বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ব্যবসার ‘মঞ্চে’ নামতেই পাল্টে যায় ভাগ্যরেখা। এক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় বিভাগে কর্মরত ছিলেন যুগ্ম পরিচালক পদে। সেই নওশেরুল ইসলাম আজ বিশাল এক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে গড়েছেন অগাধ সম্পদ। দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০৬টি সম্পত্তি, ২১টি কোম্পানিতে শেয়ার, ব্যাংকে অগণিত এফডিআর ও ডিপিএস। চাকরিজীবনে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন অর্থ পাচারের রুট। নিজের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সভায় অংশ নিয়ে অন্য একটি কোম্পানির নামে অনুমোদন দিয়েছেন বিপুল অঙ্কের ঋণ, নিজেও আবার সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন অঢেল। এরপর উভয়েই আত্মসাৎ করেন ঋণের টাকা। এমন ভয়াবহ সব জালিয়াতির বড় অংশ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান টেবিলে। অর্থ পাচার, ঋণ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে হয়েছে অন্তত ২০টি মামলা; আরও বেশ কয়েকটি তদন্তাধীন। যে মানুষটি একসময় সরকারি বেতনে সংসার চালাতেন, আজ তিনি বহুজাতিক প্রকল্পে অর্থপ্রবাহের অন্যতম নিয়ামক। কোথা থেকে এলো এই বিপুল অর্থ, কার ছায়াতলে গড়ে উঠল এমন বিস্তীর্ণ প্রভাবের বলয়—সেসব অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘থতমত খেয়ে’ যাচ্ছেন খোদ দুদকের কর্মকর্তারাও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন নওশেরুল ইসলাম। তিনি সেখানে প্রায় ১৫ বছর কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিময় বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে অবসর নেন। এরপর শুরু করেন ব্যবসা।
নওশেরুল ইসলামের এক ছেলে ও এক মেয়ে; দুজনই অবস্থান করছেন দেশের বাইরে। চাকরি থেকে অবসরের পর ১৯৯৬ সালে প্রথম ‘মেসার্স মেরিন অ্যান্ড মেরিন কোম্পানি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে শুরু করেন ব্যবসায়িক কার্যক্রম। পরে ২০১৫ সালে ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মাধ্যমে যোগ দেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল)-এর পরিচালক পদে।
অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় নওশেরুলের অন্তত ১০৬টি সম্পত্তির তথ্য পেয়েছে কালবেলা। যার অর্ধেকের বেশি ঢাকা ও নড়াইলে। এর মধ্যে নড়াইলে ৪২টি এবং ঢাকায় ৩৩টি সম্পত্তির তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া গাজীপুরে ১৮টি ও চট্টগ্রামে ১৩টি সম্পত্তিসহ মোট ১০৬টি সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘পি কে হালদারের সঙ্গে অর্থ পাচারের সহযোগী হিসেবে মো. নওশেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলায় তদন্ত চলছে। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। পি কে হালদারের সঙ্গে যোগসাজশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের একাধিক মামলায় অভিযুক্ত তিনি। পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও তদন্ত চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় তার বিরুদ্ধে শতাধিক সম্পদের প্রমাণ মিলেছে।’
দুদকের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নওশেরুল ইসলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় শাখায় কর্মরত ছিলেন। অর্থ পাচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার ছিল গভীর জ্ঞান। চাকরি থেকে অবসরের পর সেই জ্ঞানকেই কাজে লাগিয়ে জড়িয়ে পড়েন অর্থ পাচারের সিন্ডিকেটে।’
দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক ছিলেন নওশেরুল ইসলাম। যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাস্ট-এর নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেন এফএএস ফাইন্যান্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে, তবে সেই ঋণ কখনো পরিশোধ করা হয়নি। তারা আত্মসাৎ করেন প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে এফএএস ফাইন্যান্স লিমিটেডের পরিচালক উজ্জ্বল কুমার নন্দী তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রহমান কেমিক্যালস, নর্দান জুট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ক্লেউস্টন ফুডস অ্যান্ড অ্যাকোমোডেশন লিমিটেডের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ঋণ নেন। ঋণের সেই অর্থও আত্মসাৎ করেন উজ্জ্বল কুমার নন্দী।
প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পিতভাবে একজন অন্যজনের প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন, যাতে সরাসরি নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা এড়ানো যায়। তবে কেউই পরবর্তীতে সময় সেই অর্থ ফেরত দেননি।
বোর্ড সদস্য হিসেবে নওশেরুল ইসলাম ঋণ প্রস্তাবের সময় জামানত, আবেদনকারীর ব্যবসায়িক রেকর্ড ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করেই বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে প্রতারক চক্রকে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেন।
