গত সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর একেএম নজরুল ইসলামের কাছে হেরে যান জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক। পরে তাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করেছে সরকার।
সাদুল্লাপুর ও পলাশবাড়ী উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত আসনটিতে সম্প্রতি সারের ডিলার নিয়োগে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের সুপারিশ করা কেউ ডিলারশিপ পাননি। ডিলার নিয়োগের ফল প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সঙ্গে দেখা করেন সংসদ সদস্য। তবে জেলা প্রশাসক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
নজরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘ডিসি চাইলেও অনেক কিছুই করতে পারছেন না। আমার সঙ্গে ভোটে পরাজিত হয়েও ডা. সাদিক জেলা পরিষদের প্রশাসক হওয়ায় তিনি ডিসি, এসপিসহ সরকারি অফিসারদের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। অফিসাররা যেন অসহায়।’
বিএনপির নিয়োগ করা প্রশাসকের চাপে সরকারের মাঠ প্রশাসনের নিরুপায় থাকার বিষয়টি এখন গাইবান্ধায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন দেশের বেশিরভাগ জেলা ও উপজেলার চিত্র।
টাঙ্গাইলের একটি আসনে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন বিএনপির এক বহিষ্কৃত নেতা। পরাজয়ের পর সেই বিএনপি নেতা হয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক। নানা ইস্যুতে সংসদ সদস্য আর জেলা পরিষদ প্রশাসকের দ্বন্দ্বে বেশ চাপের মুখে ছিলেন, সেই নির্বাচনী এলাকার একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। তিনি সম্প্রতি তদবির করে ঢাকায় চলে এসেছেন। এখন তিনি একটি মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিব (পিএস)।
শুধু জেলা-উপজেলা প্রশাসনই নয়- পুলিশের এসপি ও ওসিদের বেলাতেও একই অবস্থা।
অনুসন্ধান বলছে, বিএনপি সরকার গঠনের পর দলীয় নেতাদের সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করায় সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাদের মতবিরোধে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন চরম বেকায়দায়।
বিশেষ করে নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থীরা প্রশাসক পদে নিয়োগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যের সঙ্গে প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে ডিসি, এসপি, ইউএনও এবং থানার ওসিদের ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে।
সুশাসনের জন্যে নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার টাইমসকে বলেন, ‘দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করে বিএনপি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের পাশাপাশি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ৩১ দফা থেকেও সরে এসেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে; যা প্রশাসকদের মাঝে অনুপস্থিত। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।
মূলত হাটবাজার ইজারা, নানা প্রকল্পের বরাদ্দ, খাস জমি ব্যবস্থাপনা, নানা প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টি নিয়েই সংসদ সদস্য ও দলীয় প্রশাসকদের দ্বন্দ্বের বড় কারণ।
অনুসন্ধান বলছে, সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থীরা টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে বসার পর সংসদ সদস্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বে একজন ডিসি এবং পাঁচ ইউএনও বদলির চেষ্টা করছেন। তাদের অনেকে টাইমসের কাছে এর সত্যতা স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে দলীয় প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা একদিকে অবস্থান নেওয়ায় স্বতন্ত্র ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) রাহেদ হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের কেউ ব্যাপক চাপে রয়েছেন এমন তথ্য জানা নেই। তবে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসনকে চলতে হয়, এটি স্বাভাবিক।’
সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারাও বিষয়টিতে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন প্রকাশ্যে হুমকির শিকারও হচ্ছেন। গত ১১ অক্টোবর রংপুর-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ডিসির সভাপতিত্বে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে থানা ও ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা এমপিকে পাত্তা দিচ্ছেন না, হোয়াই? আপনারা কি আসমান বা মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন?’
