চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ। সে সময় থেকেই আলোচনায় রয়েছে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি। ছাত্রদলের প্রায় সব ইউনিটের কাজ ইতোমধ্যে শেষ করে নতুন কমিটির প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন নেতারা। সেই সঙ্গে সংগঠন সম্প্রসারণের কাজও করেছেন তারা। এখন অপেক্ষা নতুনদের হাতে দায়িত্ব সমর্পণের।
আসন্ন নতুন কমিটিকে সামনে রেখে নিজ নিজ বলয়ে ধরনা দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির হাইকমান্ডকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন পদপ্রত্যাশীরা। তবে কমিটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০২৪ সালের ১ মার্চ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বভার পান বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদকাল দুই বছরের প্রস্তাব করা হয়েছে। সে হিসাবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তখন থেকেই লবিং, তদবির ও সিনিয়র নেতাদের মন জোগাতে সময় দিচ্ছেন পদপ্রত্যাশী অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি এখন প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে রয়েছে। যেকোনো দিন আসতে পারে নতুন কমিটির ঘোষণা। এর মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারে ছাত্রদলের ইতিহাসে ‘রেকর্ডসংখ্যক সাংগঠনিক ইউনিটের’ কমিটি দেওয়া রাকিব-নাছির কমিটির অধ্যায়।
কমিটির বিষয়ে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় শেষ। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন প্রয়োজন মনে করবেন, তখন নতুন কমিটির ঘোষণা আসবে।’
বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে বিভিন্ন সমীকরণ মাথায় রাখতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে। বিশেষ করে ছাত্রদলের এই কমিটির ওপর সরকারি দল বিএনপির আগামী দিনের রাজপথের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দক্ষতা ও সাহসিকতার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করছে। সে কারণে অতীতের মতো সিন্ডিকেটের ‘মাইম্যান’, ‘পকেট কমিটি’ থেকে বেরিয়ে পরীক্ষিত, আস্থাভাজন, দক্ষ ও স্মার্ট নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা ভাবছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। পাশপাশি বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ভূমিকা রাখা, হামলা-মামলার ভয় উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ডেডিকেটেড এবং সর্বোপরি কর্মিবান্ধব, শিক্ষার্থীদের সুখ-দুংখে পাশে দাঁড়ানো, চিন্তা-চেতনা ও আউটলুকের দিক থেকে শিক্ষার্থীদের নেতা হিসেবে মানানসই ব্যক্তিকে শীর্ষপদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা চলছে পর্দার আড়ালে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়নের মাধ্যমে কমিটিতে কোনো চমক থাকছে, নাকি আগের মতোই সিন্ডিকেটের প্রভাব বলয়ের ভেতরে থাকা বিতর্কিতদের ঢুকে পড়ার সুযোগ থাকবেÑসেটি এখন সময়ের অপেক্ষা।
সূত্র জানায়, ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্রেও বয়সের বাধ্যবাধকতা নেই। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সঠিক সময়ে কমিটি দিতে না পারায় নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবাহ ব্যাহত হয়েছিল। এ কারণে সংগঠনের মধ্যে এক ধরনের নেতৃত্বজট তৈরি হয়েছে। এটি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার পাশাপাশি একটি বড় অংশের নেতাদের ঝরে পড়া রোধ করতে ব্যাচের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী পরবর্তী নেতৃত্ব যেমন জরুরি, তেমনি আগামী দিনগুলোয় ধারাবাহিকভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ে কমিটি ঘোষণার বিষয়টি হাইকমান্ডকে মাথায় রাখতে হবে। অতীতের ত্যাগ-সংগ্রাম ও রাজপথের নেতৃত্ব বিবেচনায় রেখে এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ ও দলীয় শৃঙ্খলা অটুট রাখতে এবারও ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে আসার সম্ভাবনা দেখছেন সাবেক-বর্তমান নেতারা।
সাবেক ছাত্রদল ও বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের বিভিন্ন সমীকরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পূর্ববর্তী ব্যাচের ধারাবাহিকতা রক্ষা। এর ফলে বিগত সময়ের ত্যাগী এবং সংগঠনে সৃষ্ট নেতৃত্বজটের মাধ্যমে ঝরে পড়ার আশঙ্কায় থাকা বড় একটি অংশের নেতাদের মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সে হিসাবে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের (যথাক্রমে ২০০৬-০৭ ও ২০০৭-০৮) ব্যাচের ঠিক পরের ২০০৮-০৯ থেকে শুরু করে পরের ব্যাচগুলো থেকে নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ঢাবি থেকে সম্ভাবনার শীর্ষে যারা
ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি-সেক্রেটারির ঠিক পরের ব্যাচ ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ । এখানে যারা আলোচনায় রয়েছেন, তাদের মধ্যে ছাত্রদলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত মুখ ও বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল অন্যতম। তিনি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি হামলা-মামলা, কারাবরণ ও রিমান্ডে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গেলে পুলিশের হামলায় তার ডান পা ভেঙে যায়। সোহেল ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতিসহ কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী ছিলেন।
