Image description

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ ঘিরে রাজনীতিতে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। নিজ নির্বাচনী এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তাঁর এই পদত্যাগকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন সরকারের কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, অন্যদিকে সামনে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থিতার বিষয়টি।

পদত্যাগের পরও মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতেও তিনি শতভাগ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁর প্রার্থিতার বিষয়ে দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

 

অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক ও স্থানীয় সমর্থন

রাজধানীর চকবাজার, লালবাগ ও বংশালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁরা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

বংশাল এলাকার বাসিন্দা রজব উদ্দিন মিয়া বলেন, মাদকের আখড়াগুলো এলাকার তরুণদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এসব কর্মকাণ্ডে প্রশ্রয় দিতেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘ইশরাক তো ভালোই করেছে।’ তবে চকবাজারের ব্যবসায়ী সাহেদ খানের মতে, অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শন করা ঠিক হয়নি। তা সত্ত্বেও মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ইশরাকের অনুসারীরা তাঁর মাদকবিরোধী অবস্থানকে সমর্থন করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সদস্যসচিব রহিম ভূঁইয়া বলেন, ইশরাকের নেতৃত্বে তাঁরা দীর্ঘদিন রাজপথে সংগ্রাম করেছেন এবং মাদকের বিরুদ্ধে তাঁদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

অবশ্য মাদকবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য এবং আইন প্রয়োগের পদ্ধতি—দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখার অবকাশ রয়েছে। জনসমর্থন থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

 

মেয়র পদে প্রার্থিতা নিয়ে গুঞ্জন

ইশরাকের পদত্যাগের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পরও তাঁকে সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একাংশ মনে করেন, পুরান ঢাকায় ইশরাকের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও রাজনৈতিক ভিত্তি তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রাখবে। সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে হিসেবে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ও তাঁর পক্ষে কাজ করতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সাংগঠনিক অবস্থান, নির্বাচনী সক্ষমতা এবং হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রের দাবি, বর্তমান সিটি করপোরেশন প্রশাসকদের মধ্য থেকেই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালামও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত পাওয়ার কথা একাধিকবার স্ট্রিমকে নিশ্চিত করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আব্দুস সালামের পাশাপাশি ইশরাক হোসেনের নাম ঘিরে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর মতে, দক্ষিণ সিটিতে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থানও নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের একাংশের ধারণা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ইশরাককে প্রার্থী করা হলে বিএনপি স্থানীয় পরিচিতির পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্বকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে।

তবে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী এবং বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এসব আলোচনা এখনো রাজনৈতিক মহলের ধারণা ও দলীয় পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক হিসাব-নিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্বাচনী সমীকরণ বদলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

সুশাসনের প্রশ্নে ছাড় নয়: বিএনপি

ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা বিএনপির ভেতরে দলীয় শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও সরকারের অবস্থান নিয়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল স্ট্রিমকে বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলাজনিত বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, সংরক্ষিত কোটার একজন নারী সংসদ সদস্যকে ছাড় দেওয়া হয়নি। একইভাবে একজন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া হয়নি, যদিও তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের দলের প্রতি বড় অবদান রয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত দুই রাজনীতিবিদের পদত্যাগের ফলে মাঠের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলাল বলেন, এসব ঘটনায় নেতা-কর্মীরা সাময়িকভাবে হতাশ বা কষ্ট পেতে পারেন। তবে গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চার জন্য সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে মানুষের আন্দোলন, অভ্যুত্থান ও আত্মত্যাগের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।