বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচিত একটি শব্দ হচ্ছে ডিসেম্বর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় বাংলাদেশ তো বটেই—পৃথিবীর অনেক দেশের বাঙালি কমিউনিটিতে ‘কী হবে ডিসেম্বরে’ এমন কৌতূহল খুবই কমন। বিষয়টি এতটাই ট্রেন্ডিং বা ভাইব যে, ‘কেন বাংলাদেশ পলিটিক্সের কারেন্ট মেইন ক্যারেক্টার ডিসেম্বর’—এ প্রশ্ন তোলাও অবান্তর। এই আগুনে ঘি ঢেলেছে বিরোধী দল। তারাও ডিসেম্বরের মধ্যে কঠোর আন্দোলনের কথা বলছে। এদিকে তরতরিয়ে গজিয়ে যাচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণের নামে নানা গুজবের ডালপালা। আর বাঙালির সহজাত প্রবৃত্তির অংশ হিসেবে ধীরে ধীরে বাড়ছে উত্তেজনা। বর্ষা কাটিয়ে শরতে পা ফেলা ষড়ঋতুর এই দেশের রাজনীতির আকাশে ঘটছে উষ্ণায়ন। তাই ডিসেম্বরের ভরা শীতে রাজনৈতিক অঙ্গন কতটা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকবে কিংবা সেই কুয়াশার আড়ালে কী ঘটবে—সে প্রশ্নের উত্তরই হবে ইতিহাসের আরেকটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।
শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’ নিয়ে খবর যেমন ট্রেন্ডিংয়ে, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে বিরোধী দলের আন্দোলন ইস্যু। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা বলছেন তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের কেউ কেউ সরকারকে ডিসেম্বর ডেটলাইন দিচ্ছেন। হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ও বিরোধী দলের সরকারবিরোধী কঠোর হুঁশিয়ারিকে অনেকে কাকতালীয় হিসেবে মানতে চাইছেন না। তারা মনে করছেন এসবের পেছনে হয়তো কোনো যোগসূত্র রয়েছে। কিছু রাজনৈতিক শক্তি ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামারও প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। সেক্ষেত্রে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের মতো রাজনৈতিক সমীকরণের কথাও বলা হচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘জোট’ প্রসঙ্গে জামায়াতের দিকে আঙুল তুলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সরকারের একাধিক মন্ত্রী প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন? বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অবশ্য বলছে, পতিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের আঁতাতের কোনো সুযোগ নেই। অতীতে যা হয়েছে, তা ওই সময়ের বাস্তবতায় হয়েছে। তা ছাড়া বিএনপির সঙ্গেও তো জামায়াতের জোট হয়েছিল। এভাবে বক্তব্য-বিবৃতির মধ্য দিয়েই রাজনীতিতে নতুন করে তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা।
সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলছেন, শেখ হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে। দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আর কেউ আন্দোলনের নামে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, সেটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তা দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে। কাজেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার অনুপস্থিতিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইন অনুযায়ী আপিলের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তার সেই সুযোগও নেই। তার দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এ পরিস্থিতির মাঝেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
এদিকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আপিল করারও সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আপনারা খেয়াল করেছেন আইসিটির আমাদের চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, তার এখন আর আপিল করারও সুযোগ নেই। উনি এসে আপিল করে যে বিচার হয়েছে, সেটা পুনর্বিবেচনা করাবেন, সে সময়ও নেই। তার মানে ব্যাপারটি টেকনিক্যালি এখন এরকম—তিনি আসবেন এবং তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে, এখন আমরা তাকে ধরে আনতে চাই।’
সরকারের এমন অবস্থানের মধ্যেই দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। এমনকি তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদেরও তিনি দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি সত্যিই প্রত্যাবর্তন করবেন? নাকি তাকে ভারত প্রত্যর্পণ করবে? প্রত্যাবর্তন কিংবা প্রত্যর্পণ যেটিই হোক—তার প্রক্রিয়া কী হবে, সেটি নিয়েও চলছে নানামুখী আলোচনা। অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকার ভারতের কাছে বারবার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি। আবার শেখ হাসিনা সত্যিই যদি ফিরতে চান, তাহলে কীভাবে ইমিগ্রেশন পার হবেন, সে বিষয়টিও পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে না। ফলে দিন দিন এসব নিয়ে তৈরি হচ্ছে ধূম্রজাল।