একই ব্যাচ থেকে শীর্ষপদের দৌড়ে যারা এগিয়ে রয়েছেন, তাদের মধ্যে মনজুরুল আলম রিয়াদ, এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ও সাফি ইসলাম অন্যতম। এর মধ্যে রিয়াদ বর্তমান কমিটির সহসভাপতি। এর আগে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং অমর একুশে হলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই মামলায় ছয় মাসের বেশি কারাভোগ করেছেন তিনি। এছাড়া জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদলের প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। আর রুয়েল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আট মামলার আসামি এবং তিনবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন।
২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, ২ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান এবং মোস্তাফিজুর রহমান। এর মধ্যে জিসান আওয়ামী দুঃশাসনের সময় ছাত্রদলের দক্ষ সংগঠক হিসেবে হলে হলে কর্মী সংগ্রহের কাজ করেছেন। ছয়বার গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন সময় প্রায় দুই বছর কারান্তরীণ ছিলেন। তিনি ১৭ বার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। জিসান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাতীয় নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’ হিসেবে পরিচিত মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কুরুচিপূর্ণ ব্যানার পুলিশি প্রহরা উপেক্ষা করে ঢাবি থেকে অপসারণ করেন।
জানতে চাইলে জিসান বলেন, নিজেদের সীমিত সাধ্যের মধ্যে দল ও নেতাকর্মীদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছি। তবে দলের সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে চূড়ান্ত।
অন্যদিকে ফারুক হোসেন ক্লিন ইমেজ, সর্বোচ্চসংখ্যক অনুসারীর নেতৃত্ব দেওয়া এবং দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিত। এর আগে তিনি ঢাবি ও হল কমিটির একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ আমলে মামলা-হামলায় জর্জরিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া থাকতে হয় তাকে। কর্মিবান্ধব হওয়ার কারণে ছাত্ররাজনীতিতে তার অবস্থান ভালো বলে মনে করেন সংগঠনটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কারফিউ ভেঙে হওয়া প্রথম মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি।
বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমান ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কমিটির শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনের সময় নিপীড়িত এবং দল ও সংগঠনের পক্ষে তার বলিষ্ঠ ও সক্রিয় ভূমিকা সর্বজনবিদিত। ঢাবি ক্যাম্পাসে একাধিকবার ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। হামলায় তার হাত ভেঙে যায়, যা নিয়ে এখনো ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশে পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে ১৯ দিনের টানা রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি, যা ওই সময় দেশি-বিদেশি মিডিয়ার খবরে পরিণত হয়। বর্তমানে বিএনপি-ছাত্রদলবিরোধী প্রোপাগান্ডার জবাবে বিভিন্ন মাধ্যমে দল ও সংগঠনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন তিনি।
এছাড়া শীর্ষপদের দাবিদার ২০১৯ সালে ডাকসুতে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজ। ফ্যাসিবাদী আমলে রাজপথের হামলা-মামলায় তিনিও নির্যাতিত ছিলেন।
২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র সাহস, সিনিয়র সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ মাসুম ও সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকও আলোচনায় রয়েছেন।
এদের মধ্যে তারিক বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে একাধিকবার গুলিবিদ্ধ হওয়াসহ হামলা, মামলা, গ্রেপ্তারের শিকার হন। মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসা তারিক আওয়ামী আমলেও ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের যে সীমিতসংখ্যক নেতাকর্মীর মিছিল ও সভা-সমাবেশ হতো, সেখানেও নিয়মিত মুখ ছিলেন তিনি।
জুলাই বিপ্লবে রাজপথে প্রথম সারির ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে ছিলেন উজ্জ্বল। মেধাবী, কর্মঠ, কর্মী সংগ্রহে দক্ষতা ও অ্যাথলেট হিসেবে সুপরিচিতি তাকে শিক্ষার্থীদের আরো কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এছাড়া বিপদ-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে অসহায় শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছেন তিনি।
সর্বোপরি ক্লিন ইমেজ ও দলের প্রতি নিষ্ঠা থেকে বিএনপি চেয়ারম্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করেছেন তারিক। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আসা দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পরীক্ষিত ছাত্রনেতা হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। রাজনীতিকে ভালোবেসে সরকারি চাকরির পরিবর্তে রাজপথে থেকে দলের জন্য কাজ করে যাওয়াটা তৃপ্তির মনে করেন তারিক। সে কারণে সিন্ডিকেটের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দেখা পরীক্ষিত ছাত্রনেতা হিসেবে আসন্ন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে তাকে মূল্যায়নের আলোচনা ডালপালা বিস্তার করেছে।
আনিসুর রহমান অনিক ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে গুমের শিকার হওয়ার পাশাপাশি তিনবার কারাবরণ করেন। একজন কর্মিবান্ধব ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ক্ষুরধার বক্তব্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে শিক্ষার্থীদর মধ্যে।
এছাড়া জুলাই বিপ্লবসহ বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে হামলা-মামলা, নিপীড়ন-নির্যাতনেও সংগঠনের কাছে আস্থার নাম ছিলেন সাহস, মাসুমরা।
