দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুল হক চৌধুরী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। সে কারণে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মিজানুল হক চৌধুরী ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি ফুটবল প্রতীকে নির্বাচন করলেও তেমন কোনো জনসংযোগে তাকে দেখা যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
অন্যদিকে এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ বিএনপি সরকারের আমলে ছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। স্থানীয়রা বলছেন, অলির হাত ধরেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন শুরু হয়েছিল।
বিশেষ করে চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে ভূমিকার কারণে অলি আহমদ ছিলেন সবার কাছে জনপ্রিয়। যদিও পরে তিনি বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন। ১১ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সমর্থনে আসনটিতে প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী।
চন্দনাইশ উপজেলা এবং সাতকানিয়া উপজেলার কেউচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, ধর্মপুর, পুরাণগড়, খাগরিয়া ইউনিয়ন মিলে গঠিত চট্টগ্রাম-১৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৩১ জন।
এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার ভোটার সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে। আর বাকি ভোটার চন্দনাইশ উপজেলার।
কোন প্রতীকে কে লড়ছেন
এলডিপির ওমর ফারুক (ছাতা), জসীম উদ্দিন (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আবদুল হামিদ (হাতপাখা), ইসলামী ফ্রন্টের মো. সোলাইমান (মোমবাতি), ইনসানিয়াত বিপ্লবের এইচএম ইলিয়াছ (আপেল), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ বাদশা মিয়া (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী (ফুটবল), শফিকুল ইসলাম রাহী (মোটর সাইকেল)।
প্রার্থী নিয়ে ভোটারদের ‘হিসাব-নিকাশ’
এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিন ও এলডিপির ওমর ফারুকের মধ্যে। যেহেতু মোট ভোটারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোট চন্দনাইশ উপজেলায়, সেহেতু দুই প্রার্থীই এগিয়ে থাকবেন।
তবে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী সোলায়মানও ভালো প্রভাব ফেলবেন বলে অনেকে মনে করছেন।
বেশ কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তাদের কারও মতে, ‘বাবার পরিচয়ে’ এ আসনে এগিয়ে থাকবেন এলডিপি প্রাথী ওমর ফারুক।
ভোটাররা বলছেন, অলি আহমেদ বিএনপি এবং এলডিপির প্রার্থী হিসেবে চন্দনাইশ আসনে ছয় বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সাল থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের ‘দাপটে’ ওই আসনে অন্য দলের প্রার্থী তেমন কোনো অবস্থান নিতে পারেনি।
তবু এলাকায় অলি আহমদের যে জনপ্রিয়তা ছিল সে হিসেবে তার সন্তান ওমর ফারুক ততটা পরিচিত মুখ নন। ৫ অগাস্টের পর থেকে তিনি এলাকায় যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। অলি আহমদও ছেলের পক্ষে বিভিন্ন এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী থেকে নির্বাচনের মাঠে এসে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন জসীম। নানা আলোচনা-সমলোচনা ও বিরোধিতার পরও ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে এমপি হওয়ার লড়াইয়ে আছেন তিনি। এবারের নির্বাচনে জসীমকেও এগিয়ে রাখছেন অনেকে।
২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চন্দনাইশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমেদকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন জসীম উদ্দিন।
ওই নির্বাচনে তার পক্ষে ছিলেন অলি আহমদ এবং আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ। ‘আর্থিকভাবে সচ্ছল’ জসীম এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকায় তার নিজস্ব বলয়ের কিছু নির্দিষ্ট ভোট আছে। তা কাজে লাগিয়ে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হন।
আবার স্থানীয় অনেক ভোটারের ভাষ্য, ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কিছু ‘নির্দিষ্ট ভোট’ আছে। জামায়াতের কর্মীরা জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপির ওমর ফারুকের পক্ষে চষে বেড়াচ্ছেন। আবার জসীমের বিষয়ে অনেকের মধ্যে ‘নেতিবাচক’ ধারণা আছে।
এদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী সোলায়মান চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান। ওই এলাকায় তারও কিছু নির্ধারিত ভোট আছে। সেসব ভোট সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
সাতকানিয়ার ছয় ইউনিয়নের ভোটারদের ভাষ্য, এক উপজেলায় দুটি সংসদীয় আসন হওয়ায় তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, অনেকেই আঞ্চলিকতা বিবেচনায় ভোট দিয়ে থাকেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন মিজানুল হক চৌধুরী। তার বাড়ি উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নে। সেবার সাতকানিয়ার ওই অংশে বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন তিনি।
এ নির্বাচনে মিজানুল হক চৌধুরী ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী। বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়া আরেকজন শফিকুল ইসলাম রাহীর বাড়ি খাগড়িয়া ইউনিয়নে।
মিজানুল হক চৌধুরী বা শফিকুল ইসলাম রাহী নির্বাচনে যে ভোটই পাক, সেটা বিএনপি প্রার্থীর কাছ থেকে কাটা হবে বলে মনে করেন স্থানীয় ভোটাররা। সে কারণে সুবিধা পেতে পারেন এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুক।
কী ভাবছে ভোটাররা?
