Image description

আলী মোহাম্মদ 


দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিজয়ের পর এর প্রভাব নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিবিরকে বেছে নিয়েছে  তা নিয়ে নির্মোহ কোনো পর্যালোচনা এখন পর্যন্ত তেমন হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদের এসব বিজয় ভোটের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলেবে এ বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ন  বিষয়ে পরিনত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রধানত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ইসলামী ছাত্র শিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মধ্যে। বামপন্থী,  ছাত্র সংগঠনগুলো এই প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিলো না। বিএনপির নেতারা বলছেন ছাত্রসংসদ নির্বাচনের প্রভাব ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পড়বে না। কিন্তু এবার নির্বাচন হয়েছে সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে প্রায় এক লাখের কাছাকাছি  ছাত্র তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। ছাত্র সংসদের এই ভোটকে  আমরা দেখতে পারি  তরুন ভোটারদের  জরিপ হিসাবে। 


বাংলাদেশের ইতিহাস বলে ৬৯ এর ডাকসু এবং ৯০ এর ডাকসুর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়েছিলো। এবার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে একটি গনঅভুন্থ্যানের পর। যে অভ্যুন্থানে সারা দেশের ছাত্ররা অংশ নিয়েছিলো। অভ্যুন্থানে  অংশ নেয়া ছাত্রদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে এই নির্বাচন গুলোতে। যা দেশের প্রায় চার কোটি তরুন ও ছাত্র ভোটারকে প্রভাবিত করা খুবই স্বাভাবিক।  


সমাজে  রূপান্তর 
চব্বিশের জুলাই আগস্টের আন্দোলন নিছক কোটা বিরোধী আন্দোলন ছিলো না। আন্দোলন শুরু হয়েছিলো কোটা প্রথা বিলোপের দাবিতে,  কিন্তু এর পেছনে ছিলো নিপীড়ক সরকারকে হটানোর আকাঙ্খা। শেখ হাসিনার দেড় দশকে  যারা নির্যাতন , নিপীড়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  তারা সবাই এই আন্দোলনে  সামিল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে এ দেশের মানুষের ওপর ফ্যাসিবাদ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো।  একই ভাবে এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করতো হাসিনা টিকে আছে ভারতের সমর্থনে। তারা দৃঢ়ভাবে মনে করতো ভারতের আধিপত্যর অবসান ছাড়া তাদের মুক্তি নেই। একই সাথে হাসিনা সরকার এ দেশের মানুষের মুসলিম পরিচয়কে ছোটো করে ফেলছে বলে তারা মনে করতো। ফলে এই আন্দোলন মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রুপ নেয়। এবার প্রথম আমরা বাংলাদেশের কোনো আন্দোলনে হিজাব- বোরকা পড়া শত শত নারীকে অংশ নিতে দেখেছি। যারা ধর্মীয় পরিচয়কে গর্বের সাথে ধারন করে একটি উগ্রধর্মনিরপেক্ষ ( আল্টা সেক্যুলার) সরকারকে হটিয়েছে। 


একটি সফল অভ্যুন্থানের প্রভাব হয় সর্বব্যাপী। এর ভেতরগত দর্শন মানুষকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। অবচেতন ভাবে মানুষ তা ধারন করে। বাংলাদেশের মানুষের মুসলিম জাতীয়তাবোধ অস্বীকার করে এই অভ্যুন্থানকে ধারন করা সম্ভব নয়। ফলে এই আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের কাছে মুসলমানের চিহৃ, প্রতীক,শ্লোগানকে পশ্চাদপদতা কিংবা বিচ্ছিন্ন হিসাবে তুলে ধরার সুযোগ নেই। বরং এই পরিচয় এখন মুলধারার মানুষের পরিচয়। 


এই আন্দোলনের শুরু থেকে ইসলামী ছাত্র শিবির গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছে। বাম ধারার ও বিএনপি সমর্থক বিশ্লেষকরা এই বিষয়টি সব সময় আড়াল করার চেষ্টা করে থাকেন। হাসিনা শাসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তার পরিচিত ছিলো দুটো সংগঠনের  মাধ্যমে। ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে ছাত্র শক্তি। এই সংগঠনগুলোর কর্মসূচীতে অনিবার্যভাবে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সম্পৃক্ততা ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিবির নেতাদের সাথে এই ছাত্র সংগঠনের নেতারা যোগাযোগ রক্ষা করতো। অভ্যুন্থানের প্রথম সারির মুখ  আসিফ, নাহিদ, মাহফুজ, কাদের কেউই তা  অস্বীকার করতে পারবে না।


