ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দলের ভেতরে শুরু হয়েছে নানা সমীকরণ বিশ্লেষণ। গুরুত্বপূর্ণ এ সাংগঠনিক ইউনিটের নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের কার্যক্রম চলছে। কমিটিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত নতুন, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত নেতৃত্বের সমন্বয় করার পরিকল্পনা করছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম। সম্প্রতি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও দলীয় শৃঙ্খলাজনিত কারণে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল এবং মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র জানা যায়, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাদের ভূমিকা, ত্যাগ, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা ও ক্লিন ইমেজকে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে সরকার গঠনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে যাতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়ে এবার বাড়তি সতর্কতা রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আমার দেশকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। যেহেতু পূর্বের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে, শিগগির নতুন কমিটি গঠন করা হবে। কীভাবে কমিটি দেওয়া হবে, সেটা পার্টি সিদ্ধান্ত দেবে।’
দলটির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, শিগগির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন করা হতে পারে। কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে হবে নাকি কেন্দ্র থেকে সরাসরি ঘোষণা করা হবে—সে সিদ্ধান্ত নেবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম। তবে নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞ সাবেক ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভোটাধিকার আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ঢাকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মহানগর উত্তর বিএনপির নিচের সারির কিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার কারণে আগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পাশাপাশি দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতাকেও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি রয়েছে দলের ভেতরে।
আলোচনায় আমিনুল ও জাহাঙ্গীর
নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমিনুল হক। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন। পাশাপাশি শীর্ষ নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, ড. এমএ কাইয়ুম, মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব ও আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা আমিনুল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর যুব প্রশিক্ষণ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্টেডিয়াম ও মিনি মাঠ নির্মাণ, খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়া কার্ড এবং মাদকমুক্ত যুবসমাজ গঠনে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছেন তিনি। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজনের মাধ্যমেও দেশব্যাপী সাড়া জাগিয়েছে তার উদ্যোগ।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে আমিনুলের দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও আলোচনায় আসছে। ২০২১ সালের ২ আগস্ট গঠিত ৪৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান। তখন আহ্বায়ক ছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নীরব আহ্বায়ক হলে আমিনুল আবারও সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ৪ নভেম্বর ঘোষিত আংশিক আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে আহ্বায়ক করা হয়।
মহানগর উত্তরের নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, আমিনুল দায়িত্বে থাকার সময় সিনিয়র-জুনিয়র নেতাদের ঐক্যবদ্ধ রেখে মাঠের আন্দোলনে সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সংগঠনকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠন শক্তিশালী করতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন বলেও তাদের মত।
তৃণমূলের নেতারা তার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভূমিকাও সামনে আনছেন। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমিনুল ৪২টি মামলায় চারবার কারাবরণ করেন। একাধিকবার রিমান্ডে নির্যাতনের শিকারও হন তিনি। ফলে নতুন কমিটি গঠনের সময় তার ত্যাগ ও রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক আমার দেশকে বলেন, ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের পর থেকে আমিনুল সিনিয়র-জুনিয়র নেতাদের একসঙ্গে রেখে যেভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় রেখেছেন, অতীতের কোনো নেতৃত্ব তা পারেনি। সে বিবেচনায় নতুন কমিটিতে আমিনুল পুনর্বিবেচনার দাবিদার।
বাড্ডা থানা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বাবু বলেন, বিগত সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের দিয়েই কমিটি হওয়া প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লবসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা মহানগরকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পেছনে আমিনুলের বড় ভূমিকা ছিল। সভাপতি হিসেবে তাকে পেলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা খুশি হবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা জাহাঙ্গীর হোসেনেরও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। ১৯৯০ সালে তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব, পরে সাধারণ সম্পাদক এবং কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকার কারণে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও কারাবাসের শিকার হন।
শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সভাপতি নীরবও। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় তাকে প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার করা হয়। এখনো দলে ফিরতে পারেননি তিনি। এরপরও দলীয় আনুগত্য, জনপ্রিয়তা, সক্রিয় রাজনীতি ও দুর্দিনে ভূমিকার কারণে শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে তাকে দেখা যেতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে।
তৃণমূলের চাওয়া ‘ত্যাগী নেতৃত্ব’
নতুন কমিটি নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, মামলা-হামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন, তাদের মূল্যায়নের দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম নেতাদের নেতৃত্বে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
এ কারণে নতুন কমিটিতে শুধু পুরোনো ও অভিজ্ঞদের ওপর নির্ভর না করে নতুন প্রজন্মের দক্ষ নেতাদেরও জায়গা দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিলে তৃণমূলে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আবার শুধু পুরোনো নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগঠনের সমন্বয় কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন-পুরোনোদের ভারসাম্য রেখেই কমিটি গঠনের সম্ভাবনা বেশি।