বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সবাইকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলা হলেও শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
প্রাথমিক স্তর থেকেই বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষার মানের অবনমন, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন; মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির মতো বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি করছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার মানে গুরুতর অবনমনে তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি নিয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতাহার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত না হলেও অনেক রাজনৈতিক দল এরই মধ্যে শিক্ষা খাত নিয়ে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা খাত নিয়ে বর্তমানে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে তাতে নতুনত্ব কম এবং সেখানে অনেক মৌলিক বিষয় উপেক্ষিত। তবে দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করলে শিক্ষা খাত নিয়ে আরো বিশদভাবে তাদের পরিকল্পনা জানা যাবে। দেড় দশকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী শাসনে শিক্ষা খাত যে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে তা থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তরিকতা ও অভিনব যুগোপযোগী পরিকল্পনার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সবাইকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলা হলেও শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে, যা আদালতে প্রতিকারযোগ্য নয়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, সবার জন্য একই ধরনের শিক্ষা নিশ্চিতে এটি একটি বড় বাধা।
সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় সংস্কার, গুণগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে গঠিত নয় সদস্যের পরামর্শক কমিটিতেও তিনি সভাপতি ছিলেন। অধ্যাপক মনজুর আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের শিক্ষা খাতে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যা হলো রাষ্ট্র শিক্ষার দায় স্পষ্টভাবে গ্রহণ করেনি। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন আছে, যেখানে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়, শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে, সেক্ষেত্রে কী দায় নেবে তা আইনে স্পষ্ট নয়। সংবিধানেও শিক্ষা অধিকার হিসেবে ঘোষিত নয়; কেবল মূলনীতি হিসেবে আছে, যা আদালতে প্রতিকারযোগ্য নয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো এখন পর্যন্ত যেসব প্রুতিশ্রুতি দিয়েছে সেখানে এ বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি সংবিধান সংশোধনে জুলাই সনদে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেখানেও শিক্ষা-সম্পর্কিত কোনো কিছু উল্লেখ নেই।’
বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ধারা দেখা যায় প্রাথমিক স্তরে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে মোট ১১ ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের কারিকুলাম, পঠন পদ্ধতি, সুযোগ-সুবিধা ও ব্যয়ে রয়েছে বড় পার্থক্য। শিক্ষাবিদদের মতে, এ পার্থক্যের কারণে শৈশব থেকেই শিশুরা একধরনের বৈষম্যের শিকার হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্র মেরামতে তাদের ৩১ দফায় একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে উল্লেখ করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন বাংলাদেশ গড়ার ২৪ দফা ইশতাহারে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করলেও দলটির শিক্ষা সম্পাদক জানিয়েছেন, তারা সব ধারায় নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিষয় যুক্ত করাসহ শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতে কাজ করবেন। নতুন বাংলাদেশ গড়তে ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পলিসি সামিটে ঘোষিত পরিকল্পনায় প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে আলাদা করে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
বিএনপির সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে শিক্ষাকে। আমরা সরকার গঠন করলে সব ধারার শিক্ষার মধ্যে সমতা নিশ্চিত করব। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোয় যাতে সব ধারার শিক্ষার্থীদেরই দক্ষতা থাকে, উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র সর্বত্র সব ধারার শিক্ষার্থীরা যাতে সমান সুযোগ পায় সেটি আমরা নিশ্চিত করব। এখন কোনো কোনো ধারার শিক্ষার্থীরা উপেক্ষিত হয়। এ ধরনের বৈষম্যের আমরা অবসান করব।’
জাতিসংঘের যে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র সর্বসম্মতভাবে ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এসডিজির লক্ষ্য-৪-এর অন্তর্ভুক্ত প্রথম সাব-কম্পোনেন্ট ৪.১-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সব ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এবং পৃথিবীতে অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশ। বর্তমানে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী এবং মাধ্যমিক স্তরে ৯২ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। বিশেষত মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থীই দশম শ্রেণী সম্পন্ন করতে পারে না। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, এ স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ উচ্চব্যয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতাহারে পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিতের কথা উল্লেখ করেছিল। তবে দেড় যুগ ক্ষমতায় থাকলেও তারা এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
এ সমস্যা সমাধানে বিএনপির ৩১ দফা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিটে সুস্পষ্ট কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আর এনসিপি তাদের ২৪ দফায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ করা হবে বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০০৮ সালে তাদের ইশতাহারে এইচএসসি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার কথা উল্লেখ করেছিল।
দেশের শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ অপর্যাপ্ত বাজেট। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ২ শতাংশেরও কম। বিএনপি তাদের ৩১ দফায় জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এ বিষয়ে এখনো কিছু উল্লেখ করেনি।
শিক্ষা খাতের বাজেট বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের বাজেটে ঘাটতি রয়েছে, কোনো খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হলে সেই অর্থের জোগান কীভাবে হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। আবার শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয়ের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। যেমন এখনো শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার বড় অংশই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এছাড়া অনেক সময় যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে বরাদ্দকৃত অর্থ মন্ত্রণালয়গুলো ব্যয় করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষায় যে বরাদ্দই দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিক না কেন সে অর্থ কীভাবে জোগান হবে, কোন পদ্ধতিতে অর্থ ব্যয় হবে, কীভাবে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে সে বিষয়গুলোও সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হবে।’
