কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বাতিলের প্রেক্ষাপটে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ঋণ খেলাপি ইস্যুতে ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন তার পুত্রবধু বুবলি ফারজানা। রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব তথ্য তুলে ধরেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, কিছু ‘রুপি অমানুষ’ না বুঝে ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর শিক্ষা, রাজনৈতিক অর্জন, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী একজন প্রকৌশলী এবং অত্যন্ত মেধাবীদের জন্য পরিচিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার আসন থেকে চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন, যা দেবিদ্বারের কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যে এর আগে জোটেনি এবং ভবিষ্যতেও হবে কি না তা সন্দেহজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুত্রবধুর ভাষ্য অনুযায়ী, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী দেবিদ্বারের উন্নয়নের রূপকার। তাঁর আগে ও পরে অনেকেই সংসদ সদস্য হলেও তাঁর মতো ব্যাপক উন্নয়ন কেউ করেননি—এটি দল-মত নির্বিশেষে সবাই স্বীকার করে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি রাজনীতিতে আসার আগেই একজন বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
স্ট্যাটাসে বলা হয়, ১৯৯১ সালে তিনি বিশ্ববরেণ্য জাতীয় নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে পরাজিত করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি আলহাজ জুবেদা খাতুন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেবিদ্বারে এর আগে কেউ করেননি।
তিনি শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, শিক্ষাব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন এনেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। নারী শিক্ষা বিস্তারে তিনি দেবিদ্বার আজগর আলী মুন্সি বালিকা বিদ্যালয়, জাফরগঞ্জ মাজেদা আহসান মুন্সি বালিকা বিদ্যালয়, বিহার মণ্ডল শহীদ জিয়া বালিকা বিদ্যালয় এবং সর্বশেষ বড়শালঘর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি তিনি রাজা মেহের ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
স্ট্যাটাসে আরও বলা হয়, তার সার্বিক সহযোগিতা ও গ্রামবাসীর সহায়তায় মোগসাইর উচ্চ বিদ্যালয়, মহেশপুর উচ্চ বিদ্যালয়, প্রজাপতি ডিএল উচ্চ বিদ্যালয়, নুরপুর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বারুর, ভানি, সাইতলা ও বুড়িরপার এলাকায় মোট ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি ডিও লেটারে এমপিওভুক্ত করে আনা হয়। নদীর দুই পাড়ের বিভক্তি দূর করতে তিনি গোমতী নদীর ওপর একসঙ্গে তিনটি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করেন, যা সে সময় বাংলাদেশের কোনো থানায় ছিল না।
এ ছাড়া শিশুদের মানসিক বিকাশে দেবিদ্বারে একটি শিশু পার্ক, শিক্ষানুরাগীদের জন্য পৌর পাঠাগার এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৌন্দর্যমণ্ডিত সাতগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মাণ করেন মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ ও ফোয়ারা। তাঁর সময়ে শত শত ব্রিজ-কালভার্ট ও রাস্তা নির্মিত হয়, যা এখনো টেকসই রয়েছে বলে দাবি করা হয়। পথচারীদের বিশ্রামের জন্য সরকারি হাসপাতালের মসজিদের পেছনে হাইওয়ে রোডসংলগ্ন একটি পার্ক নির্মাণ করা হলেও ১৭ বছরে সেটি বিলীন হয়ে গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
পুত্রবধু বুবলি আরও লেখেন, তিনি বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও ভবন নির্মাণ করেছেন, দেবিদ্বার সরকারি হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছেন এবং দেবিদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজে মেয়েদের আবাসনের জন্য ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করেন।
দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী কখনো দুর্নীতি করেননি। শেখ হাসিনার আমলে দুর্নীতি মামলায় তাঁকে কারাভোগ করতে হলেও কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তিনি সব মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান। এমপি থাকা অবস্থায় কোনো ঠিকাদার দুর্নীতি করতে পারেননি বলেই রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট এখনো মজবুত রয়েছে বলেও দাবি করা হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধে তিনি ছিলেন অটল।
স্ট্যাটাসের শেষভাগে নতুন প্রজন্ম, জুলাই-আগস্টের পর রাজনীতিতে আসা ব্যক্তি ও তথাকথিত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ উদ্দেশে ঋণ খেলাপি ও ব্যাংক লুটের অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হওয়ার আগেই তিনি শিল্পপতি ছিলেন এবং দলকে অনুদান দিতেন। বাংলাদেশের সব শিল্পপতিই ব্যাংক ঋণ নেন বলে উল্লেখ করা হয়। ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের সময় তাঁর সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সম্পদ লুট করা হয়, শুধু ব্যাংকের ঋণগুলো রয়ে যায়।
বিনা অপরাধে তাঁকে সপরিবারে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তিনি তিন বছর কারাভোগ করেন বলেও স্ট্যাটাসে দাবি করা হয়। কারামুক্তির পর তিনি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বনানীর বাড়ি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেন, তবে ব্যাংকের চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে সংকটে পড়েন। চারবারের সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতির কারণে তিনি সম্পদ হারিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
পুত্রবধুর ভাষ্যে, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এক কথার মানুষ, তাঁর ভেতর ও বাহির এক। তিনি অন্যায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন এবং গোপনে কোনো পদক্ষেপ নিতেন না। তিনি হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পালাননি বলেও দাবি করা হয়। হাইকোর্ট থেকে ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ থাকায় হলফনামায় ঋণ উল্লেখ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা কেবল বোঝার ভুল ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একটি বোঝার ভুল ও মিসগাইড করার কারণেই আজ তিনি প্রতিপক্ষের ক্ষমতা, কৌশল ও অনৈতিকতার কাছে পরাজিত হয়েছেন বলে স্ট্যাটাসে দাবি করা হয়। শেষাংশে বলা হয়, ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী সবসময় দেবিদ্বারবাসীর সঙ্গে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।