২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহামেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স এবং ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। এর মধ্যে বিভিন্ন সমীকরণের কারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন রাজু আহমেদ। তিনি বিগত আওয়ামী লীগের সময় ঢাবির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও হল কমিটির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। একাধিকবার কারাবরণ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া রাজু প্রতিকূল সময়েও মাঠ ছেড়ে যাননি।
মেধাবী ছাত্রনেতা প্রিন্স দুঃসময়ে সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কাছে একজন দক্ষ সংগঠক এবং সৃজনশীল ও ইতিবাচক ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত তিনি।
অন্যদিকে শিপন জুলাই বিপ্লবে প্রাণপণ সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সংগঠনের ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখতে কাজ করে চলেছেন। এছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হয়েও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
জানতে চাইলে রাজু আহামেদ আমার দেশকে বলেন, নতুন নেতৃত্ব ও নবোদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ে সারা দেশের ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। আমরা আশা করছি, আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অচিরেই ছাত্রদলের নতুন কমিটি উপহার দেবেন।
এছাড়া ২০১২-১৩ সেশনের নূর আলম ভূঁইয়া ইমন আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে সিনিয়রদের মধ্য থেকে (২০০৭-০৮ সেশন) সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম। ঢাবি থেকে আরো আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান শাকিল এবং ইব্রাহীম খলিল।
তবে আগামী কমিটিতে নিজের থাকার সম্ভাবনার বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির আমার দেশকে বলেন, ‘না, আমি চাইও না। আমি নিজে আসলে চাই নতুন সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড়াবে, আমরা দায়িত্ব শেষ করব ইনশাল্লাহ।’
ছাত্রদল ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতির ভিত মজবুত করতে এ কমিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে এবার বিএনপি চেয়ারম্যান দক্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে গুরুত্ব দেবেন। সে হিসেবে সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্য কমিয়ে পরীক্ষিত এবং রাজপথের দক্ষ ও যোগ্যদের বেছে নেবেন। সেদিক থেকে ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১ সেশন থেকে এবারের নেতৃত্ব আসার জোর গুঞ্জন রয়েছে।
ঢাবির বাইরে আলোচনায় যারা
এদিকে, ঢাবির বাইরে কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় আছেন। তারা হলেনÑছাত্রদলের বর্তমান সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হোরায়রা ও সাধারণ সম্পাদক এম রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।
এদের মধ্যে ডা. আউয়াল আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। বাসেত ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং রিমান্ডে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৫ সালে অবরোধের সময় গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ মৃত ভেবে চারতলা ভবন থেকে তাকে নিচে ফেলে দেয়। এরপর ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালে দুদিন গুম রেখে অস্ত্র মামলায় তাকে কোর্টে চালান দেয় পুলিশ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির বলেন, আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ১ মার্চ। ২০১৯ সালে ছাত্রদলের সবশেষ যে কাউন্সিল হয়েছিল, সেখানে কাউন্সিলররাই দলের চেয়ারম্যানকে পূর্ণ এখতিয়ার দিয়েছেন। সে ক্ষমতাবলে তিনি ছাত্রদল দেখাশোনা করেন। তিনি যখন চাইবেন, তখন কমিটি হবে।
বিদায়ের অপেক্ষায় রেকর্ড গড়া কমিটি
ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা নতুন কমিটির মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কমিটি ঘোষণার রেকর্ড করা বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদকাল। সেই সঙ্গে সংগঠনটিকে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত করেছে এই কমিটি। এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির আমার দেশকে বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রায় সবগুলো কমিটি দিয়েছি আমরা। এটি ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা।
তিনি আরো বলেন, আমাদের মেয়াদে ২,১০০-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি করা হয়েছে। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও মহানগরের প্রায় সব কমিটি করা হয়েছে। তবে পাঁচ থেকে সাতটি কমিটি এখনো আমরা চূড়ান্ত করতে পারিনি। আমাদের দায়িত্বকালীন এবং ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক কার্যক্রম আমরা শেষ করেছি।
দেশের এক হাজারের বেশি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের কমিটি দিয়ে একটি সাংগঠনিক স্ট্রাকচার দাঁড় করানো হয়েছে উল্লেখ করে নাছির বলেন, আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল এবং আমরা এটা করতে সক্ষম হয়েছি।
বাকি থাকা কমিটিগুলোর বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, কমিটিগুলোর কাজ শেষ হয়েছে দলের কাছে জমা দেওয়ার জন্য। দল যখনই বলবে, তখনই আমরা সেগুলো পেশ করতে পারব। তবে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার সঙ্গে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা চলমান প্রক্রিয়া। পরে যিনি দায়িত্বে আসবেন, তার কাজ হলো সেগুলো করা।
সামনে দলের কোনো দায়িত্বে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নাছির বলেন, ‘না, এরকম স্পেসিফিক কোনো ইচ্ছা নেই। দল যেখানে ভালো মনে করে সেখানে রাখবে। সেক্ষেত্রে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল বা মূল দলÑযেখানে মনে হয় দল আমাকে রাখবে, সেখানেই কাজ করব।’