Image description

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশটির সরকার প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল মেনে নিরাপত্তা দিচ্ছে। শেখ হাসিনা ভালো আছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি ও দলের অন্য নেতারাও তার আগে বাংলাদেশে ফিরবেন।

পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। গতকাল বুধবার, ১২ আগস্ট সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার দেশ ছাড়ার ঘটনা, ভারতে আশ্রয় নেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ, আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, নিজের বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন নানক।

জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি প্রথমে দেশের ভেতরে আত্মগোপনে ছিলেন। একের পর এক আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করেন। ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো ফেলে দেন। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে গ্রেপ্তারের জন্য খোঁজ করা হচ্ছে। তখন দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নানকের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট তিনি গণভবনে ছিলেন। আগের দিন রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। পরদিন শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তিনি গণভবন থেকে বেরিয়ে যান। এরপর কয়েকটি জায়গায় আশ্রয় নেন। পরে তার জামাই তাকে দেশ ছাড়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেন।

নানক বলেন, তার জামাই পেশায় চিকিৎসক। তিনি ফোন করে তাকে বলেন, ‘বাবা, আপনি বেরিয়ে যান।’ এরপর যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই তিনি বের হন। তার জামাই মূলত তাকে পথ দেখিয়েছেন এবং দেশ থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করেছেন।

জাহাঙ্গীর কবির নানক জানান, ১৬ আগস্ট তিনি ভারতের শিলংয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে মালদহে যান। সেখানে তার মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরদিন তিনি কলকাতায় যান।

দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার বিষয়ে নানক বলেন, তিনি মানসিকভাবে ভালো নেই। দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের কর্মীরা ভালো না থাকলে তারাও ভালো থাকতে পারেন না।

নানক বলেন, দুই বছর ধরে তিনি তার ছেলের কবরের কাছে যেতে পারছেন না। মা-বাবার কবরেও যেতে পারছেন না। তবে এসব নিয়ে তার দুঃখ নেই বলে দাবি করেন তিনি। তার মূল কষ্ট, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার প্রসঙ্গও তোলেন নানক। তিনি বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এসব ঘটনা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

নানক বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি ভারতের প্রশিক্ষণ নিয়ে অস্ত্র হাতে দেশে ঢুকেছিলেন। মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকেই শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে নানক বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা আরও ৩০ মিনিট দেরি করলে তাকে এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে হত্যা করা হতে পারত। তার দাবি, ওই দিন গণভবনে থাকা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার জীবন ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার বিষয়ে নানক বলেন, তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার ওই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই এখন বিশ্ব ও দেশের মানুষের একটি অংশ মনে করছে, তাকে ছাড়া দেশ পরিচালনার মতো যোগ্য নেতৃত্ব আর নেই। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে নানক বলেন, ভারতের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তার দাবি, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল মেনে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।

শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কেও কথা বলেন নানক। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। ফোনেও নিয়মিত কথা হয়। শেখ হাসিনা তাকে জানিয়েছেন, তিনি ভালো আছেন।

নানকের ভাষ্য, গত দুই বছরে শেখ হাসিনার বড় কোনো অসুস্থতা হয়নি। একবার জানতে চাইলে শেখ হাসিনা তাকে বলেছেন, দুই বছরে শুধু দুই দিন সর্দি হয়েছিল। এ ছাড়া কোনো ওষুধ খেতে হয়নি।

ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে কী ধরনের নিরাপত্তা দিচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি নানক। তবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের কোনো চাপ ভারত সরকারের ওপর প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নে নানক বলেন, এ ধরনের চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ভারত সরকারের রয়েছে।

শেখ হাসিনাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা কী ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, শেখ হাসিনার নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে দিল্লিতে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এই কার্যক্রম কে পরিচালনা করেছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে কি না জানতে চাইলে নানক বলেন, হয়েছে। তবে কোথায় এবং কখন দেখা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি।

কলকাতায় আওয়ামী লীগের কোনো কার্যালয় আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নানক তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হলেও সেগুলোর ভিত্তি নেই। তবে আওয়ামী লীগের কেউ যদি তাদের বসার জন্য কোনো জায়গা দেন, সেখানে তারা যেতে পারেন। সেটিকে দলের কার্যালয় বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের বাইরে থেকেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা বলেছেন নানক। তার দাবি, কলকাতায় যাওয়ার পর থেকেই তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীদের পরিবারের খোঁজ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

নানক জানান, তার মেয়ে আওয়ামী লীগের মহিলা সংগঠনের একটি দায়িত্বে আছেন। তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় নেতা-কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। জেলে থাকা নেতা-কর্মীদের পরিবারের আর্থিক সমস্যার বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন নানক।

দেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানক বলেন, ঢাকার ১৩ নম্বর আসনসহ বিভিন্ন এলাকায় নেতা-কর্মীরা নানা কর্মসূচি পালন করছেন। কখনো মিছিল, কখনো মশাল মিছিল হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণ হিসেবে নানক ‘গভীর ষড়যন্ত্রের’ কথা বলেছেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগ একটি ‘গভীর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের’ মধ্যে পড়েছিল। তবে দলীয় ব্যর্থতা বা দুর্বলতা ছিল—এ কথা তিনি স্বীকার করেননি।

আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন নানক। তার দাবি, সংঘাত এড়াতে ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। তিনি নিজেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন বলে জানান।

নানক বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করলে ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো করা সম্ভব ছিল। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি ছিল বলেও তিনি দাবি করেন। এসব এলাকা থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে পারত বলে তার বক্তব্য।

তবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সে পথে যায়নি। কারণ শেখ হাসিনা রক্তপাত চাননি। তার ভাষ্য, সংঘর্ষ হলে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারত।

আওয়ামী লীগ আবার নির্বাচনে অংশ নিলে জনগণের সমর্থন পাবে বলেও দাবি করেন নানক। তিনি বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। যদি তা না হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রয়োজনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলেন নানক।

নিজের বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলার বিষয়ে নানক বলেন, তিনি আইনগতভাবে লড়াই করছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরে নয়জন হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নানক বলেন, মামলার নথিতে তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সাক্ষ্য নেই। তার দাবি, মামলার বিভিন্ন জায়গায় তার নির্দেশের কথা বলা হলেও তাকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন—এমন কোনো সাক্ষ্য নেই।

নানক বলেন, তিনি নিজে কাউকে গুলি করেননি। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ থাকলে তা দেখানোর আহ্বান জানান তিনি। তার দাবি, আইনের গতিতে বিচার হলে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলাগুলো টিকবে না।

ভবিষ্যতে দেশে ফেরার বিষয়ে নানক স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন—এমন প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি শেখ হাসিনার আগেই দেশে ফিরবেন। তার ভাষায়, ‘আমরা তো ওনার আগে যাব, পৌঁছাবো।’ রাজনীতিতে আবার তাকে দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, বেঁচে থাকলে তাকে আবার রাজনীতিতে দেখা যাবে। একই সঙ্গে নিজের জন্য দোয়া করতে বলেন তিনি।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগের সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া, নিজের দেশত্যাগ, ভারতে অবস্থান, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা ও শারীরিক অবস্থা এবং দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থার কথাও জানিয়েছেন। পাশাপাশি বলেছেন, আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হবে এবং তারা দেশে ফিরবেন।

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে নানকের বক্তব্যের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে। তিনি সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তবে এসব বিষয়ে তার বক্তব্যের বাইরে সাক্ষাৎকারে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই বা পাল্টা বক্তব্য দেওয়া হয়নি।