ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের বহুল আলোচিত আসন সমঝোতা শেষ মুহূর্তে এসে জটিল আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘ আলোচনা, একের পর এক বৈঠক এবং ইতিবাচক বার্তার পরও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) ও খেলাফত মজলিসকে ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—শেষ পর্যন্ত কি ১১ দলের জোট ভাঙনের মুখে পড়ছে?
১১ দলীয় জোট সূত্র জানায়, বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর বিকেল বা সন্ধ্যায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে সকাল থেকেই জোটভুক্ত বিভিন্ন দল তাদের নির্বাহী পরিষদ ও শুরা কাউন্সিলের বৈঠক করছে। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টায় ফেসবুকে জানান, বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ১১ দলের চূড়ান্ত আসন তালিকা ঘোষণা করা হবে।
তবে এই ঘোষণার আগেই জোটের ভেতরের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে চলে আসে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতের সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত জোটের ঐক্য বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার সকালে খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক আব্দুল হাফিজ খসরু আরটিএনএন’কে বলেন, দুপুরের ভেতর শূরা বৈঠকে জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো বলে আমরা আশা করছি। শূরা বৈঠকে আসন নিয়ে সমঝোতার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হবে তা আমরা জোটের বাকি শরিকদের জানিয়ে দেবো।
ইসলামী আন্দোলনের আপত্তি কোথায়
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আসন সমঝোতার শুরুতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিল। আলোচনার ধারাবাহিকতায় দলটি ধাপে ধাপে দাবি কমিয়ে সর্বশেষ ৫০টির বেশি আসনের প্রস্তাব দেয়। তবে জামায়াতে ইসলামী তাদের সর্বোচ্চ ৪০টি আসন ছাড় দিতে রাজি হওয়ায় দলটির ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়।
দলের একটি অংশ ৪০ থেকে ৪৫টি আসনে সমঝোতার পক্ষে থাকলেও বড় অংশ মনে করছে, কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে জোটে থাকার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। এই অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ইসলামী আন্দোলনের শুরা কাউন্সিলের বৈঠক শুরু হয়, যা মধ্যরাত পেরিয়েও চলতে থাকে। বৈঠক চলাকালে দলের শীর্ষ নেতারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তবে দলটির যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসুদ গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করে জানান, জামায়াতসহ ১১ দলের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অংশ নেবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের আমির পীর সাহেব চরমোনাই আজ বা আগামীকাল পৃথক সংবাদ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’ এই বক্তব্যকে জোট ছাড়ার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
খেলাফত মজলিসের অবস্থান
অন্যদিকে খেলাফত মজলিসও আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তুষ্ট। দলটি ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০টি আসনে ছাড় দিতে চায় বলে জানা গেছে। খেলাফত মজলিসের নেতারা জানিয়েছেন, কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে যেসব আসনে ছাড় দেওয়া হবে না, সেখানে তারা প্রার্থী উন্মুক্ত রাখার চিন্তাভাবনা করছেন।
খেলাফত মজলিসের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের অবস্থান এখনো আগের মতোই আছে। আবার বৈঠক হবে, সেখানেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। দলটির শুরা কাউন্সিলও বুধবার সকালে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
জামায়াতের আশাবাদ
তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এখনো আশাবাদী। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘মোটামুটি সব কিছু ইতিবাচক। যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে শীর্ষ নেতারা বসবেন, তারপর চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে।’
বুধবার সকালে একই রকম আশার কথা জানান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি আরটিএনএনকে বলেন, এখনো জোটে না থাকার বিষয়ে কেউ কঠিন বার্তা দেয়নি। বরং সমাঝোতার ভিত্তিতে সবাই জোটে থেকে যাবে বলেই আমরা আশাবাদী। দ্বিধার জায়গাগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে আর বুধবার বিকেলেই সব জানানো হবে।
এর আগে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও জানিয়েছিলেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই আসন সমঝোতার ঘোষণা আসবে। নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি ও প্রতীক বরাদ্দের সময়সূচি সামনে রেখে দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপেও রয়েছে জোটটি।
এ দিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী প্রাথমিক সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ৪০–৪৫টি, জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি, খেলাফত মজলিসকে ৭টি, এলডিপিকে ৪–৭টি, এবি পার্টিকে ২–৩টি এবং বিডিপিকে ২টি আসন দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি দল একটি করে আসনে প্রার্থী দিতে পারে। এসব প্রস্তাবে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস ছাড়া অন্য দলগুলো মোটামুটি সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে।
কোন পথে ১১ দল?
সব মিলিয়ে ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা এখন একেবারে শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে চরমোনাই ও খেলাফত মজলিসের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—এই জোট শক্ত অবস্থানে নির্বাচনে যাবে, নাকি ভাঙনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে। বুধবারের সংবাদ সম্মেলনই এ অনিশ্চয়তার ইতি টানবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।