নড়াইল জেলায় যত সম্পদ : নওশেরুল ইসলামের নামে যেসব সম্পত্তির তথ্য মিলেছে তার মধ্যে নড়াইলের লোহাগড়ায় ১০৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিতে বাড়ি, লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে ১০ ডেসিমাল জমিতে ভবন ও ৫৬০ বর্গফুটের দোকান, ৮ শতাংশ কৃষি জমি, আলাদা দলিল নম্বরে ১৯ শতাংশের আরেক খণ্ড কৃষি জমি, একই এলাকায় রয়েছে ৫১ শতাংশের আরেকটি জমি। এ ছাড়া নড়াইলে ৩১ শতাংশ, ১২ শতাংশ, ৪ শতাংশ, ৩৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ, ৪২ শতাংশ, ৩ শতাংশ, ভিন্ন দলিল নম্বরে ১৮ শতাংশ করে আলাদা দুই খণ্ড জমি, ৬৫ শতাংশ, ৬৪ শতাংশ, ১৪ শতাংশ, ২৬ শতাংশ, ৯০ শতাংশ, ৮২ শতাংশ, ৬৯ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ৪৯ শতাংশ, ৩১ শতাংশ, ১১ শতাংশ, ২৪ শতাংশ, ৯ শতাংশ, ২৭ শতাংশ, ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ৮ শতাংশ, ১৩ শতাংশ, ১৭ শতাংশ, ১২ শতাংশ, ৭ শতাংশ, ৬৫ শতাংশ, ২২ শতাংশ, ৮৩ শতাংশ ও ৬১ শতাংশের আরেক খণ্ড জমির তথ্য মিলেছে নওশেরুল ইসলামের নামে। যার সবকটির দলিল নম্বর ও সংশ্লিষ্ট নথি কালবেলার হাতে এসেছে।
যত সম্পদ গাজীপুরে: রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরেও বিস্তর সম্পত্তি রয়েছে নওশেরুলের। শিল্প অধ্যুষিত এ জনপদে ১৯ ডেসিমাল অকৃষি জমিতে ২৫ শতাংশ শেয়ার, ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমিতে ২৫ শতাংশ শেয়ার, ৩৩ দশমিক ২০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ০০ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৫ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ১ দশমিক ২৫ শতাংশের আরেক খণ্ড জমি, ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমির ৫০ শতাংশ শেয়ার, ৮৯ শতাংশ জমিতে ৫০ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ জমিতে ৫০ শতাংশ শেয়ার, ৭ শতাংশ জমিতে ৫০ শতাংশ শেয়ার, আলাদা দলিল নম্বরের ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ করে আরও দুই খণ্ড জমি, ১ দশমিক ৫০ শতাংশের আরেকটি জমি এবং নিজের একক নামে ৩০ দশমিক ৭৯ শতাংশ জমি রয়েছে তার। এগুলোর সবকটির দলিল নম্বর ও সংশ্লিষ্ট নথি কালবেলার হাতে রয়েছে।
বিস্তর সম্পত্তি ঢাকা জেলায়ও : রাজধানী ঢাকায় বনানী ডিওএইচএসের ১ নম্বর রোডের ৩৮ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় ২৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট স্ত্রীসহ নওশেরুলের যৌথ নামে রয়েছে। এ ছাড়া সূত্রাপুরে ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমির ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, আজিজ সুপার মার্কেটে স্ত্রী মমতাজ বেগমের নামে ১৪৫ বর্গফুটের দোকান, খিলক্ষেতের ডুমনি মৌজায় ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, একই মৌজায় ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, একই এলাকায় ১ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ওই এলাকাতেই ৯ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৫ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৫ শতাংশের আরেকটি জমির ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ জমির ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ১০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ১৮ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৪ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ জমিতে ৫০ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৬ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৪০ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ২২ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ২ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার এবং ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে তার নামে।
চট্টগ্রাম জেলায় যেসব সম্পত্তি : বন্দর নগরী চট্টগ্রামেও নওশেরুলের সম্পত্তির পরিমাণ কম নয়। পতেঙ্গায় ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমিতে ১৭ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৮০ শতাংশ জমিতে ২০ শতাংশ শেয়ার, ৪ শতাংশ জমিতে ২০ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ২০ শতাংশ জমিতে ২০ শতাংশ শেয়ার, ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ জমিতে ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ১ দশমিক ৫ শতাংশ জমিতে ২৫ শতাংশ শেয়ার, ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ জমিতে ২৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৬ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ০ দশমিক ৩৬ শতাশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার, ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার এবং ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশের আরেক খণ্ড জমিতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে তার। এ ছাড়া ফরিদপুর ও বরগুনায় আরও বেশ কয়েকটি সম্পত্তিসহ নওশেরুলের মোট ১০৬টি সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে কালবেলার হাতে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেনামে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ কর্মকর্তার আরও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি থাকতে পারে।