জানা যায়, পলাতক শেখ হাসিনার পাসপোর্ট বাতিল করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে তাকে দেশে ফিরতে হলে ট্রাভেল পাস লাগবে, নয়তো জোর করে আসতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা ট্রাভেল পাসের আবেদন করেছেন, নাকি করেননি? তা ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ট্রাভেল পাস দেবে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেইসঙ্গে শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের নেতারা বলছেন, সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবেন। তারা ছয় দফাকে একদফায় পরিণত করবেন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ নিজেও সরকারকে হুঁশিয়ারি ও সতর্ক করেছেন। সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রামে এক সভায় বলেছেন, ‘মানুষের মুখে মুখে উঠেছে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে।’ এমন অবস্থায় সব মিলিয়ে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর দেশের রাজনীতির জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হাসিনার ফেরা ও ট্রাভেল পাস সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা এখনো দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাসের আবেদন করেননি। দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র বলছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয় এবং বর্তমানে তার কাছে কোনো বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। এ অবস্থায় দেশে ফিরতে হলে তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পাস (ট্রাভেল পারমিট বা ইমার্জেন্সি ট্রাভেল ডকুমেন্ট) নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেহেতু তার বৈধ পাসপোর্ট নেই, তাই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হলে ট্রাভেল পাস অপরিহার্য। এটি ছাড়া বিমানবন্দরে বা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। তবে একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরা তার অধিকার। সে ক্ষেত্রে পাসপোর্ট না থাকলেও সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশন থেকে ট্রাভেল পাস চেয়ে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
ট্রাভেল পাস হলো একটি সাময়িক ও একমুখী ভ্রমণ দলিল। এটি পাসপোর্টের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এর ব্যবহার অনেক সীমিত। মূলত যাদের পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে বা কোনো কারণে নেই—তাদের শুধু বাংলাদেশে ফিরে আসার অনুমতি দেয় এই ট্রাভেল পাস। এটি সাধারণত তিন মাসের জন্য বৈধ থাকে। এর ওপর কোনো বিদেশি ভিসা লাগে না এবং এটি দিয়ে অন্য কোনো দেশে যাওয়া যায় না। দেশে পৌঁছানোর পর ইমিগ্রেশনে জমা দিতে হয় এবং পরে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়। বিদেশে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ হাইকমিশন, এমবাসি বা কনস্যুলেটে এ-সংক্রান্ত আবেদন করতে পারেন।
আইনজীবীদের কেউ কেউ বলছেন, সাজাপ্রাপ্ত বা পলাতক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষ রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত ছাড়া ট্রাভেল পাস ইস্যু করা দুরূহ। ফলে ট্রাভেল পাস ছাড়া কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনা সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে ভারত এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সরাসরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করেনি। ভারত থেকে কোনো বিকল্প ব্যবস্থাপনায় তিনি ফিরবেন নাকি নিজস্ব উদ্যোগে ফিরবেন, তা নিয়েও দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে। বরং কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করবে না।
দেশে ফিরলে নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা দেশে পা রাখলে তার নিরাপত্তা রক্ষা এবং আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বেশ কয়েকটি মামলায় সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মনোভাব অনুযায়ী, দেশে ফিরলেই তাকে তাৎক্ষণিক আইনের আওতায় আনা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ফলে কারাবন্দি অবস্থায় বা বিচার প্রক্রিয়ার সময় তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হবে।
হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। যে কোনোভাবে বাংলাদেশে ফিরলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রথমেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে। এরপর জেলহাজতে গিয়ে তিনি যদি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আপিল করেন, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু শেখ হাসিনা আদৌ আসবেন কি না বা আপিল করবেন কিনা—সেসবের তেমন নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে পা রাখলেও প্রসিকিউশনের কিছু করা লাগবে না। কেননা তার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মামলাটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১-এর ৩ ধারায় বলা আছে, যে কোনো রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আসামি নিজেই আপিল করতে পারবেন। যেহেতু শেখ হাসিনা এ সময়ের মধ্যে আপিল করেননি, সেহেতু আর করতে পারবেন না। এরপরও যদি দেশে এসে আপিল করেন, তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেভাবেই হবে। তবে আপাতত আপিল করার আইনগত সুযোগ নেই তার। আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনের চোখে শেখ হাসিনা পলাতক থাকলেও তিনি ভারতের আশ্রয়ে ভারত সরকারের অধীনে জীবনযাপন করছেন। সেখানে পলাতক নন। যদিও আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। এ কারণে তাকে ফেরত বা হস্তান্তরের জন্য এরই মধ্যে ভারত সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই ভারত হস্তান্তর না করলে তার কোনোভাবেই আসা সম্ভব নয়।
কী বলা আছে আইনে? আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দিলে তিনি অধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। একইভাবে সরকার বা ক্ষেত্র অনুসারে অভিযোগকারীও খালাসের আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার রাখেন। রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে এ আপিল করতে হবে। এই সময়সীমা অতিক্রম হওয়ার পর আর কোনো আপিল করা যাবে না। আপিল দাখিল হওয়ার পর তা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ছাড়া আপিল করার সময় আপিলকারী যে নথিপত্রের ওপর নির্ভর করবেন, সেগুলোও দাখিল করতে হবে বলে আইনে স্পষ্টভাবে লেখা আছে। এ আইনের ২১ ধারায় ৩০ দিনের সময়সীমা অতিক্রমের পর বিলম্ব মার্জনা করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে কোনো পৃথক বিধান উল্লেখ নেই। এ কারণেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে প্রশ্ন আদালতের বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তাহলে বিকল্প কী সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, শেখ হাসিনা আপিল ফাইল করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারবেন। কিন্তু গ্রহণ হবে কি না, তা শুনানির সময় বলা যাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনটি একটি বিশেষ আইন। এই আইনানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে হয়। অন্যথায় আর কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারায় (কোয়াশমেন্ট) আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল হওয়ায় এ ধরনের আবেদনের সুযোগ নেই। সুতরাং বিশেষ আইনে আপিলে বিলম্ব বা তামাদি কখনও মার্জনা করা যায় না। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটি আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনের মতে- রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে শেখ হাসিনার আইনজীবীদের নির্ধারিত সময় অতিক্রমের কারণ আদালতের সামনে তুলে ধরতে হবে। আদালত যদি বিলম্ব মার্জনার আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিলের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। অর্থাৎ বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আপিলের অনুমতি মিলেছে। শেখ হাসিনারও যুক্তি থাকতে পারে যে, তিনি বিদেশে পলাতক। এক্ষেত্রে প্রথমে কনডোনেশন অব ডিলে তথা বিলম্ব মার্জনা বা নির্ধারিত সময় পার হওয়ার যথাযথ কারণ দেখিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদনে সন্তোষজনক হলে আদালত গ্রহণ করতেও পারেন।
বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে নানা প্রশ্ন এদিকে গণভোট বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে দেশজুড়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এর মধ্যে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ করা হয়েছে। ডিসেম্বরে রাজনৈতিক উত্তেজনার আরেকটি অনুষঙ্গ হচ্ছে বিরোধী দলের আন্দোলন। শেখ হাসিনার ফেরা-সংক্রান্ত খবরের পাশাপাশি বর্তমান সরকারকে রাজপথের দিক থেকেও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘৬ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এই লংমার্চ দেশের সব বিভাগীয় শহরে যাবে। সরকার এসব দাবি মেনে না নিলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের আন্দোলন সফল করেই আমরা ঘরে ফিরব।’ সরকারের ছয় মাসের মাথায় বিরোধী রাজনৈতিক জোটের এমন কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই এ আন্দোলনের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গের যোগসাজোশ খুঁজছেন।
জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের গঠিত নির্বাচনি ঐক্য ঘোষণা দিয়েছে যে, তাদের দাবি না মানলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পতনের আন্দোলন সফল করবে। তাদের পূর্বঘোষিত '৬ দফা' দাবিকে পরিবর্তন করে '১ দফা' বা সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় সরকারি মহলে প্রশ্ন উঠছে যে, তাহলে কী তলে তলে আবারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে জামায়াতে ইসলামী? অতীতে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তারা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে নামে।
এদিকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাবেক চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের মুখে মুখে উঠেছে যে, ডিসেম্বরের মধ্যেই এই সরকার পড়ে যাবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এমন একই সুর রাজনৈতিক উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার খবর, ট্রাভেল পাস-সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটে থাকা ১১ দলের সরকার সরানোর একদফা আন্দোলন—এই সবকটি ইস্যু একত্রিত হয়ে আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কী বলছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গ ও বিরোধী দলের হুঁশিয়ারি বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি কালবেলাকে বলেন, আজকে বিরোধী দল যেভাবে লংমার্চসহ অন্যান্য কর্মসূচি করছে, তা সম্পূর্ণরূপে ফ্যাসিবাদী কালচার। ফ্যাসিবাদও এতো সাহস পায়নি যে সাহস আজ তারা দেখাচ্ছে। ১৯৮৬ সালেও তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বৈরাচারকে আশ্রয় দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৭৩ দিন হরতাল-অবরোধ ডেকে জাতিকে কষ্ট দিয়েছে। আসলে এদের সঙ্গে ওই পাড়ের একটা যোগসূত্র আছে। যোগসূত্র আছে বলেই সেখান থেকে বলা হচ্ছে—ডিসেম্বরে আসবে। এরাও বলছে—নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনে নামবে। এমনকি এক দফার আন্দোলন করতে দ্বিধা করবে না। তাহলে এটা কি যোগসূত্র নয়? তিনি আরও বলেন, আপনারা সংসদে একরকম কথা বলবেন আবার বাইরে এসে একাত্তরের রূপ ধারণ করবেন ওই পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষ আর মেনে নেবে না। সেই সুযোগও আমরা দেব না।
কী বলছে জামায়াত বিএনপি নেতা শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির এমন অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘প্রথমত, আমরা কখনো ডিসেম্বরে সরকার পতনের কথা বলিনি। এ্যানি সাহেব যদি বলে থাকেন তাহলে সেটি অসত্য তথ্য। জামায়াতের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা যদি এই কথা বলে থাকে, তাহলে উনাকে (এ্যানি) প্রমাণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা কখনোই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত হইনি। ৮৬ সালে আমরা কারও সঙ্গে জোট করিনি; বরং ৯১-তে আমরা বিএনপির সঙ্গে থেকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছি।’
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ’৮৬ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে এককজনের একেক কৌশল ছিল। আন্দোলনের কৌশল হিসেবে ওই সময়ের রাজনীতিতে দুটি ধারা ছিল। কেউ বলেছিল পার্লামেন্টে না গিয়ে আন্দোলন করব। কেউ বলেছিল যে, পার্লামেন্টের ভেতরে বাইরে দুই জায়গায় আন্দোলন চলবে। জামায়াত সেই আন্দোলন করেছে। পার্লামেন্টে গিয়েই পার্লামেন্ট থেকে প্রথম ১০ জন এমপি রিজাইন (পদত্যাগ) করি। এই রিজাইনের পরই এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে চলে গেল। তারপর আওয়ামী লীগসহ সবাই সংসদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হলো। এভাবে দুই ধারার সবাই চেয়েছিল এরশাদের পতন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কখনো জোট করিনি। এটা তো ঠিক নয়। রাজনীতির ময়দানে আন্দোলন করতে গেলে অনেকের সঙ্গে অনেকের লিয়াজোঁ থাকে, যোগাযোগ থাকে, কর্মসূচি থাকে। এটা সবার সঙ্গেই ছিল। বিএনপির সঙ্গেও ছিল। ফলে এগুলো হচ্ছে এ্যানি সাহেবদের জামায়াতের বিরুদ্ধে কিছু বলার থাকলে ‘নাই কাজ তো খৈ ভাজ’ এটাই চলতেছে।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি তিনি ফেরেন তখন দেখা যাবে। তবে আমার মনে হয় যে, এগুলো হচ্ছে (দেশে ফেরার কথা) দলটাকে ঠিক রেখে কর্মীদের বাঁচাতে হবে তো। জীবন্ত মানুষ যখন কিছু ধরতে না পারে শ্যাওলা পাইলেও সেটা ধরে। দলকে বাঁচিয়ে রাখার, জাগিয়ে রাখার কিছু কৌশল আওয়ামী লীগের হতে পারে আপাতত। দেখা যাক, সময় কথা বলবে।