স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিএনপি সরকার গঠনের পর কয়েক দফায় ৬০টি জেলা পরিষদে ও ১২ সিটি করপোরেশনে দলের নেতাদেরকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানসহ অন্তর্বর্তী পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়।
প্রথম ধাপে নিয়োগ দেওয়া ৪২ জেলা পরিষদে প্রশাসকের ১০ জন এবং সিটি কর্পোরেশনে তিনজন পরাজিত প্রার্থী ছিলেন। জেলা পরিষদে পরবর্তী ধাপের নিয়োগেও কয়েকজন পরাজিত প্রার্থীকে প্রশাসক করা হয়।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে ভোটে পরাজিত হয়েও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
খোদ বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বারবার অভিযোগ করেছেন, মিল্টনের কারণে প্রশাসন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযানে তুলকালাম কাণ্ডের পর নিজের ফেসবুক পোস্টে শফিকুর রহমান বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেন, ‘নিজের সংসদীয় আসনে এই অভিযান চালানোর আগে কিছুই জানানো হয়নি।’
ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার উপর নির্বাচনের পর থেকে তিন দফা হামলার চেষ্টা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সরকারের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে কাজ করতে না পারার কারণে সর্বত্র বাজে অবস্থা বিরাজ করছে। এত দলীয়করণ হলে কোনো সেক্টরে যে স্বাভাবিক অবস্থা থাকে না তার প্রমাণ মিলছে।’
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছে নোয়াখালী-৬ আসনে এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদের কাছে পরাজিত মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীম।
আব্দুল হান্নান মাসুদ টাইমসকে বলেন, ‘শামীমকে অন্য জেলার প্রশাসক নিয়োগ করলেও তিনি আমার এলাকায় ব্যাপক প্রভাব খাটান। এমপি হওয়ার পরও তার লোকজন আমার উপর বারবার হামলা করেছে। কিন্তু শামীমের চাপে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হারুনুর রশীদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের নেতা নূরুল ইসলাম বুলবুলের কাছে বিশাল ভোটের ব্যবধানে হেরেও জেলা পরিষদের প্রশাসক হয়েছেন। সেখানেও চাপে রয়েছে প্রশাসন। তবে, জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী চাপের কথা অস্বীকার করেন।
বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ (সদর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের কাছে পরাজিত হয়ে এখন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।
জাহাঙ্গীর হুসাইন টাইমসকে বলেন, ‘মঞ্জু সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হওয়ায় তার এক ধরনের প্রভাব তৈরি হয়েছে। এমপি হিসেবে যে কাজ আমার করার কথা সেটি পারছি না। এছাড়া সরকারের কর্মকর্তারা অনেকেই চাপের বিষয়টি ফিসফিস করে বললেও মুখ খুলতে পারেন না।’
সাতক্ষীরা-১ আসনে (তালা-কলারোয়া) বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব জামায়াতের ইজ্জত উল্লাহর কাছে পরাজিত হন। এখন তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসক। সাতক্ষীরায় চারটি আসনেই জামায়াতের সংসদ সদস্য।
সরেজমিনে গিয়ে সাতক্ষীরার দুজন ইউএনওর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা বলেন, সম্প্রতি সারের ডিলার নিয়োগে একদিকে সংসদ সদস্য ও অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রশাসকের সর্বোচ্চ চাপ মোকাবিলায় তাদেরকে হিমশিম খেতে হয়েছে।
সরকারের মন্ত্রী-সংসদ সদস্যের প্রশাসনের প্রতি এক ধরনের চাপ থাকলেও এবার দলীয় প্রশাসকদের বাড়তি চাপ যুক্ত হয়েছে।
সরকারি দল-বিরোধী দল-স্বতন্ত্র নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট জেলা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির উপদেষ্টা। তবে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ প্রশাসকদের চাপে ডিসিরা বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন না।
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তাদের অবস্থাও একই। দলীয় প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের দ্বন্দ্বের পাশাপাশি দেশের বেশিরভাগ জায়গায় বিএনপির মধ্যে গ্রুপিং থাকায় এসপি ও ওসিরা অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। ফলে অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
সবশেষ যার উদাহরণ চট্টগ্রাম। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারে গত ৬ অক্টোবর নগরভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমকে বদলি করা হয়। বগা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।