অভ্যুন্থানের প্রথম সারির সমন্বয়কদের গ্রেফতারের পর আন্দোলনের চালিকা শক্তি ছিলো শিবির। আন্দোলন  সর্বব্যাপী ও গ্রহনযোগ্য করতে ছাত্রদল ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিলো। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলোর কোনো ভুমিকা না থাকায় এর রূপ তারা ধরতে পারেনি। আমরা দেখছি,  অভ্যুন্থান  সফল হওয়ার পর থেকে বিএনপি ও ছাত্রদল এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে থাকে। মুসলিম  জাতীয়তাবাদী রাজনীতি  বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন হওয়ার পরও এই অভ্যুন্থানকে ধারন করতে পারছে না। অপরদিকে  বাম সংগঠনগুলো এই অভ্যুন্থান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে থাকে। স্বাভাবিক ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক অভ্যুন্থানের প্রাথমিক সুফল শিবির পেয়েছে।     


গুপ্ত রাজনীতির ব্যর্থ ন্যারেটিভ 
ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের সাফল্যর কারন হিসাবে ছাত্রলীগে গুপ্ত থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোকে নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করছে ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো। এই অভিযোগ আনা হয়েছিলো ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের বিরুদ্ধে। সাধারন ছাত্ররা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে না নিয়ে ছাত্রদলের প্রার্থীর চেয়ে তিনগুন বেশি ভোটে বিজয়ী করেছে। ছাত্রদলের এই প্রচারনা কার্যত হিতে বিপরীত হয়েছে। কারন সাধারন ছাত্র - ছাত্রীরা জানেন ছাত্রলীগের নিপীড়নের মুখে হলে থাকতে হলে ছাত্রলীগের মিছিল মিটিংয়ে যাওয়া ছিলো বাধ্যতামুলক। এজন্য শত শত ছাত্র-ছাত্রী নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ছাত্রলীগের রাজনীতি সমর্থন না করে তার সাথে সংযুক্ত দেখানো যে মানসিক নিপীড়ন তা সাধারন ছাত্ররা ভালো ভাবে উপলদ্ধি করেছে। ছাত্রলীগের প্রতি তাদের যে কোনো সমর্থন ছিলো না তা বোঝা তাদের জন্য কঠিন ছিলো না। আন্দোলনের সময় হল থেকে বিতাড়নে যে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্য ভুমিকা রেখেছে তা সাধারন ছাত্ররা দেখেছে। বরং পরিচয় গোপন করে ঝুকি নিয়ে শিবির যে সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখিয়েছে তা সাধারন ছাত্রদের কাছে  প্রশংসিত হয়েছে। অপরদিকে ছাত্রদলের সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছে। 


বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা যখন এই ন্যারেটিভ সামনে নিয়ে আসেন তখন তারা ছাত্রদলের আসল সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে ছাত্রদলের মুল সমস্যা রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায়। নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকে ছাত্রদলের প্রতি সাধারন ছাত্ররা আকর্ষন হারিয়ে ফেলেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদলের  সরব উপস্থিতি থাকলেও তা ছিলো ক্ষমতাসীন দলের সাথে থাকার জন্য। এরপর থেকে ছাত্রদল থেকে বড় কোনো নেতা বের হয়নি। ছাত্রদল সাধারন ছাত্রদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচী কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা চালায়নি। এরপর আওয়ামীলীগের দেড় দশকে ছাত্রদলের তেমন কোনো অংশগ্রহন ছিলো না। বরং বিভক্তি ও বিভাজন মারাত্বক রুপ নিয়েছিলো। খোদ বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছিলেন ছাত্রদলে বস্তির ছেলের কোনো প্রয়োজন নাই। 


