Image description

পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদন পছন্দ না হলে তার প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য ভুল হলে সংশোধন দাবি করা যায়, প্রতিবাদপত্র পাঠানো যায়, এমনকি আইনগত প্রতিকারও চাওয়া যায়। কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে প্রকাশ্যে সেই পত্রিকার কপি ছিঁড়ে ফেলা কি একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রতিবাদের বিষয়, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন?

৩১ অক্টোবর, শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের ফেসবুক সরাসরি সম্প্রচারে দৈনিক আমার দেশের কপি ছেঁড়ার ঘটনা এই প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে। দুটি প্রতিবেদন নিয়ে নিজের ক্ষোভ জানাতে গিয়ে তিনি পত্রিকাটির কপি ছিঁড়েছেন। তার অভিযোগ, প্রতিবেদন দুটিতে তার সুনাম ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। তবে কোনো সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিকার চাওয়ার যে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত পথ রয়েছে, সেই পথের সঙ্গে প্রকাশ্যে পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার আচরণ এক নয়।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পত্রিকার কপি ছেঁড়া নিজে থেকেই সব পরিস্থিতিতে ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় না। এটি কোথায়, কীভাবে, কী উদ্দেশ্যে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো বেআইনি কাজ যুক্ত ছিল কি না, তার ওপর আইনি প্রশ্ন নির্ভর করে। কিন্তু কোনো সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যখন এমন আচরণ করেন, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার পদমর্যাদা, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং গণমাধ্যমের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও আলোচনায় আসে।

রাশেদ খানের প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত ১৫ অক্টোবর আমার দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সহকারীরা কী করছেন’ শিরোনামের প্রধান প্রতিবেদন এবং ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ‘এক হয়েছেন হাসিনাপুত্র জয় ও কিছু নব্য বিএনপি’ শিরোনামের প্রতিবেদন। দুটি প্রতিবেদনেই তার নাম এসেছে। শনিবারের সরাসরি সম্প্রচারে তিনি দাবি করেন, প্রথম প্রতিবেদনে তাকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, অথচ তার কাজের বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। দ্বিতীয় প্রতিবেদনেও তাকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যুক্ত করার প্রতিবাদ জানান তিনি।

একই সম্প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বৈঠকের অভিযোগও পুনর্ব্যক্ত করেন রাশেদ। তিনি দাবি করেন, এ অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান কিংবা দলটির গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে প্রমাণ দিতে পারবেন। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হলে জামায়াত তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে পারে বলেও চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি আলাদা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে তার আপত্তি থাকলে সেটির নিষ্পত্তিও হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, আদালত অবমাননা, মানহানি ও অপরাধে উসকানির মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমও আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আবার সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করার কারণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখানো কিংবা তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, কোনো সংবাদপত্র বা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। প্রেস কাউন্সিলের নিজস্ব নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, সম্পাদক কিংবা কর্মরত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা যায়। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি নিয়ে কাউন্সিল সতর্ক, তিরস্কার বা নিন্দা জানাতে পারে। জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাকে তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশের নির্দেশও দিতে পারে।

অর্থাৎ কোনো প্রতিবেদনকে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মানহানিকর মনে হলে তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সম্পাদককে প্রতিবাদ পাঠানো, ভুল তথ্যের সংশোধন দাবি করা কিংবা প্রচলিত আইনে আদালতের আশ্রয় নেওয়াও সম্ভব। এসব পথের উদ্দেশ্য হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজন হলে সংশোধন বা প্রতিকার নিশ্চিত করা। পত্রিকার কপি ছিঁড়ে ফেলা সেই প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়।

আইনের একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যও এখানে মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি নিজের কেনা সংবাদপত্র ছিঁড়লে শুধু এ কাজের জন্য তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী বলা যায় না। সংবাদপত্রের কপি ছেঁড়ার সঙ্গে যদি অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করা, কাউকে হুমকি দেওয়া, সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া কিংবা সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মতো ঘটনা যুক্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট আইনের প্রশ্ন আসতে পারে। তাই রাশেদ খানের শনিবারের আচরণকে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সমালোচনা করা এবং সেটিকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করা এক বিষয় নয়।