যেসব কোম্পানিতে রয়েছে শেয়ার: নওশেরুলের প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যমানের ১ হাজার ৮০০টি শেয়ার ও ৫ লাখ টাকা শেয়ার মানি রয়েছে মেরিন অ্যান্ড মেরিন লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিতে। গ্রাম মেরিন লিমিটেডে রয়েছে প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের ৪ হাজার ৪০০টি শেয়ার ও ৫ লাখ টাকার শেয়ার মানি। আমাদের মেরিন কোম্পানি লিমিটেডে রয়েছে প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের ৪ হাজার ৪০০টি শেয়ার ও ৫ লাখ টাকার শেয়ার মানি এবং ইনল্যান্ড টেংকার সার্ভিসেস লিমিটেডে প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের ২ হাজার ১০০টি শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া টোটাল টেংকার সার্ভিসেস লিমিটেডে রয়েছে প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যের ২ হাজার ১০০টি শেয়ার। একইভাবে মার্কেট রিচার্স লিমিটেডে ১ হাজার ৫০০টি শেয়ার, শতাব্দী শিপিং লাইন লিমিটেডে ১ হাজার ২৫০টি শেয়ার, আনবিস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডে ৩ হাজার শেয়ার, ইটা অ্যান্ড টাইলস লিমিটেডে ১২ হাজার ৫০০ শেয়ার ও ৬.৫৭ কোটি টাকা ঋণ। এমএসটি ফুড অ্যান্ড এগ্রো লিমিটেডে ৫ হাজার শেয়ার, রেইনফরেস্ট প্রোপার্টিজ লিমিটেডে ৫ হাজার শেয়ার, জেড শিপিং লাইন লিমিটেডে ৩ হাজার শেয়ার, এমএসটি লিমিটেডে ৬ হাজার ৮২৫টি শেয়ার, এমএসটি মেরিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডে ২ হজার ৮৩৩টি শেয়ার ও ৩.৫ কোটি টাকা ঋণ, মেরিন ট্রাস্ট লিমিটেডে ৪ হাজার ৫০০টি শেয়ার, টেলিহেলথ কেয়ার লিমিটেডে ৫ হাজার ৬০০ শেয়ার, এমএসটি লজিস্টিকস লিমিটেডে ৯ হাজার শেয়ার, খান সন্স লিমিটেডে ৯০০ শেয়ার এবং এসএনবি ফুড অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে রয়েছে ৮ হাজার শেয়ার। এ ছাড়াও এমএসটি মেরিন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেডার্স লিমিটেডকে ঋণ বাবদ ২ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ৯৩৩ টাকা এবং মার্কো ট্রেড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড প্লাসকে ব্যবসায়িক মূলধন হিসেবে দিয়েছেন ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৬২৬ টাকা।
এ ছাড়াও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তার মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ৪টি এফডিআরে ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬২৮ টাকা জমা রয়েছে, ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখায় ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার ডিপিএস এবং মিডলাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডে ১২ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৬ টাকার এসডিপিএসসহ স্ত্রী ও নিজের নামে আরও বেশ কয়েকটি এফডিআরও ও ডিপিএস রয়েছে।
যা বলছে টিআইবি: জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, কোনো ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো সংস্থার কর্মকর্তা—যেই-ই হোক না কেন—যদি তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ বা অর্থ থাকে, তাহলে সেটি অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বলেই ধরে নিতে হবে। এবং যেহেতু বলা হচ্ছে, তার শতাধিক এরকম সম্পত্তি রয়েছে, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—অবসরের পর তিনি যে কাজই করে থাকুন না কেন, যদি নিজে ব্যবসা শুরু করে থাকেন, তাহলে সেই ব্যবসার মূলধন কোথা থেকে এসেছে? সেটা কি বৈধ উৎস থেকে, নাকি অবৈধ উৎস থেকে? বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য ছিল কি না—এই বিষয়গুলো সহজেই খতিয়ে দেখা ও চিহ্নিত করে জবাবদিহি করা সম্ভব।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রথম পদক্ষেপ হবে এই বিষয়টি অনুসন্ধান করা—তিনি যে সম্পদের মালিক হয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলো বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি যাচাই করা। এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে বের হয়ে আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় তিনি নিজের পদমর্যাদা বা অবস্থানকে অপব্যবহার করেছেন কি না, কিংবা সেই পদে থেকে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে সম্পদের মালিক হয়েছেন কি না, অর্থ পাচারে জড়িত ছিলেন কি না। এই বিষয়গুলো দ্রুত খতিয়ে দেখা জরুরি। সেজন্য সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত অনতিবিলম্বে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করা, যাতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে আসে।’
অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নওশেরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কালবেলা। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই বলে দাবি করেন তার বিশেষ সহকারী সেলিম রেজা।
তিনি বলেন, ‘স্যার তো এখন অসুস্থ, স্যার কথা বলতে পারবেন না।’ এরপর নওশেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে পাওয়া সব অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে তাকে বক্তব্য এনে দিতে বললে সেলিম রেজা বলেন, ‘আধা ঘণ্টা পরে ফোন দেন।’ সে অনুযায়ী পরে সেলিম রেজার মোবাইল ফোনে ফের কল করা হলে তিনি বলেন, ‘উনি (নওশেরুল ইসলাম) একটা লিজিংয়ের ডিরেক্টর (পরিচালক) ছিল, এটাই ওনার অপরাধ। দুদক এখন যে মামলাগুলো করতেছে, তার সব লিজিংয়ের ডাইরেক্টর হিসেবে। উনি কোনো অর্থ পাচার বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। উনি একজন ব্যবসায়ী।’ এ ছাড়াও নওশেরুল ইসলামের বিপুল পরিমাণে সম্পদ থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেন সেলিম রেজা। তিনি বলেন, ‘ওগুলো সব ভুয়া তথ্য।’