Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। দফায় দফায় আলোচনার পরও আসন সমঝোতার পরিবর্তে জোটে ‘জট’ তৈরি হয়েছে। টানাপোড়েন এক রকম চরমে গিয়ে পৌঁছেছে। জামায়াতের সঙ্গে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টির মধ্যে সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দলগুলো ‘সন্তোষজনক’ আসন না পাওয়ায় জোটে থাকা না থাকা নিয়েও অভ্যন্তরীণ আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, বৃহত্তর স্বার্থে জোট কিংবা আসন সমঝোতা ভেস্তে না যাওয়ার পক্ষেই ইতিবাচক আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে একে অন্যকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। যে কোনো মূল্যে দলগুলোর ঐক্য অটুট রাখতে চান তারা। তারা আরও বলেছেন, ইসলামপন্থার ‘এক বক্স’ নীতি বহাল রাখতে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। কারণ, এবারই সুযোগ এসেছে নতুনভাবে একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরি করার।

আসন সমঝোতার বিষয়ে গতকাল বুধবার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে (দ্বিতীয় তলা) এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে দুপুরে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার বিষয়টি জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় আসন সমঝোতার জোটের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাধিক দলের অনুরোধে সংবাদ সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সন্ধ্যায় ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোটে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)।

সর্বশেষ আলোচনা অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী নিজ দলীয় প্রার্থীদের জন্য ১৮০টির বেশি আসন রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে জোটভুক্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৫টি ও এনসিপির জন্য ২৫-৩০টি আসন সমঝোতার উদ্যোগ নেয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৫টি, এবি পার্টি ৩টি, বিডিপি দুটি এবং খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জাগপার জন্য একটি করে আসন বরাদ্দ রাখা হয় বলে জোটের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়।

তবে এই সমঝোতায় সন্তুষ্ট নয় চরমোনাই পীরের দল। দলটি শুরু থেকে শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। তবে আলোচনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে আসনের চাহিদা কমিয়েছে। সর্বশেষ তাদের দাবি ছিল ৫০টির বেশি আসন। তবে জামায়াত দলটিকে ৪৫টি আসন ছাড় দিতে চায়। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাই এটি মানতে নারাজ। দলটির অভ্যন্তরে এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক শেষেও আসেনি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। প্রথমে মঙ্গলবার মধ্যরাতে ইসলামী আন্দোলনের শূরা কাউন্সিলের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি দলটি। পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার দেওয়া হয় মজলিসে আমেলার (সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম) ওপর। তাতেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আলাপ-আলোচনার পর চূড়ান্ত সমঝোতা ও সিদ্ধান্ত আসবে। অবশ্য ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সমঝোতাও। তবে জোটের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী আন্দোলনের কয়েকটি আসন বাড়তে পারে। যদিও দলটির নেতারা জানান, তারা যে কোনো মূল্যে জোটের ঐক্য অটুট রাখতে চান।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা কালবেলাকে বলেন, এই জোট টিকিয়ে রাখতে আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিকতার কমতি নেই। তবে কিছু কিছু কারণে সন্দেহ, অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টিকে আসন সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে জামায়াত আলাদা করে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ৮ দলের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। এ ছাড়া জামায়াত বিএনপির সঙ্গেও ঐক্যবদ্ধ সরকারের কথাও বলে আসছে। আরও কিছু বিষয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ৫-১০টি আসন বড় কোনো বিষয় নয়। তবে আমরা চাই, যে কোনো মূল্যে এই সমঝোতা টিকিয়ে রাখতে। ইসলাম ও বৃহত্তর স্বার্থে এটা হওয়া উচিত। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বিষয়টি সুরাহা হয়ে যাবে বলে আশা করি।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি শিগগির আসন সমঝোতাসহ সব বিষয়ে জানাতে পারব।’

জোট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনের ‘সম্মানজনক’ সংখ্যক আসন দাবির বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় মূলত ঘোষণা করা যায়নি। এ ছাড়া আরও দু-একটি দল কয়েকটি আসন বেশি চায়। পাশাপাশি আট থেকে ১০টি আসন নিয়ে জটিলতা সবচেয়ে বেশি, যেখানে একাধিক দলের শীর্ষ ও জনপ্রিয় নেতারা একই আসনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। আসন সমঝোতায় যদি শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য না হয়, তবে কিছু আসনে ‘ওপেন ইলেকশন’ বা উন্মুক্ত নির্বাচন হতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে জোটভুক্ত দুই বা তিনটি দল সমপরিমাণ শক্তিশালী এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ, সেসব আসনে এ পথ বেছে নেওয়া হতে পারে।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেই নয়, আরও কয়েকটি দলের সঙ্গেও আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কিছু আসন উন্মুক্ত থাকতে পারে। বাকি আসনগুলোতে প্রার্থী চূড়ান্ত হলে চলতি সপ্তাহেই ঘোষণা আসবে।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, ‘১১ দলের আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমঝোতার সুনির্দিষ্ট একটি ‘রাজনৈতিক স্মারক’ নির্ধারণ করা দরকার ছিল, যা এখনো হয়নি। ইনফ্যাক্ট দলগুলোর একত্রে এখন পর্যন্ত কোনো মিটিংও হয়নি। আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থান, সমর্থন ও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতার পাশাপাশি সংসদে দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। সেক্ষেত্রেও দলগুলোর অসন্তোষ রয়ে গেছে। সম্ভবত, সেসব কারণে সংবাদ সম্মেলন ডেকেও তা স্থগিত করা হয়েছে।’

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব কালবেলাকে বলেন, ‘জোটের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় মীমাংসিত না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছে না। আশা করছি শিগগির ঘোষণা আসবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি এ সমঝোতায় থাকছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক হাসান জুনাইদ বলেন, ‘আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ (গতকাল) রাতে না হলেও কালকের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে সমঝোতার একটা পর্যায়ে চলে যাবে।’

গতকাল বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, আশা করা হয়েছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সেটি হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার বৈঠক করে দলের সব স্তরের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মাঠের তথ্য নেওয়া হয়েছে, প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আজ (গতকাল) মজলিসে আমেলার বৈঠক হয়েছিল। যাদের নিয়ে শুরু থেকে পথচলা, তাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন যোগাযোগ করছে। ‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামীর পথচলা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলমান আছে। দু-একদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে আতাউর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তারা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। এই আলোচনা নির্বাচনের পরেও হবে। জাতীয় সরকারের ব্যাপারেও তিনি কথা বলেছেন। জামায়াতের আমির বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। তবে সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য বলেছেন জামায়াতের আমির। এটা ইসলামী আন্দোলনের মাঝে একটু সংশয় তৈরি করেছে, জামায়াত জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে কি না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে বিভাজন বিএনপিকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়াটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কি আমাদের? তো ঐক্যের যে পাটাতনটা আমরা তৈরি করেছিলাম, সেটা রক্ষার জন্য আমরা চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। এককভাবে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে অনেকের সঙ্গে আলোচনা চলছে, কথাবার্তা হচ্ছে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও প্রজ্ঞা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই সতর্কবার্তা ও নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘অনেক ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে জাতি ও সংগঠন আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।’ বর্তমান সময়কে জাতীয় জীবনের জন্য একটি ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘এ সময়ে আবেগের বশবর্তী না হয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের প্রতি বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাজনৈতিক উত্তাপ বা জোটের টানাপোড়েনের মাঝেও যেন কেউ লক্ষ্যচ্যুত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

জামায়াতের আমির আশা প্রকাশ করেন, ‘প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মী বর্তমান পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে পূর্ণ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।’