Image description

বিরল সম্মান, বিরল খ্যাতি। অনেকটা ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন। এক পরিবারের তিনজন খ্যাতির শীর্ষে। একজন প্রেসিডেন্ট, একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। আরেকজন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার আগেই জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে এগিয়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথা বলছি। সৌভাগ্য হয়েছিল এই তিন রাজনৈতিক সেলিব্রেটির মুখোমুখি হওয়ার। এক নয় একাধিকবার। ১৯৮০ সনের কথা। আমি তখন সংবাদের সিনিয়র রিপোর্টার। বার্তা সম্পাদক বজলুর রহমান আমাকে নির্দেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিশেষ ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আগেই নাম চাওয়া হয়েছিল। ভোরবেলা ট্রেন ছাড়লো। ছাড়ার মুহূর্তেই প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য বিএনপি’র প্রয়াত যুগ্ম মহাসচিব ড. ফেরদৌস আহমাদ কোরেশী ভাইকে অনুরোধ করলাম- আমি কি প্রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে পারি?  তিনি তখন দেশবাংলারও সম্পাদক। আমি দেশবাংলার চিফ রিপোর্টার ছিলাম। আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড়। ট্রেন ফেনী পৌঁছালো। যাত্রাবিরতি। 

 

এর মধ্যে কোরেশী ভাই এসে বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি তখন অনেকটা জড়সড়। এরকম একজন জাঁদরেল সেনাকর্মকর্তা কাম রাজনীতিকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। শুরুটাই বা কীভাবে করবো। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমাকে নিয়ে গেলেন বিশেষ ট্রেনের বিশেষ কামরায়। যেখানে প্রেসিডেন্ট বিশ্রাম নিচ্ছেন। কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি বললেন, ইয়াং ম্যান, নাস্তা খেয়েছেন? অনেকটা হালকা হলাম। ফের জিজ্ঞেস করলেন কী নাস্তা ছিল। পরোটা আর ভাজি। তাই নাকি! এটা তো দেখি আমার টেবিলেও আছে। সাদাসিধে জীবন। এ কারণেই মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। একটু আগেই তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছেন। বলেছেন, দেশটা বেশ সংকটের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ- গণঐক্য। তার ভাষায়, আমরা রাজনীতি নিয়ে সারাক্ষণই মেতে থাকি। রাজনীতি ভালো- আমি খারাপ বলছি না। কিন্তু দেশটাকে তো গড়তে হবে। আমি তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারিনি। প্রেসিডেন্ট নিজেই বললেন, কী জানতে চান। দেশ, রাজনীতি এবং আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই কথা বলতে চাই। নিজেই উত্তর দিতে শুরু করলেন। বললেন, প্রেক্ষাপট তো জানেনই। আমি কোন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছি। রাজনৈতিক নেতারা অনেকটাই দিশাহারা। তারা জনগণকে কোনো দিশা দিতে পারছেন না। ঘটনাবহুল সময় পার করছি আমরা। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটাই হচ্ছে জরুরি। নেতাদের মধ্যে অনৈক্য। মানুষ চায় নতুন রাজনীতি। আমরা তাই নতুন রাজনীতি দিয়েছি জনগণের দরবারে। আপনার প্রশ্নটা কী? আপনি কীভাবে ক্ষমতা ভোগ করছেন? হেসে বললেন, ক্ষমতা! এতো শতকাঁটায় ভরা। মুহূর্তেই কাঁটাবিদ্ধ হয়। কিছুটা স্বস্তি, তারপর সামনে আসে ক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীন হয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা তাই অনেক বেশি। মানুষ চায় রাতারাতি পরিবর্তন। 

 

সেটা কি সম্ভব? নিজেই বললেন, অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। এটাই এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া আমরা আমাদের নেতাদের সম্মান করি না। রাজনীতির মারপ্যাঁচে তাদের অবদানকে খাটো করি প্রতিনিয়ত। তখনই জানতে চাইলাম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার ধারণা কী। এই প্রশ্নের জবাব তো সংবাদ পত্রিকাকে আগেই দিয়েছি। সহকর্মী আশরাফ খান তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জবাবে জিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু মহান নেতা। এনিয়ে বিতর্কের কী আছে! আমাকেও একই কথা বললেন। এটা সংবাদে শিরোনাম হয়েছিল। ট্রেন ছুটে চলেছে। অল্প সময় পরেই আবার আরেকটি স্টেশন। সেখানে তাকে কথা বলতে হবে। এর আগে চটজলদি চারটা প্রশ্ন করলাম। সাবলীল ভাষায় জবাব দিলেন। বললেন, যোগাযোগ রাখবেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তখন আমাকে নিয়ে গেলেন অন্য কামরায়। দিনভর ট্রেনযাত্রা ভালোই কাটলো। 
 

