Image description
নেপথ্যে চার কারণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে প্রচারণা জমে উঠলেও ছোট-বড় বেশ কয়েকটি দলের হেভিওয়েট নেতা এবার প্রার্থী হননি। তবে সবার ভোটযুদ্ধে না থাকার কারণ এক নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত চারটি কারণে এসব প্রার্থী নির্বাচন থেকে দূরে আছেন। প্রথমত, বার্ধক্যজনিত কারণে অনেকে নির্বাচন করার ঝুঁকি নেননি। তাদের বদলে উত্তরাধিকার হিসাবে প্রার্থী হয়েছেন স্ত্রী বা সন্তান। দ্বিতীয়ত, অনেকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোণঠাসা অবস্থায় থাকার কারণে নির্বাচন থেকে দূরে আছেন। এছাড়া কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকার কারণে। আবার দু-একজনের অভিযোগ, দেশে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সব মিলিয়ে বেশ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতা এবার ভোটে অংশ নেননি।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বড় নেতা ছিলেন ড. কামাল হোসেন। বার্ধক্যজনিত কারণে এবারের নির্বাচনে অংশ নেননি তিনি। তার নেতৃত্বাধীন দল গণফোরামের ১৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও দলটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী নির্বাচনে নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী ছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। এছাড়া সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। এই তিনজনের কেউই এবার ভোটের মাঠে নেই। গণ-অভ্যুত্থানের পর একাধিক হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন ইনু ও মেনন। অন্যদিকে লোকচক্ষুর আড়ালে দিলীপ বড়ুয়া। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের শরিক দল হওয়ায় এই দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রমও স্তিমিত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই বিবৃতি ও বক্তৃতায় মাঠ কাঁপাতেন বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছাড়া বিগত প্রায় সবক’টি নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার মাঠে নেই তিনি। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে প্রার্থী হয়েছেন তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার এবার নির্বাচনে নেই। পঞ্চগড়-১ আসন থেকে অতীতে একাধিকবার জয়ী হয়ে মন্ত্রী ও সংসদের স্পিকার হয়েছেন তিনি। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেননি। তার উত্তারাধিকার হিসাবে ২০১৮ সালে এবং এবারও ওই আসন থেকে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন রওশন এরশাদ। শেখ হাসিনার আমলে জিএম কাদেরের সঙ্গে বিরোধ ও জাতীয় পার্টির ভিন্ন একটা অংশের নেতা হওয়ার পর কিছুদিন তৎপর থাকলেও এখন তিনি রাজনীতিতে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। তাছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো অবস্থাও তার নেই। জাতীয় পার্টিতে তার সমর্থিত অংশেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন আর দৃশ্যমান নয়। তাছাড়া ৫ আগস্টের পর জিএম কাদেরের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে এ অংশের নেতারা পৃথক একটি অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেও তেমন সফল হতে পারেনি। এ অংশের নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারসহ হেভিওয়েট বেশ কয়েকজন নেতা এবার নির্বাচনে নেই। এর মধ্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চট্টগ্রাম-৫ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এছাড়া রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসন এবং কাজী ফিরোজ রশীদ ঢাকা-১০ ও গোপালগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আসম আবদুর রব ২০ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ছিলেন। তিনি সব সময় রাজনীতিতে কঠোর অবস্থানে থেকে বক্তব্য দিয়েছেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিলেও এবার শারীরিক অসুস্থতার কারণে অংশ নেননি তিনি। তবে তার সহধর্মিণী তানিয়া রব লক্ষ্মীপুরের ওই আসনটি থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

জেএসডি সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন যুগান্তরকে জানান, তাদের দলের সভাপতি ২ বছর ধরে অসুস্থ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তবে তার আসনে দলের সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব নির্বাচন করছেন। জেএসডির ২৮ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বলেও জানান তিনি।

বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। ১৯৯১ সালে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের আরও দুই সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান এবার নির্বাচনে নেই। তবে তারা দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন।

বার্ধক্যজনিত কারণে এবার নির্বাচন করছেন না জামায়াতের নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম। এ ছাড়া পাঁচজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবার নির্বাচন করছেন না।

আসন্ন নির্বাচনে মাঠে রয়েছে ধর্মভিত্তিক দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ২৬৮টি আসনে দলটির প্রার্থীরা ভোটের মাঠে এখন সক্রিয়। তবে দলটির আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম নির্বাচনে অংশ নেননি। দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্বাচনেই ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম অংশ নেননি। তার পিতা প্রয়াত মাওলানা ফজলুল করীমও কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। তবে চরমোনাই পীরের ভাই দলের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণার সুবিধার জন্যই সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করিম এবার সারা দেশ সফর করছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটে নেই জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। পিরোজপুর-২ আসন থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা ৭ বারের এমপি ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সরকারের আমলে ছিলেন মন্ত্রীও। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান মঞ্জু। এবার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণ হিসাবে তার দলের নেতারা বলছেন, বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ভোটযুদ্ধে নামেননি।

এবারের নির্বাচনে অংশ নেননি আরেক হেভিওয়েট নেতা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা এই সভাপতি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ অভিযোগ করে নির্বাচনে যাননি। সাবেক এই সংসদ-সদস্য সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সুযোগ না পেলে তিনিও ভোটে থাকবেন না।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি বিএনপি থেকে তাকে আসন ছাড়ের সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তের নানা হিসাব-নিকাশ ও বার্ধক্যজনিত কারণে ভোটযুদ্ধে জড়াননি তিনি। বর্তমানে রাজধানীর একটি হাসপাতালে শয্যাশায়ী মোস্তফা জামাল হায়দার।

সম্প্রতি কথা হলে যুগান্তরকে তিনি বলেন, এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ সময়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, এখন শয্যাশায়ী।

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী, সমমনা এবং সহযোগী সংগঠনের সব কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে সরকার। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে দলটির কেউই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও নেই এবারের নির্বাচনে। দলগুলোর শীর্ষ একাধিক নেতা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকিরা রয়েছেন আত্মগোপনে।