মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে নতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগকারী ইশরাক হোসেন।
নিজের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের নিয়ম ও শর্ত ভঙ্গ করলেও তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ। এমনকি ঘটনা তদন্তে নামা পুলিশ কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না।
অথচ ইশরাকের নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতেই নিয়ম ভঙের স্পষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে। দেশের প্রচলিত অস্ত্র আইন ও সরকারি নীতি অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে তার অন্তত ছয় মাসের জেল হতে পারে। পাশাপাশি তার অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল এবং সেটি বাজেয়াপ্ত করারও সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ভিডিওতে তার যে সহযোগীর হাতে রাইফেল দেখা গেছে, ওই ব্যক্তির নিজস্ব লাইসেন্স না থাকলে তার সর্বনিম্ন সাত বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে ইশরাক ও তার এক সহযোগী হাতে পিস্তল নিয়ে দৌড় দিচ্ছেন। তারা অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার জন্য চিৎকারও করছেন। তবে সেখানে তাদের ওপর হামলা বা আক্রমণের কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে ইশরাক দাবি করেন, যে এলাকায় তিনি অভিযান চালিয়েছেন, সেখানে আগে পুলিশ আক্রান্ত হয়েছিল এবং গুলি চলেছিল। সে কারণেই তিনি সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে ভিডিওতে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি জানান, লাইসেন্স করা অস্ত্র এভাবে সরাসরি কারও দিকে তাক করা যায় না। ইশরাক অস্ত্রের শর্ত ভেঙেছেন। যার নামে অস্ত্রের লাইসেন্স, তিনি চাইলেই সেটি অন্য কাউকে দিতে পারেন না। লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ চাইলে এ জন্য তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারে।
নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স করা অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার জন্যই ব্যবহার করা যায়। মানুষকে ভয় দেখানো বা বিরক্ত করার জন্য এটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। অস্ত্র আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্সের শর্ত ভাঙলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এর সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল, ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অভিযানের সময় পাশের এক ভবনের ছাদে রাইফেল হাতে এক তরুণকেও দেখা যায়। সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক দাবি করেন, ওই রাইফেলটিও লাইসেন্স করা। তবে এটি কোন মডেলের, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এ বিষয়ে কথা বলতে তাকে ফোন করা হলে তিনি কেটে দেন। তার জনসংযোগ কর্মকর্তার নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারেন—একটি পিস্তল বা রিভলবার এবং অন্যটি শটগান বা রাইফেল। তবে পয়েন্ট টুটু বোর ছাড়া অন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল কেনার নিয়ম নেই।
পাভেল সিকদার নামের ওই তরুণের হাতে দেখা যাওয়া অস্ত্রটিকে অনেকে অ্যাসল্ট রাইফেল বলে দাবি করেন। তবে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এটি অ্যাসল্ট রাইফেল নয়। পরে পুরানা পল্টনের একটি অস্ত্র দোকানের মালিক মোকাররম হোসেন খান নিশ্চিত করেন, এটি পয়েন্ট টুটু বোরের রাইফেল, যা বাংলাদেশে বৈধভাবে লাইসেন্স নিয়ে রাখা যায়।
তবে অস্ত্রটি বৈধ হলেও তা অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া আইনত অপরাধ। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে অস্ত্র হস্তান্তরের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম জানান, একজনের বৈধ অস্ত্র আরেকজন ব্যবহার করলে সেটি আর বৈধ থাকে না। অস্ত্র আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী এটি গুরুতর অপরাধ, যার জন্য সর্বনিম্ন সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
অস্ত্রের শর্ত ভঙের কারণে ইশরাকের লাইসেন্স বাতিল এবং তার অস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত করারও সুযোগ রয়েছে।
এ ঘটনার পরদিন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি তদন্তের জন্য ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনে অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্তের অগ্রগতি জানতে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি।
ভিডিওর মতো স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এ ঘটনায় যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের ভরসা উঠে যাবে।
একই সঙ্গে পুলিশের ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ঘটনাটি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। অস্ত্র হাতে থাকা ব্যক্তিকে যদি ঘটনাস্থল থেকেই ধরা হতো, তবে সরাসরি মামলা করা যেত। এতদিন পর শুধু ছবি বা ভিডিও দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।