বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। তার মতে, বেসরকারি কোম্পানির হাতে বিদ্যুৎ বিতরণ গেলে গ্রাহকের সামনে বিকল্প সরবরাহকারী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ফলে ন্যায্য দাম ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা বলেছেন, সরকার বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর অর্থ হলো, কোনো এলাকায় বিদ্যুতের যে তার যায়, বাসায় যে মিটার বসে এবং মাস শেষে যে বিল আসে, এসবের নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি কোম্পানির হাতে চলে যাবে।
‘চাল-ডাল কেনার সময় কোনো দোকানদার বেশি দাম চাইলে ক্রেতা পাশের দোকানে যেতে পারেন। বিকল্প থাকার কারণে দোকানদারও ন্যায্য দাম রাখার চাপ অনুভব করেন। কিন্তু বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ থাকবে না’, বলছিলেন তাসনিম জারা।
তার ব্যাখ্যা, কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য চারটি কোম্পানি চার সেট খুঁটি ও তার বসাবে না। ফলে গ্রাহকের সামনে বিভিন্ন কোম্পানির সেবা ও দাম তুলনা করে পছন্দ করার সুযোগও থাকবে না।
একটি নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যুতের তার যে কোম্পানির মালিকানায় থাকবে, গ্রাহককে সেই কোম্পানির কাছ থেকেই বিদ্যুৎ নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিষয়টি বোঝাতে চাল-ডালের দোকানের উদাহরণ দেন তাসনিম জারা। তিনি বলেছেন, কোনো মহল্লায় যদি মাত্র একটি চাল-ডালের দোকান খোলার অনুমতি থাকে এবং দ্বিতীয় দোকান খোলার সুযোগ না থাকে, তাহলে ওই দোকানদার কি দাম কমাবেন? তার মতে, কমাবেন না।
তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি কোম্পানির হাতে রয়েছে, এমন উদাহরণের কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।
তাসনিম জারা বলছিলেন, এসব দেশে কঠিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছেমতো কিছু করতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা এবং তারা স্বাধীনভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে।
উদাহরণ হিসেবে ব্রিটেনের কথা তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, সেখানে ঝড়ে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পুনরায় চালু করতে না পারলে তারের কোম্পানিকে গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এই ক্ষতিপূরণের জন্য গ্রাহককে আলাদাভাবে আবেদন করতে হয় না। কোম্পানিকেই তা দিতে হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাসনিম জারা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বছরের পর বছর প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়েছেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া গভর্নরকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন এবং বরখাস্তের হুমকিও দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
এরপর বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তাসনিম জারা প্রশ্ন রাখেন, দেশের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা কখনো সরকারের মুখের ওপর না বলেছে কি না। তার মতে, এমন উদাহরণ মনে করা কঠিন। বরং এর বিপরীত ঘটনাই বেশি মনে পড়বে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সরকারি হাতে থাকলে ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাসনিম জারার ভাষ্য, লোডশেডিং হলে বা অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এলে সরকারের দায় থাকে। একই সঙ্গে নির্বাচনে হারার ভয়ও থাকে।
জারা বলছিলেন, কিন্তু বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই জবাবদিহির পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কারণ, বেসরকারি কোম্পানি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। ভোট দিয়ে তাদের সরানোরও সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে বাজারে বিকল্প প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে গ্রাহকের অন্য কোনো কোম্পানির সেবা নেওয়ার সুযোগও থাকবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টের শেষে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি বলেছেন, এসব চুক্তি সাধারণত ২০-২৫ বছরের জন্য হয়। একবার চুক্তি হয়ে গেলে সরকার পরিবর্তন হলেও তা সহজে পরিবর্তন হয় না। ফলে বর্তমান সরকারের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব যুগের পর যুগ মানুষকে বহন করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।