নির্বাচনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য পাঁচটি রাজনৈতিক দলের ১০ শীর্ষ নেতার মধ্যে সাতজনেরই মাসে আয় লাখ টাকার কম। সবচেয়ে কম আয় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের। তাঁর বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এরপরেই রয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, যাঁর আয় বছরে ৪ লাখ টাকা। তাদের চেয়ে আয়ে কিছুটা এগিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা; যা মাসে ৫৬ হাজার টাকার সামান্য বেশি।
পাঁচটি দলের নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার্ষিক আয় জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারির। তিনি বছরে ৩৩ লাখ টাকা আয় করেন। সম্পদে তিনি শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ধনী। ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সম্পদের মালিক তিনি। ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার সম্পদ নিয়ে এরপরেই রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তাঁর মাসিক আয় লাখ টাকার মতো। জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের আয় বছরে ৪ লাখ টাকা।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আয়ে দ্বিতীয়। পেশায় পরামর্শক এই নেতা বছরে ১৬ লাখ টাকা আয় করেন। ১৯০ ভরি স্বর্ণের মালিক ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বার্ষিক আয় ১৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মাসে আয় ৩৯ হাজার টাকা। এনসিপির সদস্য সচিব শিক্ষানবিশ আইনজীবী আখতার হোসেনের আয়ও তাঁর চেয়ে বেশি, বছরে ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা।
পাঁচটি দলের শীর্ষ ১০ নেতার আটজন দামি গাড়ি এবং ঢাকায় বাড়ির মালিক হলেও, অর্জনকালীন মূল্য অনুযায়ী তাদের সবাই উচ্চমধ্যবিত্তের কাতারে পড়েন। তাদের পাঁচজনের পেশা ব্যবসা, দুইজন আইনজীবী, একজন করে রাজনীতিক, চিকিৎসক ও পরামর্শক। দুইজন বাদে সবাই উচ্চশিক্ষিত, ন্যূনতম স্নাতক। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় তারা নিজেরাই এসব তথ্য দিয়েছেন।
তারেক রহমান
ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনের প্রার্থী তারেক রহমান এইচএসসি পাস। তাঁর বছরে পৌনে সাত লাখ টাকা আয় হয় শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে। শেয়ার রয়েছে ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার। ব্যাংকে আমানত আছে এক লাখ ২০ হাজার টাকার। এফডিআর আছে ৯ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকার। স্বর্ণালংকার (অর্জনকালীন সময়ে) আছে দুই হাজার ৯৫০ টাকার। হাতে নগদ টাকা আছে ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৪২৮ টাকা।
তারেক রহমানের স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে অকৃষি জমি, ৩০৫ শতক। অর্জনকালীন দাম দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রী জোবাইদা রহমানের নামে আছে ১১১ দশমিক ২৫ শতক অকৃষি জমি এবং যৌথ মালিকানায় ৮০০ বর্গফুটের দোতলা ভবন। তারেক রহমান ২ দশমিক ৯ শতাংশ জমি উপহার হিসেবে পেয়েছেন। জোবাইদা রহমানের নগদ টাকা আছে ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৭ টাকা। ব্যাংকে সঞ্চয় আছে ১৫ হাজার ২৬০ টাকা এবং এফডিআর আছে ৩৫ লাখ টাকার। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নামে ৭৭টি মামলার মধ্যে ৫৪টিতে খালাস পেয়েছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলফনামায় জানিয়েছেন, চার কোটি ছয় লাখ ৫৪ হাজার ৭১৫ টাকার সম্পদ রয়েছে তাঁর। পেশা ব্যবসা উল্লেখ করা এই নেতার বার্ষিক আয় ১১ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৩ টাকা।
মির্জা ফখরুলের পাঁচ একর কৃষিজমি রয়েছে। যার অর্জনকালীন মূল্য ৬০ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ২৮৪ শতক জমি। দাম ৫১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ঠাকুরগাঁওয়ে স্বামী-স্ত্রীর নামে রয়েছে ৩৯ লাখ ৭২ হাজার টাকার ১২ শতাংশ অকৃষি জমি। ঢাকার পূর্বাচলে ফখরুল ইসলামের পাঁচ কাঠা জমি রয়েছে, আনুমানিক দাম ৮৫ লাখ চার হাজার টাকা। ঢাকায় অবস্থিত এক হাজার ৯৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। অর্জনকালীন দাম ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
মির্জা ফখরুলের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে তিন লাখ ৮২ হাজার টাকা রয়েছে। তবে হাতে নগদ টাকা আছে সোয়া এক কোটি টাকা।
বিএনপি মহাসচিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মোট ৫০টি মামলা দায়ের হয়েছিল। তবে এর বেশির ভাগই আদালতের আদেশে স্থগিত, প্রত্যাহার বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) দাখিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী জামায়াতের শফিকুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস। পেশায় চিকিৎসক। ৩৪ মামলায় দুটি বাদে সবগুলোতে খালাস পেয়েছেন। তিনি দেড় কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। আয়কর দিয়েছেন ৩০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে কৃষিজমি আছে ২১৭ শতক, যার মূল্য ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা। ১১ দশমিক ৭৭ শতক জমিতে ডুপ্লেক্স আবাসিক ভবন রয়েছে।
