ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা জেলার পাঁচটি আসনে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরোধের কারণে অনেকটাই নির্ভার রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর দলটির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে একাধিক আসনে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনও হয়। শেষ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরোধ এখনও মেটেনি। যা জামায়াতের প্রার্থীদের এগিয়ে রেখেছে। বিগত কয়েক দশক আওয়ামী লীগ ও বিএনপির লড়াইয়ের চিরচেনা চেহারা বদলে এবার নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে মাঠের বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেফতার এবং মামলার কারণে তারা নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে সংশয় ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। যা কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। এ সুযোগে সুসংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে বিএনপিকে টেক্কা দিতে চায় জামায়াতে ইসলামী। পাঁচটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থীরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলাতে ব্যস্ত।
পাবনা-১ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান
পাবনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সংগঠিতভাবে প্রচারণার মাধ্যমে ইতিমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। আসনটি জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী এখানে জয়ী হয়েছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থাকায় তাদের ভোটব্যাংক অভিভাবকহীন। বিএনপির প্রার্থী মো. শামসুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনি লড়াইয়ে থাকলেও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের অসহযোগিতা তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। জামায়াতের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। যা বিএনপির প্রার্থীকে ভাবিয়ে তুলেছে। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আরও লড়ছেন ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল গণি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।
এই আসনের ভোটাররা বলছেন, এবার ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। কারণ ভোটারদের একটি অংশ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক। তারা ভোটকেন্দ্রে নাও যেতে পারেন। তবে এখানে ভোটের মূল লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। যদিও বিএনপির শামসুর রহমান ও জামায়াতের নাজিবুর রহমান দুজনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
পাবনা-২ আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস
পাবনা-২ আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির একেএম সেলিম রেজা হাবিব এবং জামায়াতের মো. হেসাব উদ্দিনের মধ্যে। সুজানগর ও বেড়ার এই জনপদে আওয়ামী লীগের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী থাকলেও তারা এখন মাঠছাড়া। বিএনপির প্রার্থী সেলিম রেজার দলীয় ভিত্তি শক্ত হলেও জামায়াত প্রার্থী হেসাব উদ্দিনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও কর্মীদের সুশৃঙ্খল প্রচারণার কারণে এগিয়ে রয়েছেন। এখানে জাতীয় পার্টির মো. মেহেদী হাসান রুবেল এবং গণফোরামের সেখ নাছির উদ্দিনও মাঠে রয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন্দ্রে না আসলে বা তারা যদি নীরবে জামায়াতকে সমর্থন দেন ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে। মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, জামায়াতের নেতাকর্মীরা ভোটারদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করছেন। যা বিএনপির চেয়ে তাদের এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।
পাবনা-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহীতে নির্ভার জামায়াত
চলনবিল অধ্যুষিত পাবনা-৩ আসনটি বর্তমানে জেলার সবচেয়ে আলোচিত ও জটিল আসন। এখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম রূপ নিয়েছে। বিএনপির প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনকে বহিরাগত আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করে রেখেছেন দলের নেতাকর্মীরা। একাধিকবার তাদের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন দলীয় প্রার্থী। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কেএম আনোয়ারুল ইসলাম মাঠে থাকায় ধানের শীষের ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হবে। এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আছগার। তিনি নীরবে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বৈঠক করে নিজের অবস্থান মজবুত করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কারাগার ও এলাকা ছাড়া থাকায় তাদের সমর্থকরা কোনও প্রার্থীর প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। এর ফলে জামায়াতের সুসংগঠিত একক ভোটব্যাংক এখানে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদের মো. হাসানুল ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের মো. আব্দুল খালেক নিজস্ব বলয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে বিএনপির বিদ্রোহী থাকায় নির্ভার জামায়াত।
পাবনা-৪ আসনে হবে বিএনপি-জামায়াতের লড়াই
পাবনা-৪ আসনে জামায়াতের মো. আবু তালেব মন্ডল এবং বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিবের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ঐতিহাসিকভাবে এটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে দলটির কোনও কার্যক্রম নেই প্রকাশ্যে। জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মন্ডল স্থানীয় রেলওয়ে শ্রমিক ও কৃষিভিত্তিক জনপদে ব্যাপক গণসংযোগ করছেন।
অপরদিকে হাবিবুর রহমান হাবিব তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ভর করে মাঠ গোছানোর চেষ্টা করছেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জাকারিয়া পিন্টু এবং নাগরিক ঐক্যের শাহনাজ হকের উপস্থিতি ভোটের সমীকরণ জটিল করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় এবং ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক নিরসন না হলে ভোটের হার অনেক কমবে। যা জামায়াতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাবনা-৫ আসনেও বিএনপির সঙ্গে লড়াইয়ে জামায়াত
পাবনা সদর আসনে জামায়াতের মো. ইকবাল হোসাইন এবং বিএনপির শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অতীতে জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুস সোবহান এখান থেকে একাধিকবার এমপি হওয়ায় দলটির বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেফতারের পর সদর এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থকরা পুরোপুরি আড়ালে রয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী শিমুল বিশ্বাস দলের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার কৌশল তাকে চাপে ফেলেছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের নাজমুল হোসাইন এবং এবি পার্টির মো. আব্দুল মজীদ মোল্লা নির্দিষ্ট কিছু ভোট টানতে পারেন।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর চলমান প্রশাসনিক কঠোরতা সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি করেছে। যা কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে জামায়াতেরও লড়াই হবে।