ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতির মাঠ। দলগুলোর নেতাদের কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি বাড়ছে সহিংসতাও। এবারের নির্বাচনের শুরু থেকেই যে আসনগুলো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি ঝিনাইদহ-৪। চারবার দলীয় এমপি থাকায় এটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এবার শক্ত বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে অনেকটা ব্যাকফুটে রয়েছে দলীয় প্রার্থী।
এ পরিস্থিতিতে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হতে পারে বলে মনে করছে দলটি। সে মোতাবেক জনসংযোগও করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের একটি নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংকও রয়েছে। সবমিলিয়ে এ সংসদীয় আসনে এবারের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মাঠ।
কালীগঞ্জ উপজেলা ও ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ভোটারদের আগ্রহ, তরুণ ভোটের প্রভাব এবং একাধিক শক্তিশালী প্রার্থীর উপস্থিতি নির্বাচনী সমীকরণকে করেছে বেশ জটিল। শুরুতে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখন জয়ের পাল্লা কাদের দিকে ভারী, তা কেউই বলতে পারছেন না।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ আসনে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি জয়লাভ করেছে চারবার, আর আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে একবার। ফলে এটি বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এখনো এ আসনে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৬৫ লাখ ২০১ এবং পুরুষ ভোটার: ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৫ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ৫ জন রয়েছেন। এবার নতুন ভোটার হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৪১ জন।
এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৮৯৬ জন। সেখানে বর্তমানে তরুণ ভোটারের সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ০৬ হাজার ৫৬৫ জনে, যা মোট ভোটারের ৩১.৯৬ শতাংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তরুণ ভোটাররাই এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
প্রার্থীদের মাঠের চিত্র
এবার ঝিনাইদহ-৪ আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন (ধানের শীষ), মাওলানা আবু তালেব (দাঁড়িপাল্লা-জামায়াত),স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (কাপ-পিরিচ-বিএনপি বিদ্রোহী), আব্দুল জলিল (হাতপাখা, ইসলামী আন্দোলন), খনিয়া খানম (উদীয়মান সূর্য-গণফোরাম) এবং এমদাদুল ইসলাম বাচ্চু (লাঙ্গল-জাতীয় পার্টি)
রাজনৈতিক ইতিহাস
অতীতের নির্বাচনের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ আসনে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি জয়লাভ করেছে চারবার, আর আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে একবার। ফলে এটি বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এখনো এ আসনে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
প্রার্থীভিত্তিক বিশ্লেষণ
রাশেদ খাঁন (ধানের শীষ)
রাশেদ খাঁন আগে ঝিনাইদহ-২ আসনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা চালালেও নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে নামেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় সমর্থন পেলেও, স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে, ‘তিনি বাইরের প্রার্থী, কেন তাকে ভোট দেব?’ এ কারণে শক্ত সাংগঠনিক সমর্থন থাকলেও তার অবস্থানকে এখনো পুরোপুরি নিরাপদ বলছেন না কেউ।
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্দিষ্টভাবে আমাকে ধানের শীষ প্রতীক প্রদান করেছেন। এই প্রতীক জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আমি বিশ্বাস করি, সবাই ধানের শীষে ভোট দেবেন। ইনশাআল্লাহ, জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থনে আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই আসন থেকে বিজয়ী হতে পারব।’
মাওলানা আবু তালেব (দাঁড়িপাল্লা)
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনপ্রিয়তার দিক থেকে মাওলানা আবু তালেবকেও এগিয়ে রাখা হচ্ছে। বিএনপির মূল প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিভাজনের সুযোগে তিনি মাঠে উল্লেখযোগ্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ধর্মীয় ভোট ব্যাংক ও সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে তার প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত ও কার্যকর বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আবু তালেব বলেন, ‘জুলুমের অবসান আমরা চাই। আমরা এ দেশে বহু শাসক দেখেছি, কিন্তু প্রকৃত খাদেম দেখিনি। জনগণ এমন একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি চান, যিনি শাসক নন—খাদেম হবেন। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমেই মানুষ তাদের রায় দেবে। তারা আর চাঁদাবাজি ও জুলুম দেখতে চায় না। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই জনগণ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করবেন।’
সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (কাপ-পিরিচ)
তৃণমূল থেকে উঠে আসা বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলসহ কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও স্থানীয়ভাবে তার জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে ভোটারদের একাংশ তাকে ভালোবেসে সমর্থন দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে ধারণা, ঝিনাইদহ-৪ আসনে মূলত দাঁড়িপাল্লা ও কাপ-পিরিচের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, ‘এই এলাকার মানুষ আমাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসার শক্তিতেই আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমেই ঝিনাইদহ-৪ আসনের মানুষ প্রমাণ করবেন, কে ছিলেন প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী। জনগণের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই বলছি, আমি আমার বিজয় সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত।’
সার্বিক চিত্র
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, ঝিনাইদহ-৪ আসনের নির্বাচন এবার বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। তরুণ ভোটার, প্রার্থী বিভাজন, স্থানীয় বনাম বহিরাগত ইস্যু এবং দলীয় বিদ্রোহ—সবকিছু মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। অন্তত তিনজন প্রার্থী এবার নির্বাচনের মাঠে সমানতালে লড়ছেন বলে জানিয়েছেন তারা।