জামায়াত আমিরের হাতে নগদ আছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। ব্যাংকে আছে চার লাখ ৯০ হাজার ২৬৩ টাকা। ৫০ ভরি অলংকার আছে এক লাখ টাকার। স্ত্রী আমেনা বেগম গৃহিণী, তাঁর কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। তিন সন্তানের সবার আয় রয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার
খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী গোলাম পরওয়ার হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তিনি নিজের পেশা দিয়েছেন ব্যবসা ও সাবেক শিক্ষক। ৪৮ মামলার অধিকাংশে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন।
হলফনামায় মিয়া গোলাম পরওয়ার মোট ৩৭ লাখ ৮১ হাজার টাকার সম্পদের ঘোষণা দিয়েছেন। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে– অকৃষি জমি ও ভবন, যার বর্তমান বাজারমূল্য এক কোটি টাকা। এসব সম্পদের অর্জনমূল্য ২২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। নগদ পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে সাত লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা জমা থাকার তথ্য দিয়েছেন। ২০২৫ কর মূল্যায়ন বছরে তিনি পাঁচ হাজার ৬২৫ টাকা কর দিয়েছেন।
নাহিদ ইসলাম
ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম স্নাতক ডিগ্রিধারী। তাঁর পেশা পরামর্শক। শিক্ষকতা ও পরামর্শ দিয়ে বছরে আয় ১৬ লাখ টাকা। নিজের কাছে নগদ আছে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা; স্ত্রীর কাছে আছে দুই লাখ টাকা এবং ব্যাংকে আছে তিন লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা। নিজের পৌনে আট লাখ টাকার অলংকার এবং স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকার গহনা। সব মিলিয়ে এনসিপি প্রধানের ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদ আছে। গত বছরে আয় হয়েছে ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ১৫৮ টাকা। আয়কর দিয়েছেন এক লাখ ১৩ হাজার ২৭৪ টাকা।
আখতার হোসেন
রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী আখতার হোসেনের গাড়ি-বাড়ি নেই। নগদ টাকা আছে ১৩ লাখ। তাঁর স্ত্রী সানজিদা আক্তারের আছে চার লাখ টাকা। নিজের ব্যাংকে জমা আছে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৪২৬ টাকা। কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে আখতার হোসেনের বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। নিজের সাত লাখ ও স্ত্রীর আছে ১০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার। নিজের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ ১৩ লাখ টাকা এবং ব্যাংকে তিন লাখ টাকা। আখতারের ১৮ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে হলফনামা অনুযায়ী।
জি এম কাদের
রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী জি এম কাদেরের পেশা রাজনীতি। তাঁর কাছে নগদ টাকার পরিমাণ ৬০ লাখ ৩২ হাজার। গত নির্বাচনে তাঁর নগদ টাকা ছিল ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার। ওই সময় তাঁর স্ত্রী শেরীফা কাদেরের নগদ টাকা ছিল ৫৯ লাখ ৫৯ হাজার। এবার তা কমে হয়েছে ৪৮ লাখ ৯০ হাজার ৯৩৮ টাকা। জি এম কাদের ৮৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা দামের গাড়ির মালিক। তাঁর স্ত্রী চড়েন ৮০ লাখ টাকার গাড়িতে।
জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের কৃষিজমি না থাকলেও নিজের ও স্ত্রীর নামে লালমনিরহাট ও ঢাকায় বাড়ি রয়েছে। বর্তমান মূল্য দুই কোটি টাকার বেশি বলে হলফনামায় তথ্য দিয়েছেন। তিনি বছরে চার লাখ টাকা আয় করলেও তাঁর স্ত্রী ব্যবসা থেকে আয় ছয় লাখ টাকা বলে তথ্য দিয়েছেন। জি এম কাদেরের অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর সম্পদের মূল্য এক কোটি ৭২ লাখ টাকা।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী
গাইবান্ধা-১ আসনের প্রার্থী শামীম হায়দার বার এট ল ডিগ্রিধারী, পেশায় আইনজীবী। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে চার কোটি ৮২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৫ টাকা সম্পদের মালিক তিনি। আইন পেশা ছাড়াও কৃষি খাত, সম্পত্তি থেকে ভাড়া, ব্যবসা ও চাকরি থেকে তাঁর আয় হয়। হাতে নগদ টাকা আছে এক কোটি ৫০ লাখ। চার কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততার কারণে।
ফয়জুল করীম
বরিশাল-৫ আসনের প্রার্থী ফয়জুল করীমের নগদ অর্থ ও অন্যান্য আয় কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফয়জুলের স্ত্রী ১৮৭ ভরি স্বর্ণ উপহার পেয়েছেন। ২০০৮ সালে তাঁর স্ত্রীর মালিকানায় ১০ ভরি স্বর্ণ ছিল। ২০১৮ সালের হলফনামায় স্বর্ণ দেখানো হয়নি।
২০০৮ সালের হলফনামায় ফয়জুল নিজেকে ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন। তখন তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ভাড়া, শিক্ষকতা এবং মাহফিলের হাদিয়াসহ এখন তাঁর বার্ষিক আয় ১৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। ২০০৮ সালে নগদ ২০ হাজার টাকার মালিক ফয়জুলের এখন নগদ আছে ৩১ লাখ ১২ হাজার ৪৭ টাকা।
ইউনুস আহম্মেদ
খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী ইউনুস আহম্মেদ সেখ কামিল ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস। বর্তমান পেশা ব্যবসা। তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য তিন কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ব্যবসা থেকে তাঁর বার্ষিক আয় চার লাখ ১৮ হাজার ৭৯২ টাকা। তাঁর কাছে নগদ আছে ২৩ লাখ আট হাজার ৯৯৯ টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা।