Image description
 

সুস্থ জীবনযাপনে প্রতিদিন ৩-৪ লিটার পানি পান দরকার। শহরাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি পাওয়া তেমন বিষয় নয়। একটি কল ঘুরিয়ে বা পরিশোধিত পানির বোতল খুললেই মেটে প্রয়োজন। কিন্তু সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এই পানি সংগ্রহের আরেক নাম সংগ্রাম। ব্যবহারযোগ্য এক কলসি পানির জন্য মাইলের পর মাইল ছোটেন নারীরা। চাতক পাখির মতো বৃষ্টি ধরে চলেন পুরো বছর।

বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষেই সুন্দরবন। অথৈ লোনা পানির কারণে এই উপকূলের জীবনও বড্ড তিক্ত। বাউলসম্রাট লালন ফকিরের গান ‘ফকির লালন মরল জল পিপাসায়/কাছে থাকতে নদী মেঘনা’র দশা। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জেগেছে আশা।

লোনা পানির ঠিক নিচে মাটির গভীরে বিশুদ্ধ মিঠা পানির ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, সুন্দরবনের বুকে বয়ে চলা পশুর নদীর তলদেশ ও তীরবর্তী এলাকায় অত্যাধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপে ‘লুকায়িত’ মিঠা পানির দুটি আঁধার (জলাধার) বা রিজার্ভার মিলেছে। এর একটির গভীরতা প্রায় ৮০০ মিটার। এই পানি প্রায় ২০ হাজার বছর আগের, শেষ বরফ যুগে জমা হয় এবং প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষিত রয়েছে।

এই মিঠা পানি ৩০০ মিটার নিচ থেকে শুরু করে ৮০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ ৩০০ মিটার গভীর থেকেই উত্তোলন করা সম্ভব। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই স্তরে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। তবে ব্যবহার শুরুর আগে পানির মান যাচাই করে নিতে হবে। অন্য কোনো ক্ষতিকর পদার্থ দ্রবীভূত আছে কিনা, তা জানা জরুরি।
অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উপকূলবাসীর জন্য এমন আশার তথ্য জানানো হয়েছে। ‘ব্যারিড ডিপ ফ্রেশওয়াটার রিজার্ভস বিনিথ স্যালিনিটি-স্ট্রেসড কোস্টাল বাংলাদেশ’ শিরোনামে জরিপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আট গবেষক অংশ নেন।

যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো টেক গবেষণাটি করেছে। গবেষণাপত্রের মূল লেখক কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ‘ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরি’র গবেষক হুয়ি লে। সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা জিওফিজিসিস্ট কেরি কি, মাইকেল এস স্টেকলার, মার্ক পারসন, নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির বাংলাদেশি নাফিস সাজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার ভূঁইয়া, অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান খান ও অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, এই মিঠা পানি ৩০০ মিটার নিচ থেকে শুরু করে ৮০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ ৩০০ মিটার গভীর থেকেই উত্তোলন করা সম্ভব। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এই স্তরে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। তবে ব্যবহার শুরুর আগে পানির মান যাচাই করে নিতে হবে। অন্য কোনো ক্ষতিকর পদার্থ দ্রবীভূত আছে কিনা, তা জানা জরুরি।

 

খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলে মাটির গভীরে পাওয়া মিঠা পানি মূলত প্লাইস্টোসিন যুগের। কার্বন ডেটিং বা পানির বয়স পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি হয়ত ১৫ থেকে ২৯ হাজার বছর আগের। এটি খুব ধীরে রিচার্জ হয়। ফলে অপরিকল্পিতভাবে পাম্প বসিয়ে তোলা হলে, সমুদ্রের লোনা পানি ঢুকে আধারগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

 

অক্সফাম পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষ ব্যবহারযোগ্য ও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে এখনো ৪১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি সুবিধার বাইরে। ফলে নতুন উৎসে পানি পর্যাপ্ত থাকলেও ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন অধ্যাপক কাজী মতিন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ– সন্ধান পাওয়া জলাধারের পানি খুব ধীরগতিতে রিচার্জ হয়। বুঝেশুনে ব্যবহার না করলে দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। লোনা এলাকায় স্বাদু পানি খুবই দামি। ফলে একটু সাবধান হলে অনায়াসে দীর্ঘদিন এই পানির সুবিধা উপকূলবাসী ভোগ করতে পারবেন।’

কীভাবে গবেষণা, যেভাবে মিলল মিঠা পানির দ্বীপ

নিবন্ধে বলা হয়েছে, গবেষকরা খুলনা শহর থেকে সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত পশুর নদী বরাবর প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ পরিচালনা করেন। এই কাজে তারা ‘ম্যাগনেটো-টেলুরিক (এমটি)’ নামের বিশেষ জিওফিজিক্যাল (ভূ-পদার্থবিদ্যা) পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এটি মাটির গভীরে অনেকটা এক্স-রে যন্ত্রের মতো কাজ করে। বিদ্যুৎ পরিবাহিতা মেপে মাটির নিচের পানির লবণের মান নির্ধারণ করেছেন।