সমস্যায় পড়ে গেলাম- কীভাবে রিপোর্ট করবো। তখন তো টেলিযোগাযোগ আজকের মতো  ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে ফোনে নিউজ পাঠালাম। সংবাদে বড় শিরোনামে খবরটি ছাপা হলো। এরপর দু’একটা সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।
 

প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন ক্ষমতায়, তখন সংবাদে প্রকাশিত আমার এক রিপোর্ট নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে গেল। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মন্ত্রীরা কোরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করেছিলেন। ঘুষ খাবেন না, তথ্য পাচার করবেন না। এই খবরটা আমি পেয়ে গিয়েছিলাম কোনো একটি সূত্রে। কিন্তু রিপোর্টটি কনফার্ম করতে পারছিলাম না। ইত্তেফাকের সহকর্মী আলমগীর হোসেন আমাকে সাহায্য করেছিলেন। রিপোর্ট প্রকাশের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। প্রেসিডেন্ট জিয়ার তথ্য উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস আমাকে ডেকে পাঠালেন বঙ্গভবনে। জানতে চাইলেন সূত্র। তিনি জানতেন আমি সূত্র বলবো না। শুধু বললাম, খবরটা ঠিক আছে কিনা। তিনি বললেন, খবর নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রেসিডেন্ট সাহেব জানতে চাচ্ছেন- কে মিডিয়ায় এই খবরটি লিক করলো। পেশাদার সাংবাদিক দাউদ খান মজলিস সূত্র জানতে পারলেন না। অনেক পীড়াপীড়ির পর বললাম, সম্পাদক ছাড়া কারও কাছে সূত্র বলা সাংবাদিকতার নীতিমালা পরিপন্থি। বললেন, তুমি যাও। আমি কবির সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। পরে অবশ্য আমার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এক সপ্তাহ বাদে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে একটা চিঠি এলো। যে চিঠিতে আমার সাহসিকতার প্রশংসা করে বলা হলো- খবরটা যিনি লিক করেছেন তার নৈতিকতা নিয়েই আমাদের যতসব প্রশ্ন।  
 

’৮১ সনের ৩০শে মে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নিহত হন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তখন আমাকে পাঠানো হলো সে সংবাদ কাভার করতে। ওইদিন সকালে প্রেস ক্লাবে বসে খবরটা শুনছিলাম। টেলিভিশনের পর্দায় বারবার বলা হচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রামে নিহত। এমন সময় সংবাদ সম্পাদক আহমেদুল কবির প্রেস ক্লাবে ঢুকেই ডেকে পাঠালেন। বললেন, তুমি আর মোহাম্মদ আলম বিমানের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম যাও। আমি অফিসকে বলে দিয়েছি- টিকিট কিনে সরাসরি ঘটনাস্থলে যেতে হবে। খবরটা কাভার করতে হবে। মোহাম্মদ আলম প্রেস ক্লাবেই ছিল। সে ছিল বঙ্গবন্ধুর ফটোগ্রাফার। ১৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর সংবাদে যোগ দেয়। সেখানে গিয়ে দেখা হলো মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের সঙ্গে। পুলিশ কর্মকর্তা। হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরে বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তার কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর কিছু খবর পেলাম। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে আরও কিছু তথ্য নিয়ে রিপোর্ট পাঠালাম সংবাদে। যেটা প্রধান শিরোনাম হয়েছিল। গোলাম কুদ্দুসের সঙ্গে আমার ছবি ছাপা হয়েছিল প্রথম পাতাতে। সেটা এখনো স্মৃতিতে ভাসে। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে এটা আমার জন্য ছিল বড় প্রাপ্তি। ভালো অ্যাসাইনমেন্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। 
 