এ বিষয়ে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর কয়েকটি ধারাও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আইনের ৪২৫ ধারায় অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো সম্পত্তি ধ্বংস করা বা তার মূল্য কিংবা ব্যবহারযোগ্যতা নষ্ট করাকে অনিষ্টসাধন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ৪২৬ ধারায় এর শাস্তির বিধান রয়েছে। আবার ৫০৩ ধারায় কাউকে তার ব্যক্তি, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতির হুমকি দিয়ে ভয় দেখানোকে অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এসব ধারার প্রয়োগের জন্য আইনে বর্ণিত নির্দিষ্ট উপাদান প্রমাণ করতে হবে। নিজের কেনা পত্রিকার কপি ছেঁড়ার ঘটনাতেই এসব অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংঘটিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

রাশেদ খানের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন হলো, তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পদটি কতটা সরকারি পদ এবং তার নিয়োগের ধরন কী, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আচরণবিধি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। বিধিমালার ২৭ বিধিতে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, হয়রানি এবং ক্ষমতার ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।

আবার সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির দায়িত্বশীল আচরণের প্রশ্নটি শুধু চাকরিবিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আচরণ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযম ও জবাবদিহি প্রত্যাশিত। কারণ, সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করার অধিকার যেমন রাজনীতিবিদদের রয়েছে, তেমনি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও সংবাদমাধ্যমের রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনীতিবিদদের প্রকাশ্যে সংবাদপত্র, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা সরকারি নথির কপি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সব কটির আইনি পরিণতি এক রকম ছিল না। কোনো ঘটনায় সংসদে নিন্দা হয়েছে, কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আবার কোনো ঘটনায় আইনি প্রশ্ন উঠলেও মামলা বা শাস্তি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে আলোচিত উদাহরণ। ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্ষিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ শেষ হওয়ার পর পেলোসি তার হাতে থাকা ভাষণের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন। ট্রাম্পের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি কয়েক টুকরা করে কাগজগুলো ছিঁড়েছিলেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ভাষণটির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতেই তিনি এমনটি করেছেন।

ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। ট্রাম্প ও তার সমর্থকেরা পেলোসির বিরুদ্ধে সরকারি নথি ধ্বংসের অভিযোগ তোলেন। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ম্যাট গেটজ তার বিরুদ্ধে নৈতিকতা-সংক্রান্ত তদন্তের দাবিও জানান। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০-এর প্রতিবেদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাক্টচেকবিষয়ক প্রতিষ্ঠান পলিটিফ্যাক্টের অনুসন্ধানে বলা হয়, পেলোসি যে কপিটি ছিঁড়েছিলেন, সেটি ছিল তার হাতে দেওয়া ভাষণের একটি অনুলিপি। সেটি জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত মূল সরকারি নথি ছিল না। ফলে তার বিরুদ্ধে সরকারি নথি ধ্বংসের আইনের প্রয়োগের ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তিনি এ ঘটনার জন্য গ্রেপ্তার হননি বা ফৌজদারি শাস্তির মুখোমুখি হননি।

ভারতের সংসদেও সংবাদপত্রের কপি ছেঁড়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর লোকসভায় ধর্মান্তর নিয়ে বিতর্কের সময় রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সংসদ সদস্য রাজেশ রঞ্জন, যিনি পাপ্পু যাদব নামে পরিচিত, একটি সংবাদপত্র ছিঁড়ে তার টুকরা সংসদের ভেতরে ছুড়ে ফেলেন। কয়েকটি টুকরা লোকসভার ডেপুটি স্পিকারের আসনের কাছেও পড়ে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডেপুটি স্পিকার এম থাম্বিদুরাই তার আচরণের নিন্দা করেন এবং অধিবেশন ১০ মিনিটের জন্য মুলতবি করেন। পরে পাপ্পু যাদব দুঃখ প্রকাশ করেন।

২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিল্লির বিধানসভায় আরেকটি ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণীত তিনটি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার দলের বিধায়কেরা আইনগুলোর মুদ্রিত কপি ছিঁড়ে ফেলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষকদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা এ প্রতিবাদ করেন। বিধানসভায় এ নিয়ে প্রস্তাবও পাস হয়। এটি সংবাদপত্র ছেঁড়ার ঘটনা না হলেও সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নথির কপি ছিঁড়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ জানানোর একটি উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রের পেলোসি কিংবা ভারতের পাপ্পু যাদবের ঘটনাগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, প্রকাশ্যে কাগজ ছেঁড়া রাজনৈতিক প্রতিবাদের বহুল পরিচিত একটি কৌশল হলেও এর আইনগত পরিণতি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, কাগজটির মালিকানা ও প্রকৃতি এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার ওপর। শুধু প্রকাশ্যে কাগজ ছেঁড়ার কারণে সব ক্ষেত্রেই কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না।

অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা সহ্য করতে না পারার কারণে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক আচরণের অভিযোগও আন্তর্জাতিকভাবে নতুন নয়। যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিসমন্ত্রী অলিভার লেটউইনের ঘটনা এখানে কিছুটা ভিন্ন হলেও দায়িত্বশীল ব্যক্তির আচরণ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। ২০১১ সালের ১৪ অক্টোবর স্কাই নিউজ জানায়, লেটউইন লন্ডনের একটি পার্কের ময়লার ঝুড়িতে সরকারি নথি ফেলে দিয়েছিলেন। সেসব নথির মধ্যে সন্ত্রাসবাদবিষয়ক চিঠিপত্র ও সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যও ছিল। নথিগুলো ছিঁড়ে ফেলা হলেও সেগুলো পড়া যাচ্ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি ক্ষমা চান। সরকারও বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তবে সেটি ছিল সরকারি নথি সংরক্ষণ ও দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন, সংবাদপত্রের কপি ছেঁড়ার ঘটনা নয়।

দেশের বর্তমান ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলোর মৌলিক পার্থক্য হলো, রাশেদ খান একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী। তার প্রকাশ্য আচরণকে তাই শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। তিনি যে পত্রিকার প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন, সেই পত্রিকা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে সরাসরি সম্প্রচারে পত্রিকার কপি ছেঁড়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক ব্যবহারকারী তার আচরণের সমালোচনা করছেন। তাদের সমালোচনার মূল বিষয়, সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রতিবেদন পছন্দ না হলে তার জবাব তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেওয়া উচিত। পত্রিকার কপি ছিঁড়ে ক্ষোভ প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রতিবেদনটির তথ্যগত ভুল প্রমাণ করা যায় না। বরং এতে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।

এখানে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। কোনো সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ভুল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিবাদ প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত। সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ দায়িত্বহীনতা নয়। একইভাবে সংবাদমাধ্যমের ভুলের অভিযোগ তুলে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করার অধিকারও কারও নেই।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারের প্রশংসা করা নয়। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত, উপদেষ্টা, সহকারী এবং ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলাও তার দায়িত্বের অংশ। কোনো প্রতিবেদনের কারণে কেউ বিব্রত বা ক্ষুব্ধ হলে তার বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বক্তব্যের সঙ্গে যদি সংবাদপত্রের কপি ছিঁড়ে ফেলার মতো প্রকাশ্য আচরণ যুক্ত হয়, তখন সেটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতেই পারে।

রাশেদ খানের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তথ্য-প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়া। আমার দেশ-এর প্রতিবেদনও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু প্রতিবেদন ভুল হলে তার জবাব হওয়া উচিত প্রতিবাদ, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে। ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের সংযত আচরণই প্রত্যাশিত। কারণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের অধিকার নয়, নাগরিকেরও তথ্য জানার অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের আচরণ ও দায়িত্বশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।