দেশের শিক্ষা খাতের অন্যতম সমস্যা শিক্ষার ক্রমশ নিম্নগামী মান ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলো তুলনা করে দেখা গেছে শ্রেণী অনুযায়ী দক্ষতা ক্রমান্বয়ে কমছে। এছাড়া এক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক মানের বিপরীতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিরূপণে কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানের একটি চিত্র উঠে এসেছিল বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের প্রতিবেদনে। এ ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান। এদিকে দেশের শিক্ষার সব স্তরেই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা, জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিটের ঘোষিত পয়েন্ট এবং এনসিপির ২৪ দফায় এ সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন। এছাড়া কোনো শিক্ষানীতিই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেনি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। নতুন এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, অবকাঠামো, গবেষণাগার ও গবেষণা যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে শিক্ষার মান নিয়েও। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৬ ও কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬-এ সেরা ৫০০-এর তালিকায়ও দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার ঘাটতি উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫-এ উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে চাকরিদাতারা কর্মী নিয়োগে গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে যে ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করেন সে রকম মানবসম্পদ তৈরিতে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে শিক্ষা আনন্দময় হয়, আমরা বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষাও শেখাব যাতে আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রবেশের সুযোগ আরো বাড়ে। এছাড়া আমরা বেকারত্ব হ্রাসে কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেব।’
জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষার সংকট বাড়িয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের একাংশ। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একীভূতকরণের মাধ্যমে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত বৈষম্যহীন টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণবিষয়ক টাস্কফোর্স। সীমিত শিক্ষা বাজেটের সঠিক ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান নিশ্চিতে এ কৌশল নেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন টাস্কফোর্সের সদস্যরা।
উচ্চশিক্ষা বিষয়ে বিএনপি তাদের ৩১ দফায় উল্লেখ করেছে, এক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হবে। এছাড়া গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ইশতেহারে বিএনপি জ্ঞানভিত্তিক উচ্চ শিক্ষা এবং গবেষণায় গুরুত্বারোপের বিষয়ে বলেছিল। এনসিপি তাদের ২৪ দফায় উল্লেখ করেছে বিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল ও চিকিৎসাশিক্ষায় শক্ত ভিত তৈরিতে তাদের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা থাকবে। এছাড়া সব নাগরিকের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মমুখী, বৃত্তিমূলক, নার্সিং শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক মানের, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। জামায়াতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ বাড়ানোর কথা বলেছে। দলটি তাদের পলিসি সামিটে ৩১ দফার মধ্যে ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কথা বলেছে। ২০০৮ সালের ইশতাহারেও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল।
শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এ বিষয়ে বিএনপি তাদের ৩১ দফা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের পলিসি সামিটে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি। আর এনসিপি তাদের ২৪ দফার দশম দফায় বলেছে, শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রেখে পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকার ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতাহারে এ রকম প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি।
উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ক্ষেত্রে বিএনপি তাদের ৩১ দফায় বলেছে, এক বছরব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত, যেটাই আগে হবে, শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা দেয়া হবে। এছাড়া বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে নানামুখী বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। যুবসমাজের দক্ষতা বাড়িয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ আদায়ের লক্ষ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেয়া হবে। আর জামায়াতে ইসলামী তাদের পলিসি সামিটে উল্লেখ করেছে, গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে পাঁচ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) দেয়া হবে। এছাড়া মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ দেয়া হবে। পাশাপশি দলটি প্রতি বছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ দেয়ার কথা উল্লেখ করেছে। এর আগে ২০১৮ সালের ইশতাহারে বিএনপি উচ্চশিক্ষার জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে বৃত্তি প্রদানের জন্য তহবিল গঠন এবং বেকার ভাতার কথা উল্লেখ করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে আর্থিক অসুবিধায় পড়া শিক্ষার্থীদের কীভাবে স্টুডেন্ট লোন দেয়া যায়, সে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বিএনপি।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির শিক্ষা ও গবেষণা সেলের সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে জয়ী হলে শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেব। সব ধারার শিক্ষার মধ্যে একটি সমতা নিশ্চিত করা, অর্থাৎ সব ধারার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সব ধারায় কিছু মৌলিক বিষয় পড়ানো বাধ্যতামূলক করা এবং ধারাগুলোর মধ্যে বৈষম্য যথাসম্ভব কমিয়ে আনা, বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি বৈশ্বিক কর্মবাজারে সুযোগ নিশ্চিতের জন্য আরো এক বা একাধিক ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া আমরা কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিতে চাই। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো এবং শিক্ষক নিয়োগকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে একটি সমন্বিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চাই। যদি আমরা নির্বাচনে জয়ী নাও হই তা হলেও আমরা যে দল জয়ী হবে তাদের সঙ্গে এসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করব। আমরা চাই শিক্ষানীতি কোনো একটি দলের চিন্তার ভিত্তিতে নয়; বরং সবার অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে হোক। অন্যথায় বারাবার কারিকুলাম পরিবর্তনসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়। এ বিষয়ে আমরা ইশতাহারে বিস্তারিত উল্লেখ করব।’ তিনি আরো জানান, বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে।
শিক্ষা খাতে পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে পলিসি সামিটে কিছু বিষয় উল্লেখ করেছি। শিক্ষা নিয়ে আরো বিস্তারিত পরিকল্পনা ইশতাহারে উল্লেখ করা হবে।’