বেগম খালেদা জিয়া লড়াই করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলেন। সম্পর্ক তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না। তার জমানায় একবার জেলেও গেলাম। ’৯৯-এর শেষের দিকে এক দুপুরে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম গাড়িতে করে। এমন সময় একটা ফোন এলো। অপরপ্রান্ত থেকে তারেক রহমান কথা বলছেন। বললেন, আমি তারেক বলছি। আম্মা আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি তখন ভাবতেও পারিনি কেন তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি তখন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া একের পর এক মামলা দিয়ে আমাকে নাস্তানাবুদ করছেন। জীবনটা অতিষ্ঠ করে ফেলেছেন। পত্রিকার পাতায় এগুলো ছাপা হচ্ছিল। সম্ভবত এসব খবর দেখেই তিনি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে টেলিফোনে আমাকে বললেন, মতিউর রহমান সাহেব আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আছি আপনার সঙ্গে। আমি কিছুটা অবাকই হলাম। কারণ তিনি তো আমার সম্পর্কে খুব একটা  জানেন না। বলতে দ্বিধা নেই- তখনই তার সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টে গেল। যোগাযোগ বাড়লো। পাশাপাশি তারেক রহমানের সঙ্গেও। আমি যেহেতু ক্ষমতা থেকে দূরে থাকি সে কারণে দূরত্ব মেনে চলি। ২০০১ এ ক্ষমতায় আসার পর বেগম জিয়া আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, অনেকে তো অনেক কিছুই চায়। আপনি তো কিছু চাইলেন না। বললাম, ম্যাডাম এটা তো আমার কাজ নয়। ভালো কাজের প্রশংসা করি, খারাপ কাজের সমালোচনা। এতে আপনারা মাঝে মধ্যেই বিরক্ত হন। তখন তার স্বভাবসুলভ জবাব- আমরা কি শুধু বিরক্তই হই, ভালোবাসি না! মানবিক গুণাবলিতে তিনি ছিলেন অনন্য। মানুষ তাকে ভালোবাসে মৃদুভাষী হওয়ার জন্য। তিনি আসলেই বলেন খুব কম, শুনেন ঢের বেশি। তার মধ্যে প্রতিহিংসা ছিল না। কখনো রাগ করে কথা বলতেন না। কেউ আঘাত করলেও নীরব থাকতেন। শেখ হাসিনার শব্দযুদ্ধের মধ্যেও তিনি নিজেকে সংযত রাখেন। কোনোভাবেই জবাব দেননি। যার প্রতিদান পেয়েছেন মানুষের কাছ থেকে। মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা তাকে ইতিহাসের চূড়ায় নিয়ে গেছে। বিএনপি নেত্রী নন, বনে গেছেন একজন জাতীয় নেত্রী। এটা তিনি আদায় করে নিয়েছেন। যে রেকর্ড তিনি গড়েছেন তা কেউ ছুঁতে পারবেন কিনা যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। 
 

২০১৭ সনের শুরুতে আমি যখন অসুস্থ হয়ে নিউ ইয়র্কের হাসপাতালে তখন তার মানবিক গুণাবলির প্রত্যক্ষ সাক্ষী হই। বাংলাদেশ সময় রাত চারটার দিকে আমার হার্টের অস্ত্রোপচার চলছিল। তিনি তখন ঢাকায় তার প্রেস উইংয়ের মাধ্যমে বারবার খবর নিচ্ছিলেন আমার ছেলের কাছে- কী অবস্থা, আমি কেমন আছি। অপারেশন হয়ে গেছে তো! একদম ভোরবেলায় যখন খবর এলো অপারেশন সাকসেসফুল, তখন তিনি ঘুমাতে গেলেন। এই ঋণ আমি কোনোদিনই শোধ করতে পারবো না। 
 

আরেকটা স্মৃতি এখনো আমাকে আবেগে আপ্লুত করে। ২০০৩ সনের কথা। ইরাক যুদ্ধ চলছে তখন। সাদ্দাম হোসেনকে হঠাতে যুক্তরাষ্ট্র একধরনের যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী টানটান উত্তেজনা। এই পর্যায়ে আমার ইচ্ছা হলো যুদ্ধ কাভার করার। এর আগে ইরাক-কুয়েত যুদ্ধ কাভার করার সুযোগ হয়েছিল। যাই হোক ইরাকে গেলাম। বাড়িতে কান্নাকাটি। বন্ধু-বান্ধবরা বিচলিত। যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া তার দপ্তরে ডেকে পাঠালেন। সঙ্গে গেলেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম। এ কথা সেকথার পর প্রধানমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করলেন- ভয় লাগেনি! এই গোলাবারুদ আর বোমারু বিমানের আগ্রাসী হামলার মধ্যে কেমন ছিলেন? বললাম, ফিরে আসতে পারবো- এটা ভাবতে পারিনি। এটা এক ধরনের রোমাঞ্চকর ঘটনা ছিল। বাগদাদ থেকে রিপোর্ট করেছি মানবজমিন, ভয়েস অফ আমেরিকা এবং কলকাতার সংবাদ প্রতিদিনে। এখন মনে হয় ওগুলো ছিল স্বপ্ন, চাঞ্চল্যকর। ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেল। তার ব্যক্তিগত স্টাফরা পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে আমি নিজেই বললাম আজ তাহলে উঠি। অনেক কৃতজ্ঞতা ডাকার জন্য। পরদিন ঢাকার পত্রপত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর অনেকবার ফোনে এবং সাক্ষাতে কথা হয়েছে। অসুস্থতার মধ্যেও তার সঙ্গে আমার আলাপচারিতা হয় ফিরোজায়। এটাই ছিল মিডিয়ায় তার সর্বশেষ সাক্ষাৎ।  কথা ছিল বিশ মিনিট থাকবো সেখানে। কারণ ম্যাডাম ভীষণ অসুস্থ। কারও সঙ্গেই কথা বলছেন না খুব একটা। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) আকবরের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছলাম। 