ওয়েল ফেয়ার পলিটিক্সের  ভালো-মন্দ 
ছাত্রদল ও বামসংগঠনগুলোর অভিযোগ হচ্ছে ওয়েল ফেয়ার পলিটিক্সের  মাধ্যমে ছাত্র শিবির শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করছে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কোনো ছাত্র সংগঠন যদি অর্থের ব্যবহার করে থাকে তাকে সাধারন ছাত্ররা কিভাবে দেখছে? হলে হলে পানির ফিল্টার বসানো, মেয়েদের জন্য প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন দেয়া, বিনামুল্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অভাবি  শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়ার মতো শিবিরের কর্মসূচীর সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সাধারন শিক্ষার্থীরা শিবিরের এই কর্মসূচী গুলোকে স্বাগত জানাচ্ছে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের এসব সুবিধা  পাওয়ার কথা ছিলো। সেখানে একটি ছাত্র সংগঠন যখন সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে তাকে শিক্ষার্থীরা কেন প্রত্যাখান করবে? তাদের কাছে ছাত্র রাজনীতির এই মডেল বেশি গ্রহনযোগ্য হওয়া স্বাভাবিক। শিবির যদি ওয়েল ফেয়ার পলিটিক্সকে কৌশল হিসাবে নিয়ে থাকে তা অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্য একটি ভালো চ্যালেঞ্জ হিসাবে তারা ছুড়ে দিয়েছে। 


প্রশ্ন হলো শিবিরের এসব কর্মসূচীর অর্থ যোগায় কে?  এখন পর্যন্ত এ ধরনের কর্মসূচী বাস্তবায়নে শিবিরের বিরুদ্ধে কোনো চাঁদাবাজি বা জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তারা বলছে তাদের রাজনীতির সমর্থক কিংবা শুভানুধ্যয়ীদের কাছ থেকে তারা টাকা নিয়ে এসব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছেন। যারা টাকা দিয়েছেন তারা শিবিরের সততার ওপর আস্থা রেখেছেন। 


 ছাত্রদলের মতো একটি বড় সংগঠন,  যে সংগঠনের অভিভাবক ও প্রধান পৃষ্টপোষক হচ্ছে বিএনপি। যে দলটি বেশির ভাগ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং দলের মধ্যে শত শত ধনার্ঢ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন। দেশের অলিগার্ক ব্যবসায়ীরা মাত্র কয়েক দিন আগে তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাত করেছেন। ছাত্রদল অনায়াসে এ ধরনের কর্মসূচীতে অলিগার্ক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিতে পারে।
 কিন্তু প্রশ্ন হলো ছাত্রদলকে কি এই ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করবে? কিংবা এ ধরনের কর্মসূচী বাস্তবায়নে যে স্বচ্ছতা,  মেধা ও দক্ষতা দরকার তা কি ছাত্রদলের নেতাদের আছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায় শিবির যে ওয়েল ফেয়ার পলিটিক্সস শুরু করেছে তা ছাত্র রাজনীতিকে কঠিন করে তুলেছে। সাধারন  শিক্ষার্থীদের  জন্য  ছাত্র সংগঠনগুলো কি করবে, বা করতে চায় তার প্রমান তাদের দেখাতে হবে।      


গনমাধ্যমে শিবির 
বাংলাদেশের মুলধারার গনমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ন পদে যারা আছেন কিংবা বিশ্লেষক হিসাবে আমরা যাদের দেখি তারা প্রায় সবাই ছাত্র জীবনে বাম ধারার ছাত্র রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আশির দশকের শুরু থেকে  নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলোতে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। এই সংগঠনগুলোর প্রধান আদর্শিক শত্রু ছিলো ইসলামী ছাত্র শিবির। 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্টানে শিবির যাতে প্রকাশ্য ছাত্র  রাজনীতি করতে না পারে সে জন্য বাম সংগঠনগুলো ছাত্রদলকে সাথে নিয়ে শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছে। এ সময় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ,  ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে ছাত্র শিবিরের সংঘাত- সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে শিবিরের সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী নিহত হলেও প্রচার মাধ্যমে খবর গুলো এমন ভাবে পরিবেশন করা হতো  শিবির প্রথম  সংঘর্ষ শুরু করে এরপর তাদের নেতাকর্মী আহত না নিহত হয়। এমনকি শিবিরের নেতাকর্মীর নিহতের খবর অনেক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পর্যন্ত হতো না। আবার সংঘর্ষের সময় প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী নিহত হয়েছে, কিন্তু সংখ্যাটি ছিলো একেবারে হাতে গোনা। 


