মাইক্রোফোন মুখের সামনে ঠেলে ধরতেই গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নিজেদের বক্তব্য দিতে শুরু করেন তরুণেরা। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই তাদের নিয়ে দ্রুত ছুটে যায় পুলিশের ভ্যান। একজন তরুণ যেন পরিস্থিতিকে নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়ে বললেন, “এখন প্রতিবাদ করার একমাত্র উপায় হলো, গিয়ে আটক হওয়া।”
১০ অক্টোবর দিল্লির আকাশে উড়ছিল ড্রোন। নিচে অস্বাভাবিক নীরব শহরের রাস্তায় টহল দিচ্ছিলেন হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী। রাজধানীর কিছু এলাকা প্রায় জনশূন্য। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক অভিযান দেখল ভারতীয় রাজধানী।
ক্ষমতায় ১২ বছর কাটানোর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে। দমন-পীড়নের কৌশলও যাদের দমাতে পারছে না।
গত জুলাইয়ে নতুন গড়ে ওঠা তরুণদের আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের দুরবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করে। শেষ পর্যন্ত তাদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী। মিম আর প্ল্যাকার্ডে প্রকাশ্যে বিদ্রূপের শিকার হন নরেন্দ্র মোদি। তার জন্য যা ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। কারণ, এই তরুণদের বড় একটি অংশ অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় দেখেইনি।
এবার ভোটব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনরোষের ঢেউয়ে ভর করে মাঠে নেমেছে সিজেপি। দলটির অভিযোগ, ভোটব্যবস্থায় কারচুপি হচ্ছে।
তবে এবার বিক্ষোভ মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল কর্তৃপক্ষ। দিল্লিতে নির্ধারিত সমাবেশে নেতৃত্ব দিতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিমানবন্দরে নামতেই তাদের তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা-ও জানানো হয়নি।
সেদিন আটক হওয়া প্রায় পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারীর অধিকাংশই রাতের মধ্যে মুক্তি পান। কিন্তু এই তিন ‘ককরোচকে’ আটকে রাখা হয় ২৪ ঘণ্টা।
মধ্য দিল্লির পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল, অবরুদ্ধ কোনো শহর। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল প্রবেশপথগুলো, ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটানো হয়, তালাবদ্ধ রাখা হয় মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন। লাউডস্পিকারে বারবার প্রচার করা হচ্ছিল সতর্কবার্তা।
পুলিশের মারধরে আহত হন বিরোধী দলের নেতারা। কিছুক্ষণের জন্য আটক করা হয় সাংবাদিক ও আইনজীবীদেরও। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট বিক্ষোভ শুরু হচ্ছিল অনেকটা হঠাৎ করে গড়ে ওঠা জনসমাবেশের মতো। কিন্তু লাঠি হাতে পুলিশ এসে সেগুলো ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছিল।
২২ বছর বয়সী মহক বলেন, “ওরা আমাদের এমনভাবে তাড়া করছিল, যেন আমরা ইঁদুর।” তিন ঘণ্টা পুলিশের ভ্যানে আটকে থাকতে হয়েছিল তাকে। এ সময় পুলিশ তাকে ‘দেশবিরোধী’ বলে আখ্যা দেয়। আবার বিক্ষোভে অংশ নিলে তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

সপ্তাহান্তে ‘ককরোচ’ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের দমন করা হলেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। ১২ অক্টোবর ভারতের আনুষ্ঠানিক বিরোধী জোট কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে একটি পদযাত্রার আয়োজন করে। এতে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। সামনে আরও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবিও স্পষ্ট। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ভোটার যাচাই অভিযান বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে সেই আইনও প্রত্যাহার করতে হবে, যার ফলে কার্যত নরেন্দ্র মোদি তাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
গত এক বছরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইএর) অভিযানে বাদ পড়েছে ১৩ কোটিরও বেশি নাম। এর মধ্যে অনেক নাম বাদ দেওয়া হয়েছে যথার্থ কারণেই, কারণ সেগুলো ছিল একই ব্যক্তির একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম কিংবা মৃত ব্যক্তিদের নাম। কিন্তু বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়েছে ভুলভাবে।
সরকারের মতো নির্বাচন কমিশনও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর দাবি, পুলিশি অনুমতি না পাওয়া এই বিক্ষোভ বারবার নির্বাচনে পরাজিত হওয়া ব্যক্তিদের লোকদেখানো কৌশল। ১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জরুরি অবস্থা জারি করে গণতন্ত্র স্থগিত করার ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাও নাকচ করেছেন তিনি। তার ভাষায়, “এটি জরুরি অবস্থা নয়, এটি স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।”
দীর্ঘদিন ধরে কার্যত নিষ্ক্রিয় ভারতের বিরোধী শিবিরের কাছে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে আয়োজিত এসব সমাবেশ গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র রক্ষার লড়াই। অনেক বিক্ষোভকারী ক্ষুব্ধ, কারণ তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে তারা মনে করেন। আর অন্যরা হাতে সংবিধানের কপি নিয়ে তাদের পক্ষে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
তবে এসব পদযাত্রায় প্রকাশ পাচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে জমে থাকা আরও বিস্তৃত অসন্তোষও। সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষেরা কথা বলছেন শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগের কথা।
এ বছরের বিক্ষোভ থেকে উঠে এসেছেন মহকের মতো নতুন এক প্রজন্মের নাগরিক। গভীর রাতে ইনস্টাগ্রামে একের পর এক পোস্ট দেখতে দেখতে আকস্মিকভাবেই সিজেপির সন্ধান পান তিনি। জুলাইয়ে দলটির সমাবেশ দেখতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতের শিকার হন মহক। ততদিনে সরকার একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমালোচক তৈরি করে ফেলেছে।
মহক বলেন, “ঘটনাটি আমাকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছে। এখন আমি কোনো একটি সংগঠনে যোগ দেব এবং আন্দোলন সংগঠিত করতে শুরু করব।”

নতুন গড়ে ওঠা ‘ককরোচ’ আন্দোলন এবং ভারতের প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলো, উভয় পক্ষই নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং আপাতত তার পাশে থাকা প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনের কারণে জ্ঞানেশ কুমারকে কার্যত পদ থেকে সরানো কঠিন।
‘ককরোচ’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের কাছে বিক্ষোভ দমনে সরকারের এই তৎপরতা ইঙ্গিত দেয়, তাদের আড়াল করার মতো কিছু রয়েছে। দীপকে বলেন, “একজন জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজেদের দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালাচ্ছেন।”
তবে বিরোধী দলগুলোর বড় লক্ষ্য ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচন। রাহুল গান্ধীর এক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার যুক্তি, “মানুষ অবশেষে বুঝতে পারছে, বিজেপি কীভাবে নির্বাচন চুরি করছে।”
বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ক্ষুব্ধ ভোটারদের সংগঠিত করার বিষয়ে তিনি আশাবাদী। তার মতে, ২০১৪ সালের পর আর কখনোই তিনি এ নিয়ে এতটা আশাবাদী ছিলেন না। আর জনবিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে তার এই আশাবাদ আরও বাড়বে বলেই মনে করেন তিনি।
(লেখাটি দ্য ইকোনমিস্টের সৌজন্যে প্রকাশিত)