 

তিনি একটা বিশেষ চেয়ারে বসে আছেন। তার রুমে ঢুকতেই স্বভাবসুলভ প্রশ্ন- কেমন আছেন আপনি? আমি তো ভালো আছি। আপনার শরীর কেমন? নানা প্রসঙ্গ উঠলো। বললেন কম, আমাকেই বলতে হলো বেশি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। তার চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং নার্স বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন। কিন্তু ম্যাডাম থামছিলেন না। আরেকটু বসেন কথা শুনি। এক ঘণ্টা দশ মিনিট বাদে আমি নিজেই বললাম, আপনি অসুস্থ। আজ এখানেই শেষ করি। ‘কেমন আছেন খালেদা জিয়া’ শিরোনামে এই আলাপচারিতা ‘জনতার চোখে’ প্রকাশিত হয়েছিল। সব কিছু লেখা যায় নি। তিনি বারণ করেননি। কিন্তু আমি নিজে থেকেই তাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছিলাম। এই অবস্থায় একদিন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফোন করলেন। বললেন, ম্যাডামের বায়োগ্রাফি আপনাকে লিখতে হবে। এর জন্য অবশ্য প্রস্তুত ছিলাম না। পরে রাজি হয়ে গেলাম। দুর্ভাগ্য হলো কাজ শুরুই করা গেল না। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এরপর প্রতিদিন তার শরীর খারাপের খবর আসতে থাকলো। কঠিন অসুখের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন মাসের পর মাস। ফ্যাসিবাদী শাসন তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৩০শে ডিসেম্বর হেরে গেলেন। চলে গেলেন পরপারে। মৃত্যু হলো এক জীবন্ত ইতিহাসের। 
 

তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও আবেগ আর বাস্তবতার। অসংখ্যবার কথা বলেছি দেশে এবং বিদেশে। সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছি। ২০০৩ এর ২৮শে ডিসেম্বর চ্যানেল আইতে সাক্ষাৎকার নেই। যেটা ছিল ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় প্রথম সাক্ষাৎকার। ঘণ্টাব্যাপী এই সাক্ষাৎকারে অনেক বিব্রতকর প্রশ্নও করেছি। কিন্তু তিনি একবারের জন্যও বিরক্ত হননি। বরং সাক্ষাৎকার শেষে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, আমি পেরেছি তো আপনার মারদাঙ্গা প্রশ্নের জবাব দিতে? বললাম, চমৎকার, ধারণাতীত। যে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিদিনের রাজনীতিতে দুই নেতাকে টেনে না আনাই ভালো’।
 

এই সাক্ষাৎকার প্রচারের পর তার অন্য এক ইমেজ তৈরি হয়ে গেল। কতিপয় মিডিয়া তাকে অন্যভাবে তুলে ধরেছিল। যা পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তারাই এখন দুঃখ প্রকাশ করছে। মানবজমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বরাবরই চমৎকার। যদিও আমরা অনেক সময় তার নয়, সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেছি। ওয়ান/ইলেভেনের আগে তিনি প্রায়ই মানবজমিন অফিসে আসতেন। কথা বলতেন। দীর্ঘ আড্ডায় মেতে থাকতেন। রাজনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত অনেক ঘটনা শেয়ার করতেন বেশি। তার মধ্যে মানবিক গুণাবলি দেখে বিস্মিত হয়েছি। আমাদের সহকর্মীরাও অবাক হতেন। তিনি প্রটোকল মানতেন না। একবার তো সময় বাঁচাতে আমাদের অফিসের সামনের রাস্তায় নেমে অনেকখানি জায়গা হেঁটে এসেছিলেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল, কিন্তু তিনি তার তোয়াক্কা করেননি। ১৭ বছর বিদেশে ছিলেন। শেখ হাসিনার গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে লন্ডনে একাধিকবার তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। বরাবরের মতোই তিনি ছিলেন সাবলীল। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। বলতেন, কোথায় যাচ্ছে দেশটা। তখন ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশটা একদম কাবু। ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনার শাসন ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সুযোগ এলো হাসিনার একতরফা কুরুচিপূর্ণ ভাষার জবাব দেয়ার। জবাব তিনি দিলেন না। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। দেশে ফিরলেন ২৫শে ডিসেম্বর। জনতার উপস্থিতির মধ্যেই জবাব পেলেন শেখ হাসিনা। জিয়া পরিবারের বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত তাই। তারা কাউকে আঘাত করেন না। জনতার দরবারে ছেড়ে দেন। শেষ বিচারে জবাব দেয় জনতা। আজকের বাস্তবতা তাই।