এ সময় শিবিরের রগকাটা ভাবমূর্তি দাঁড় করানো হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে সাপ্তাহিক বিচিত্রা। সে সময় সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো জনমত গঠনে বড় ধরনের ভুমিকা রেখেছে। বিচিত্রা ছাড়াও সাপ্তাহিক যায় যায় দিন, আজকের সুর্যোদয় ও সাপ্তাহিক বিক্রম প্রভাবশালী ছিলো।  আশি ও নববই দশকে শুরুর দিকে সংবাদপত্রের খবরের ওপর ছিলো মানুষের অপরিসীম আস্থা । তখন বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে একছত্র আধিপত্য ছিলো ইত্তেফাক, আজকের কাগজ থেকে ভোরের কাগজ, পরে প্রকাশ হয় প্রথম আলো ও যুগান্তর। এর বিপরীতে ছিলো একমাত্র ইনকিলাব। ফলে সংবাদপত্র যেভাবে শিবিরকে চিত্রিত করেছে তাতে সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের সংবাদপত্র পড়া শেখার পর শিবিরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কোনো কারন ছিলো না। এরপরও শিবিরের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও ছাত্রদের পেছনে লেগে থাকার ত্যাগী মানসিকতার কারনে রাজশাহী ও চট্রগ্রাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় কয়েকটি কলেজ যেমন খুলনা বিএল কলেজ, রংপুর কারমাইকেল কলেজ ও সিলেটের এমসি কলেজে শিবির প্রকাশ্য তৎপরতা চালিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। একটা বৈরি পরিবেশে শিবির কিভাবে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজ  গুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলো তা আলাদা ভাবে গবেষণার বিষয় হতে পারে। 
আজকে যে সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা টেলিভিশনের সামনে দেখি তারা ছিলেন আশি ও নব্বই দশকের বাম প্রভাবিত। এদের মনের মধ্যে তীব্র শিবির বিদ্বেষ কাজ করে। ফলে তাদের কাছ থেকে নির্মোহ বিশ্লেষন আশা করা যায় না।


বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তত চার দশক ধরে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মধ্যে খুব কমই পাওয়া যাবে, যারা রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াত ও শিবির কিভাবে পরিচালিত হয় তা  জানার চেষ্টা করেছেন। এ দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে আসে, নেতাকর্মীদের ওপর কিভাবে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্টা করা হয় সে সর্ম্পকে তাদের কোনো ধারনা নেই। এমনকি জামায়াত- শিবিরের মধ্যে সর্ম্পক কেমন সে সর্ম্পকে তাদের ধারনা স্বচ্ছ নয়। ফলে জামায়াত- শিবির নিয়ে যতটা প্রপাগান্ডা  হয় বস্তুনিষ্ট রিপোর্টি  ততটা হয় না। ফলে মুলধারার মিডিয়ার প্রচারনা জামায়াত- শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর বড় ধরনের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।  


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তি 
মুলধারার গনমাধ্যম দশকের পর দশক ধরে শিবির বিরোধী প্রচারনা চালিয়েছে। শিবিরকে অনেকটা সন্ত্রাসবাদী ও পশ্চাদপদ সংগঠন হিসাবে তুলে ধরা হতো।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শিবিরের এই বৈরি প্রচারনার বাবল ভেঙ্গে দিয়েছে। একজন শিবিরের নেতা ও কর্মী পাশাপাশি বসে ক্লাস করছেন। আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। এতদিন ধরে শিবির সর্ম্পকে যে মিথ তৈরি করা হয়েছিলো তারা দেখছেন বাস্তবতার সাথে মিল নেই। 


সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারনে শিবিরের নেতা কর্মীদের  সাথে তারা সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন। ফলে মুলধারার একমুখী বয়ান আর সাধারন শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করতে পারছে না। শিবিরের আজকের এই উন্থানের পেছনে সাংগঠিনক দক্ষতার পাশাপাশি  বড়  শক্তি  ছিলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মুল ধারান গনমাধ্যমে শিবির কখনো জায়গা পেতো না। আজকে তারা যে প্রচার পাচ্ছে সেটি মুলধারার গনমাধ্যমের চাপে। 


গন অভ্যুন্থানপরবর্তী ছাত্র শিবিরের উন্থান বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে। শিবির যেমন আগামি দিনের ছাত্র রাজনীতির একটি মডেল হিসাবে হাজির হয়েছে তেমনি জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব হবে সুদুর প্রসারী। যতই ভোটের রাজনীতিতে এর প্রভাব নেই বলে আতœতুষ্টিতে থাকা হোক না কেন তরুনরা যে নির্বাচনে যে বড় ফ্যাক্টর হিসাবে হাজির তাতে কোনো সন্দেহ নেই।