Image description

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই একমত হলেও কাক্সিক্ষত আসনপ্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ায় চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে বিলম্ব হচ্ছে। লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিস দলীয় পরিম-লে এবং অন্তদলীয় পরিসরে বৈঠকের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। জোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত গতকালের সংবাদ সম্মেলন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে স্থগিত করলেও সব পক্ষই আশা করছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পূর্বে ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত সমঝোতা অনুষ্ঠিত হবে।

যে কোনো কিছু ঘটতে পারে ॥ এদিকে বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ২০ জানুয়ারি হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন হলো ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের আগ পর্যন্ত যে  কোনো কিছু ঘটতে পারে।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা এখনো ভেস্তে যায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনী আসন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা কাউকে বের করে দেওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ইসলামী আন্দোলন জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ন্যূনতম সমঝোতা যাতে থাকে সেই চেষ্টা আমরা করে যাব। আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু সংকট আছে জানিয়ে তিনি বলেন, কারও চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলনকে মেনে নিতে হবে, এই রাজনীতি তাঁদের দল অতীতেও করেনি। কেউ ইসলামী আন্দোলনকে অবহেলা করলে তা-ও তারা মেনে নিতে পারবেন না।

জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কি না, এমন প্রশ্নে গাজী আতাউর রহমান বলেন, এটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কি আমাদের? এটা এখানে যদি কেউ অ্যাডভান্টেজ পায়, সেটা পাইতে পারে। নতুন করে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপি তো ফিক্সড করে ফেলেছে, তাদের জোট এবং তাদের যে ডিজাইন, সেটা তো হয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাদের আলোচনা চলছে। আলোচনার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হবেন তারা।

এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি ॥ এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের নির্বাচনী আসন সমঝোতা নিয়ে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার বেলা সোয়া ২টার দিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজ ১৪ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টায় আন্দোলনরত ১১ দল ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে। ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে বলেন, এখনো কিছু প্রস্তুতি বাকি থাকায় সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের তারিখ জানানো হবে। এর আগে গণমাধ্যমে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদানের লক্ষ্যে বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।

ন্যায্যতার ভিত্তিতে আসন ॥ এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় সমঝোতাকেন্দ্রিক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার জরুরি এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে মজলিসে শূরা সদস্যবৃন্দ ১১ দলীয় সমঝোতাকেন্দ্রিক উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলেন, জাতির প্রত্যাশা পূরণে ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রাখতে হবে। ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রাখার স্বার্থে ন্যায্যতার ভিত্তিতে আসন সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন।

ইসলামী শক্তির মধ্যে ঐক্য খেলাফত মজলিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, এক আসনে একটি ইসলামী দলের প্রার্থী নিয়ে যে নির্বাচনী সমঝোতা বা ঙহব ইড়ী চড়ষরপু তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন খেলাফত মজলিস মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের। ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে ড. আহমদ আবদুল কাদের জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিতে গিয়ে উপরোক্ত প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন।

বৈঠকে জানানো হয়, সারাদেশে খেলাফত মজলিসের ৭৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ইতোমধ্যে ৭২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তার পরও ইসলাম, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্বার্থে চলমান ১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতার সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাবে খেলাফত মজলিস। তবে তা হবে ইনসাফ ও সম্মানজনক আসন সমঝোতার ভিত্তিতে। সম্ভাবনাময় ও বিজয়ী হয়ে আসার মত আসনসমূহে সম্মানজনক সমঝোতার দাবি রাখে খেলাফত মজলিস। প্রতিটি বিভাগে খেলাফত মজলিসের জন্য ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বের স্বার্থে আসন সমঝোতা ইনসাফের দাবি।

আলোচনায় ফেসবুক স্ট্যাটাস ॥ এদিকে বগুড়া-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নূর মোহাম্মদ আবু তাহেরের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস বুধবার দিনভর ছিল বেশ আলোচনায়। ভেরিফায়েড প্রোফাইলে তিনি লেখেন, ‘হ্যাঁ, সত্য এটাই, ১১ দলের সমঝোতা ভেঙে যাচ্ছে।’ তিনি আরও লেখেন, ইসলামি আন্দোলন গত রাতে তাদের মজলিসে শূরা এবং সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ডেকে মতামত নিয়েছে। সেখানে অধিকাংশ সদস্যই জোটের সমঝোতা থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘ইসলামী আন্দোলনকে সমঝোতায় চূড়ান্তভাবে ৪৫টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের দাবি এখন ৬৫-৭০ আসনের মতো। নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়েও স্পষ্ট ঘোষণা চায়। সরকার গঠিত হলে কে কোথায় থাকবে, এগুলো স্পষ্ট চায়। ইতোমধ্যে অনেক কিছু স্পষ্ট করা হয়েছে, যেগুলো আরও স্পষ্ট করা দরকার, সেগুলো নিয়ে আলাপ হতে পারে।

ধৈর্য ধরার আহ্বান ॥ এদিকে জোটের চলমান সংকটের মধ্যে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, বহু ত্যাগ এবং কোরবানির সিঁড়ি বেয়ে প্রিয় সংগঠন ও জাতি মহান আল্লাহ তায়ালার একান্ত মেহেরবানিতে এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সময়টা জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ সময়ে সকলকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কারও ব্যাপারেই কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জোটের কাছ থেকে তাদের ৬৫ আসনের দাবি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৪০টি আসন পেয়ে চরমোনাইর পীর সাহেবের দল মোটামুটি সন্তুষ্ট। বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক করে দলীয় প্রার্থীদের সামনে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন দেন্দ্রীয় নেতারা। অধিকাংশ নেতা জোট থেকে বেরিয়ে পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষ মত দিলেও শেষ পর্যন্ত তৃণমূল নেতা এবং প্রার্থীরা এ জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পীর সাহেবের ওপর ন্যস্ত করেছেন। যদিও ৪০টি সমঝোতার আসনের পাশাপাশি আরও অন্তত ৩০ আসন উনস্মুক্ত রাখার দাবি জানান তৃণমূল নেতারা। তবে জামায়াত এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে বলে জানা গেছে।

জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন সমঝোতা নিয়ে সব দলেই কম-বেশি অসন্তোষ থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা যার যার জায়গা থেকে ছাড় দিয়ে সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৫ থেকে ২৭টি। যদিও ইতোপূর্বে তারা জামায়াতের সঙ্গে ৩০ আসনে সমঝোতা করেছিল। প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পাচ্ছে ১৫টি আসন। খেলাফত মজলিস ৭টি, এলডিপি ৬টি, এবি পার্টি ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসন পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জাগপা পাচ্ছে একটি করে আসন। জামায়াতের হাতে থাকছে বাকি ১৯০টি আসন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে আটটি দল গত কয়েক মাসে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। এরপর সেই সমঝোতায় যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। সব মিলিয়ে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।