এ আসনের ভোটার সাতকানিয়ার কেওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মুহাম্মদ নাজিম বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এ আসনে ছয়বার জয়ী হন অলি আহমদ, ২০১৪ সাল থেকে তিনবার জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তারা দুইজনই চন্দনাইশ উপজেলার বাসিন্দা। সে কারণে এ আসনের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে চন্দনাইশ উপজেলায় যে উন্নয়ন হয়েছে, তার ছোঁয়া লাগেনি সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নে।
নাজিম বলেন, “চন্দনাইশে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও নাজুক। পুরানগড়, বাজালিয়া, কালিয়াইশ ও খাগরিয়া ইউনিয়নের শঙ্খ নদীর কেওচিয়া ইউনিয়নের হাঙ্গর খালের ভাঙন হয়। কিন্তু এখানে কোনো বেড়িবাঁধ হচ্ছে না, গ্রামীণ সড়কগুলোর সংস্কার হয় না।”
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কেরানী হাটে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ এলাকার পূর্ব পাশ চন্দনাইশ আসনের সাথে আবার পশ্চিম পাশ সাতকানিয়া- লোহাগাড়া আসনের সাথে।
“গুরুত্বপূর্ণ ওই স্থানে কোনো বাস টার্মিনাল গড়ে ওঠেনি; মহাসড়কের মাঝখানে বাস দাঁড় করিয়ে ওঠানামা করানোর কারণে সেখানে যানজট নিত্যঘটনা।”
কেওচিয়া ইউনিয়নের এ বাসিন্দার ভাষ্য, “উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টি চন্দনাইশ আসনের সাথে, ১০টি লোহাগাড়া আসনের সাথে। যার কারণে একজন মনে করেন ‘এটা তার, ওটা আমার’; আবার আরেকজন মনে করে, ‘এটাতো আমার উপজেলা না, আরেকজনের উপজেলা’। সে কারণে এ অংশগুলোর কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয় না।”
এ আসনের বিভিন্ন ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা রাহী দীর্ঘদিন ধরে তার নিজ এলাকায় কাজ করে যাচ্ছিলেন।
চন্দনাইশ পৌর সদরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, চন্দনাইশ উপজেলা ও দোহাজারীতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে অলি আহমদ মন্ত্রী থাকাকালে। এ এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামোগত যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। পরে যিনি সংসদ সদস্য ছিলেন, তিনি শুধু সংস্কার করেছেন। এ কারণে চন্দনাইশের লোকজনের মধ্যে স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে তেমন কোনো দাবি নেই।
তবে অনেকের চাওয়া, গাছবাড়িয়া-আনোয়ারা সড়ক চার লাইনে উন্নীত করা হোক। চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নের সঙ্গে সাতকানিয়ার পুরানগড় ইউনিয়নের সংযোগ সেতু নির্মাণেরও দাবি রয়েছে তাদের।
প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধর্মপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি পথসভায় বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিন সাতকানিয়া অংশে বিভিন্ন উন্নয়নের আশ্বাস দেন।
জসীমকে তার জনসংযোগে সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়েও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা বলতে দেখা যায়।
ইউনিয়নের বিশ্বহাট এলাকার পথসভায় তিনি বলেন, এখানে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। বেকার সমস্যা আছে। সাতকানিয়া অংশের লোকজন এমপি নির্বাচনে চন্দনাইশের সাথে, আবার উপজেলা নির্বাচনে সাতকানিয়ায় ভোট দিয়ে থাকেন।
নিজেদের ‘সস্তা’ না ভাবার আহ্বান জানিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে জসীম বলেন, “সাতকানিয়ার ছয় ইউনিয়নের ৮৫ হাজার ভোটার আছে। দেশের অনেক উপজেলা আছে যেখানে এত ভোটার নাই।”
নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে বেকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সাতকানিয়ার ছয় আসন নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনার আশ্বাস দেন ধানের শীষের জসীম।
এদিকে সম্প্রতি পুরানগড় এলাকায় নির্বাচনি জনসংযোগে গিয়ে এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুক বলেন, ছেলে হিসেবে ‘বাবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে’ তিনি নির্বাচনে এসেছেন।
রাস্তাঘাটসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিয়েও তিনি কথা বলেন।
ফারুক বলেন, “হঠাৎ করে কোনো কারখানা তৈরি করা যায় না। এজন্য কোন এলাকায় কোন ধরনের কারখানা গড়ে তোলা যায়, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে কর্মসংস্থানও করা হবে।”
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী সবাই