এমটি পদ্ধতিতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ (যা মূলত সৌরবায়ু ও বজ্রপাতে সৃষ্ট) ব্যবহার করে মাটির নিচের শিলা ও পানির বিদ্যুৎ পরিবাহিতা পরিমাপ করা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায়, লোনা পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী (কনডাক্টিভ); মিঠা পানি বিদ্যুৎ অপরিবাহী বা রোধক (রেজিস্টিভ)।

গবেষকরা ২০২২ সালের মার্চে পশুর নদীর দুই তীর ও সংলগ্ন কৃষি জমিতে ২৫টি স্থানে যন্ত্র বসিয়ে মাটির কয়েক কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত ‘এক্স-রে’– এর মতো চিত্র ধারণ করেন।

উপকূলে লোনা পানির রাজ্যে মাটির নিচের মিঠা পানির আঁধার আসলে সোনার খনি। একে বলা হয় ভেজা মরুভূমি। মানুষ শুধু পানের জন্য ব্যবহার করলে ১০০ বছরেও এই পানি ফুরাবে না।
অধ্যাপক আনোয়ার ভূঁইয়া, গবেষক দলের সদস্য, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, মাটির নিচে মিঠা পানির দুটি স্বতন্ত্র আধার বা জোন রয়েছে। একটি সুন্দরবনের উপকূলে, উত্তরের আধার (আর১)। এই স্তরটি মাটির নিচে প্রায় ৮০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং উত্তর দিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয়টি, দক্ষিণের আধার (আর২), পাওয়া গেছে সুন্দরবনের মধ্যাঞ্চলে। পশুর নদীর গতিপথ ধরে সুন্দরবনের ভেতরে এই স্তরটি প্রায় ৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এবং গভীরতা প্রায় ২৫০ মিটার।

গবেষকরা বলছেন, খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলে মাটির গভীরে পাওয়া মিঠা পানি মূলত প্লাইস্টোসিন যুগের। কার্বন ডেটিং বা পানির বয়স পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি হয়ত ১৫ থেকে ২৯ হাজার বছর আগের। এটি খুব ধীরে রিচার্জ হয়। ফলে অপরিকল্পিতভাবে পাম্প বসিয়ে তোলা হলে, সমুদ্রের লোনা পানি ঢুকে আধারগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও মাটির গঠন বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে গবেষণায়।

খুলনা ও সুন্দরবনের এই দুই মিঠা পানির আঁধারের মাঝখানে প্রায় ২০ কিলোমিটার চওড়া একটি এলাকার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, এখানে মাটির গভীরেও লোনা পানি রয়েছে, যেটিকে ‘স্যালাইন গ্যাপ’ বা লোনা পানির ব্যবধান বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক কাজী মতিন বলেছেন, স্যালাইন গ্যাপটি দুই মিঠা পানির জলাধারের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। উপকূলের মাটির নিজের এ ধরনের বৈচিত্র্য একেবারে প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক।

লোনা পানির নিচে মিঠা পানি এলো কোথা থেকে

লোনা পানির নিচে মাটির গভীরে মিঠা পানি এলো কোথা থেকে– এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। এ বিষয়ে গবেষকরা বলছেন, এই মিঠা পানি আজকের নয়। এটি প্যালিও-ওয়াটার বা প্রাচীন আমলের পানি। প্রায় ২০ হাজার বছর আগে ‘লাস্ট গ্লেশিয়াল ম্যাক্সিমাম’ বা শেষ বরফযুগের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ বর্তমানের চেয়ে প্রায় ১২০ মিটার নিচে ছিল। তখন পুরো এলাকা ছিল মিঠাপানিতে পূর্ণ।

পরে প্রাকৃতিকভাবে মাটির ওপর পলি ও কাদার একটি পুরু আস্তর (ফাইন-গ্রেইনড সেডিমেন্ট বা কাদা মাটির ঢাকনা) পড়ে। এতে মিঠা পানি নিচে আটকা, ওপরের লোনা তা ভেদ করতে পারেনি। যদিও স্যালাইন গ্যাপ তৈরি হয়েছে হাজার বছর আগে গঙ্গা নদীর একটি প্রাচীন গতিপথের (প্যালিও-ভ্যালি) কারণে।

কত বছর ব্যবহার করা যাবে, পরিবেশের ক্ষতি কতটুকু

লোনা পানির নিচের মাটি থেকে স্বাদু পানি সংগ্রহে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে কিনা– এ প্রশ্ন সামনে আসছে। ব্যবহার করলে, উপকূলবাসী ঠিক কতদিন পারবেন– এমন প্রশ্নে গবেষক দলের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার ভূঁইয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘উপকূলে লোনা পানির রাজ্যে মাটির নিচের মিঠা পানির আঁধার আসলে সোনার খনি। একে বলা হয় ভেজা মরুভূমি। মানুষ শুধু পানের জন্য ব্যবহার করলে ১০০ বছরেও এই পানি ফুরাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিঠা পানিটুকু মাটির নিচে আবদ্ধ (ট্র্যাপড) অবস্থায় রয়েছে। লোনা পানির সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ নেই। ফলে পানি উত্তোলনে তাৎক্ষণিক লোনা পানি ঢুকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কা কম। তবে এটি একটি সীমিত সম্পদ, স্তর পুরোপুরি খালি হলে ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মনে রাখতে হবে, পানি তোলার পর প্রাকৃতিকভাবে এটি দ্রুত পূরণ হচ্ছে না।’