গণঅভ্যুত্থানের প্রায় আড়াই বছরের মাথায় ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকায় বোমাবাজির ঘটনা বেড়ে গেছে। বেশ কিছুদিন ধরে শহরের বিভিন্ন স্থানে রাত কিংবা সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই একের পর এক হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটছে। এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না হলেও আহত হয়েছেন পুলিশ সদস্য ও পথচারী।
নভেম্বরের শুরু থেকে পর পর কয়েক দিনে সংঘটিত এই বিস্ফোরণের ঘটনায় নগরবাসীর মনে নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা খুব দ্রুত মোটরসাইকেলে এসে ককটেল ফুটিয়ে নিমেষেই পালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা এসব বিস্ফোরণের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়েও দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা নিজেদের পরিচয় ঢেকে রাখারও চেষ্টা করে না।
অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে দুটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীকে হাতবোমাসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যে বিশৃঙ্খলা তৈরি ও নাশকতার চেষ্টা চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে সেই বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে।’
তিনি আরও জানান, কেউ নেপথ্যে থেকে কাউকে দিয়ে এসব করাচ্ছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সমন্বয় করে মূল রহস্য উদঘাটনে কাজ করছেন।
ধারাবাহিক বিস্ফোরণের চিত্র
গত এক সপ্তাহে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রামপুরায় বিটিভি ভবনের সামনে, আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে, ধানমন্ডির গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের সামনে, কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড, রমনা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে, শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এলাকা এবং তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন সড়ক।
বুধবার সকালে কুর্মিটোলা আর্মি গলফ ক্লাবের সামনে ছাত্রলীগের একটি মোটরসাইকেল মিছিল থেকে পুলিশের টহল গাড়ি লক্ষ্য করে হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে এক পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ।
এছাড়া বুধবার রাতে পুলিশ মিরপুরের পাইকপাড়া আনসার ক্যাম্প এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ২০টি হাতবোমা উদ্ধার করে উদ্ধারস্থলে নিষ্ক্রিয় করে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে পল্লবীর চলন্তিকা মোড় এলাকায় দুটি বোমার বিস্ফোরণে রমজান ওরফে বাপন নামে এক কুরিয়ারকর্মী দগ্ধ হন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
একই দিন বিকালে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনে মোটরসাইকেলে এসে দুটি ককটেল ফাটায় দুর্বৃত্তরা। রামপুরা থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অপরাধীদের ধরতে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এছাড়া গত সোমবার রাতে ধানমন্ডি ও আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, জড়িতদের পরিচয় তদন্তাধীন রয়েছে।
বেশিরভাগ ঘটনা রাতে ঘটলেও ৩০ অক্টোবর দুপুরে কলাবাগানে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের মাঠসংলগ্ন এলাকায় ৭-৮টি মোটরসাইকেলে এসে ককটেল ফাটায় ১৪-১৫ জনের একটি দল। ধানমন্ডি মডেল থানার ওসি মো. ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব এগিয়ে গেলে তাকে লক্ষ্য করেও বোমা ছোড়া হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শামিনুর রহমান, নেত্রী কামরুননাহার লিপি, যুবলীগ কর্মী মো. নাজমুল হাসান ও মো. বিল্লাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যে উদ্ধার করা হয় ১৩টি হাতবোমা।
একইভাবে রমনা ও তেজগাঁও থানার আওতাধীন এলাকায় বোমাবাজির অভিযোগে আগেও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রমনা মডেল থানার ওসি মো. ইয়াছিন মিয়া জানান, একটি ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। অপরদিকে তেজগাঁও থানার ওসি মো. মুনিরুজ্জামান জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন সড়কে হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন কর্মী নূর নবী, সানাউল্লাহ ও আকাশ আহমেদকে রিমান্ড শেষে জেলে পাঠানো হয়েছে।
শেখ হাসিনার ফেরার সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ভারতে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন।
গত ১০ জুলাই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরে তিনি আইনের মুখোমুখি হবেন এবং জন্মভূমিতে তার মৃত্যু হলেও তা তিনি মেনে নেবেন। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তিনি ফিরবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আইনি দিক থেকে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে উসকানিমূলক বক্তব্য ও অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এছাড়া দুর্নীতি ও আদালত অবমাননার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক সাজা রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও ভারতের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক নয়। তদুপরি, শেখ হাসিনার বর্তমানে কোনো বৈধ পাসপোর্ট নেই। দেশে ফিরতে ট্রাভেল পাস বা ভ্রমণ অনুমতির প্রয়োজন হলেও অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রসঙ্গে গত ২৬ অক্টোবর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির জানান, ‘কে দেশে আসবেন বা কখন আসবেন, সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিবেচ্য বিষয় নয়। পুলিশ সবসময় দেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী নিজ দায়িত্ব পালন করবে।’
রাজধানীর সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।