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী মনে করেন, নির্বাচন জয়ী হওয়ার ‘ব্যাপক সম্ভাবনা’ আছে তার।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এলডিপি নির্বাচনে ‘সুবিধা’ পাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মোটর সাইকেল প্রতীকের এই প্রার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সময় বদলে গেছে। এখন মানুষ সচেতন। এখন মানুষ মার্কার পাশাপাশি প্রার্থীকেও পছন্দ করে। আগে এক নেতা ২০০ ভোটারের দায়িত্ব নিতেন, সেটা এখন চলে না।”
তিনি বলেন, “উনি (জসীম উদ্দিন) কখনও বিএনপি করেননি। মার্কা পাওয়ার পর থেকে বিএনপি। আমি দীর্ঘদিন ধরে ধানের শীষের জন্য কাজ করেছি। পদ পদবিধারী নেতা ছাড়া যারা আসল ভোটার, তারা সবাই আমার সাথে আছে। আমি সুখে-দুঃখে তাদের পাশে সবসময় ছিলাম।
“আমাদের কোনো ভোট কাটাকাটি হবে না। আমার পক্ষে সবার সমর্থন থাকবে।”
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ছিলেন শফিকুল ইসলাম রাহী। তিনি মনে করেন, তিনি জয়ী হলে দল তাকে আবার কাছে টেনে নেবে।
“অতীতে দেখেছি, বহিষ্কার করা হলেও পরবর্তীতে আবার কাছে টেনে নিয়েছে। সুফিয়ান ভাই ও এনাম ভাইকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল; কিন্তু আবার দল টেনে নিয়েছে।”
৫ অগাস্টের পর চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার কাণ্ডে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনামকে বহিষ্কার করা হয়েছিল দল থেকে।
তবে বন্দরনগরীর সবচেয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবু সুফিয়ানকে এবং চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে এনামুল হক এনামকে প্রার্থী করেছে বিএনপি।
এদিকে বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি এমএ হাশেম রাজু মনে করেন, ‘স্রোতের বিপরীতে’ গিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারে না। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও সেটা কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষ ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আবার এলডিপি সভাপতি কর্নেল অলি আহামদের সাম্প্রতিক সময়ের দ্বৈত অবস্থান—সব মিলিয়ে বিএনপি এ আসনে জয়ী হতে পারে।”
পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটও এবার বিএনপিতে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন জসীমের নির্বাচনি সমন্বয়ক রাজু।
তিনি বলেন, “জনসংযোগে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী জসীম উদ্দিন। সবাই তার পক্ষে থাকার কথা বলছেন।”
রাজু মনে করেন, ‘স্বাধীনতার পক্ষের’ ভোট তাদের পক্ষে থাকবে। তার ভাষায়, “এ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ভোটার চেতনার বাইরে গিয়ে অবস্থান নেবে, সেটা কল্পনা করা যায় না।”
এলডিপি সভাপতি অলি আহমদের সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল। ২০০৬ সালে তার অবস্থানটা মানুষ ভিন্নরূপে দেখছে। তিনি বলেছিলেন, জামায়াত-শিবির রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী… জীবনের ৫০ বছরের রাজনীতিতে জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন।
“বিএনপি-জামায়াত জোট গঠন নিয়ে তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। তার কারণে জোট ভেঙে গিয়েছিল। এখন যদি তিনি এসে বলেন, জামায়াত-শিবির স্বাধীনতাবিরোধী না, তারাও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি—সেগুলোতো মানুষের সাথে প্রতারণা।
“এতদিন তিনি জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে বলে এখন পক্ষে বলছেন; এটাতো সাধারণ জনগণের কাছে এফেক্ট হয়। এটা নির্বাচনে আমাদের জন্য সুবিধা হতে পারে।”
এদিকে অলি আহমেদের ‘জনপ্রিয়তা’ এ আসনে তার ছেলেকে অনেকটা এগিয়ে রাখছেন বলে মনে করেন তার অনুসারীরা।
এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকের প্রধান নির্বাচনি সমন্বয়ক ইয়াকুব বলেন, অলি আহমদের মত তার ছেলেও এ আসনে জিতবেন বলে তারা ‘শতভাগ আশাবাদী’।
“এ আসনে অলি আহমেদ এখনও সক্রিয়। তিনি সব সামাজিক কাজে থাকেন। তার বিষয়টিও ওমর ফারুকের জয়ের বিষয়ে প্রভাব ফেলবে। উনার (অলি আহামদ) প্রতিনিধি হয়ে উনার ছেলে এলাকাবাসীর সেবা করবেন, সেজন্যই তাকে তুলছে।”
ইয়াকুব বলেন, নির্বাচনে মানুষ সবসময় যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়।
“না হলে মানুষ অলি সাহেবকে ছয় বার বেছে নিত না। ২০০৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত জোটের বাইরে গিয়ে এলডিপি এককভাবে নির্বাচিত হয়েছিলে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।”